বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের তরফ থেকে অপতথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ফ্রান্সের সংবাদসংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর এটিই বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। হাসিনা বর্তমানে ভারতের হিন্দু-জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকারের আশ্রয়ে রয়েছেন।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে অপতথ্য ছড়ানো এতটাই বেড়েছে যে, এসব কন্টেন্ট ঠেকাতে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টুর্ককে ফোন করে বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে অপতথ্যের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এই অপপ্রচার বিদেশি গণমাধ্যম এবং স্থানীয় উৎস-উভয় দিক থেকেই ছড়ানো হচ্ছে।
এই অপপ্রচারের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার দাবি। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ অমুসলিম। গত কয়েক মাস ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হিন্দু জেনোসাইড’ হ্যাশট্যাগের ব্যবহার ব্যাপক বেড়েছে। তবে পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৬৪৫টি ঘটনার মাত্র ১২ শতাংশ সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় বিদ্বেষের আওতায় পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’ জানায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এক্স প্ল্যাটফর্মে অন্তত ১ লাখ ৭০ হাজার অ্যাকাউন্ট থেকে ৭ লাখের বেশি পোস্ট শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে ‘হিন্দু গণহত্যার’ মিথ্যা দাবি করা হয়েছে। সংস্থার প্রধান রকিব নায়েক বলেন, বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে বড় আকারের সহিংসতার মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়েছে। এই কন্টেন্টগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি সরাসরি ভারত থেকে পোস্ট করা।
এএফপির ফ্যাক্ট চেক টিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত এআই দিয়ে বানানো ভিডিও চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, এক হাত হারানো নারী বিএনপিকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। আরেক ভিডিওতে এক হিন্দু নারী অভিযোগ করছেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দিতে বলা হচ্ছে।
ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে ছড়ানো এসব এআই ভিডিওর খুব কম ক্ষেত্রেই ‘এআই দিয়ে তৈরি’ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হাসিনার শাসনামলের দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর এই অপতথ্যের স্রোত আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ঢাকাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ডিজিটালি রাইট’-এর প্রধান মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, অন্যান্য সময়ের তুলনায় আমরা এখন বিশাল পরিমাণ ভুয়া তথ্য লক্ষ করছি। বিনামূল্যের এআই টুল দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত ভুয়া ভিজ্যুয়াল তৈরি করা এখন অনেক সহজ।
উদাহরণস্বরূপ, আরেক এআই ভিডিওতে বাংলাদেশিরা শেখ হাসিনার প্রশংসা করছেন। অথচ হাসিনা বর্তমানে একজন পলাতক আসামি এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাংলাদেশের আদালত তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিপুল অপপ্রচারের প্রবাহ ভারত থেকে এলেও তা সে দেশের সরকার সরাসরি পরিচালনা করছে-এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই। নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার একটি প্যাটার্ন লক্ষ করছে। তবে তারা জোর দিয়ে বলেছে, আমরা সবসময় একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নির্ভরযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, তাঁরা অপতথ্য ঠেকাতে মেটার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণে একটি স্থায়ী ইউনিট গঠন করেছেন। মল্লিক বলেন, আমাদের টিম কোনো কনটেন্টকে ক্ষতিকারক ও বিভ্রান্তিকর হিসেবে শনাক্ত করলে, আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সেটিকে ভুয়া তথ্য হিসেবে ঘোষণা করি। যদিও অনলাইন তথ্যের বিপুল প্রবাহে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন।
সাবেক নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা জেসমিন তুলি সতর্ক করে বলেন, এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও বাংলাদেশের জন্য বাড়তি ঝুঁকি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের শহরের ৮০ শতাংশ ও গ্রামীণ এলাকার ৭০ শতাংশ পরিবারে স্মার্টফোন থাকলেও প্রযুক্তিগত সচেতনতা এখনো সীমিত। তিনি আরও বলেন, এআই দিয়ে বানানো এসব ভিডিও ভোটারদের বিভ্রান্ত করবে।