শেষ হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ১৯ দিনের জমজমাট প্রচারণা। গত ২২শে জানুয়ারি শুরু হওয়া এই প্রচারণা আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হচ্ছে। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। ওইদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে ২৯৯ আসনে একযোগে পৃথক ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থীর মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সব ধরনের প্রচার বন্ধ হয়ে যাবে।
দীর্ঘ দেড় যুগ পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে না থাকলেও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এই দুই জোটের প্রার্থীদের বাইরেও নির্বাচনে আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। সবমিলিয়ে ৫১টি নিবন্ধিত দল নির্বাচন করছে। প্রচারণা শেষ হওয়ায় এখন ভোটের জন্য রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। সময় আছে মাত্র একদিন। এখন চলছে শেষ মুহূর্তের হিসাবনিকাশ।
কোন জোট কতো আসন পেতে পারে সম্ভাব্য জরিপ প্রকাশ করছে বিভিন্ন সংস্থা।
সিলেটে দুই ওলীর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের প্রচারণা শুরু করেন বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরপর ধারাবাহিকভাবে ৮টি বিভাগের ৪৫টি নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখেন তিনি। শেষদিনে রাজধানীর ৮টি নির্বাচনী আসনের জনসভায় বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপি’র চেয়ারম্যান। এসব বক্তৃতায় বিএনপি’র নানা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন তিনি। বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করবে। দেশে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করবে। এ ছাড়া প্রবাসীদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ সকল ধর্মগুরুদের জন্য সম্মানী ভাতা প্রবর্তন, আইনশৃঙ্খলা ঠিক করা, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার বিষয়ে দলের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন বিএনপি’র চেয়ারম্যান। গতকাল জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণেও তিনি দলের প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
ওদিকে ঢাকা-১৫ আসনে নিজ নির্বাচনী এলাকায় জনসভার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু করেন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। এরপর পর্যায়ক্রমে ৪০টি জেলার ৬০টি নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখেন তিনি। শেষদিনে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়ার পাশাপাশি মিরপুরে জামায়াতের গণমিছিলে যোগ দিয়ে প্রচারণা চালান ১১ দলীয় জোটের এই শীর্ষ নেতা। পরে যান দোহার-নবাবগঞ্জের জনসভায়। এসব প্রচারণায় ভোটের ফল না পাওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রে পাহারা বসাতে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বিএনপি’র প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, একটি পক্ষ ও পরিবার জয়ের জন্য পাগল হয়ে গেছে। নির্বাচনে হারের ভয়ে ভোটকেন্দ্র দখলের পাঁয়তারা করছে। নির্বাচনে কারচুপি হলে ক্ষমা করা হবে না বলে প্রশাসন-পুলিশকে হুঁশিয়ার করেছেন জামায়াত আমীর। প্রচারণার শেষদিনে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান ও খেলাফত মজলিসের আমীর মামুনুল হক। আগেরদিন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম।
এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ২৭৫ জন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। দলটির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৯১ প্রার্থী। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৫৮ প্রার্থী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ১৯৮ প্রার্থী। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ৩২ প্রার্থী। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ৭৬ জন ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, সারা দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ থাকবে।
এ ছাড়া মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন, মহিলা ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২২০ জন।
নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। অন্যদিকে, নির্বাচনে ৮১টি দেশি নিবন্ধিত সংস্থার মোট ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করবেন। এদের মধ্যে ৭ হাজার ৯৯৭ জন কেন্দ্রীয়ভাবে এবং ৪৭ হাজার ৪৫৭ জন স্থানীয়ভাবে সংসদীয় আসনভিত্তিক পর্যবেক্ষণ করবেন। এ ছাড়া, নির্বাচনে প্রায় ৫০০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক থাকবেন।