Image description

বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির (প্রধান) ডা. শফিকুর রহমান এক উচ্চাভিলাষী নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। দলটির একটি মূল প্রতিশ্রুতি হলো: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হলে তারা ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) চারগুণ বাড়িয়ে ২ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ভিত্তি স্থাপন করবে। রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিকদের উদ্দেশ্যে ৬৭ বছর বয়সী রহমান প্রযুক্তি-নির্ভর কৃষি, উৎপাদন খাত, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগের পাশাপাশি উচ্চতর বিদেশি বিনিয়োগ এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির অঙ্গীকার করেন।

ঢাকার অর্থনীতিবিদরা এই ব্যাপক প্রতিশ্রুতির অর্থায়ন সম্ভব কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তারা ইশতেহারটিকে 'স্লোগানসর্বস্ব কিন্তু বিস্তারিত পরিকল্পনার ঘাটতিপূর্ণ' বলে অভিহিত করেছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত নেতৃত্বের কাছে এই ইশতেহারটি গাণিতিক হিসাব-নিকাশের চেয়ে তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ইঙ্গিত দেওয়াই মুখ্য।

দীর্ঘ বছর ধরে সমালোচকরা জামায়াতকে—বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামি দল—এমনভাবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন যে, তারা ধর্মীয় মতবাদ দ্বারা এতটাই প্রভাবিত যে একটি তরুণ, বৈচিত্র্যময় এবং প্রগতিশীল জনগোষ্ঠীর শাসনভার তাদের পক্ষে পরিচালনা করা কঠিন। এর বিপরীতে, ইশতেহারটিতে দীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটিকে একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে—এমন একটি শক্তি হিসেবে যারা তাদের ধর্মীয় ভিত্তি এবং বাংলাদেশের মানুষের কাঙ্ক্ষিত আধুনিক ভবিষ্যতের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখে না। তাঁর শ্রোতাদের উপস্থিতিও ছিল ইঙ্গিতবহ।

কিছুদিন আগ পর্যন্তও বাংলাদেশের ব্যবসায়িক অভিজাত এবং বিদেশি কূটনীতিকরা জামায়াতের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেন অথবা গোপনে যোগাযোগ করতেন। এখন তারা তা প্রকাশ্যে করছেন। গত কয়েক মাসে ইউরোপীয়, পশ্চিমা এবং এমনকি ভারতীয় কূটনীতিকরাও শফিকুর রহমানের সাথে সাক্ষাতের চেষ্টা করেছেন। অথচ কিছুদিন আগেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেকেই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে 'অস্পৃশ্য' মনে করতেন।

যে নেতার দলকে দুবার নিষিদ্ধ করা হয়েছে (ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারসহ), তাঁর জন্য আসন্ন নির্বাচন এমন একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসছে যা এক বছর আগেও কেউ করার সাহস পেত না: শফিকুর রহমান কি বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন?

'আমি মানুষের জন্য লড়ব'

জামায়াত এবং এর নেতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তন অন্তত আংশিকভাবে বাংলাদেশে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যতার সাথে সম্পর্কিত। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের অভ্যুত্থান শুধু শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসানই ঘটায়নি, বরং এটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে উলটপালট করে দিয়েছে। এটি সেই পরিচিত দ্বিমেরুকরণকে (হাসিনার আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা) অকার্যকর করে দিয়েছে যা কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করে আসছিল।

আওয়ামী লীগ কার্যত রাজনৈতিক মাঠ থেকে নিষিদ্ধ এবং বিএনপি একমাত্র বড় দল হিসেবে টিকে থাকায় একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। শুরুতে অনেকে ধারণা করেছিলেন যে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সেই স্থান পূরণ করবে। কিন্তু তার পরিবর্তে, দীর্ঘদিন কোণঠাসা হয়ে থাকা জামায়াত সেই স্থান দখলে এগিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশ যখন দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, জামায়াত তখন দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তির একটি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নির্বাচন-পূর্ববর্তী কিছু জরিপে এখন দেখা যাচ্ছে যে তারা বিএনপির সাথে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং দলীয় প্রধানের দীর্ঘদিনের সহযোগী আহসানুল মাহবুব জুবায়েরের মতে, এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছেন রহমান। সিলেট অঞ্চলে জামায়াতের নেতৃত্বে থাকাকালে রহমানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা জুবায়ের বলেন, এই পুনরুত্থান বছরের পর বছর ধরে তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক কাজ এবং দমন-পীড়নের মুখে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার ফল।

মৃদুভাষী সাবেক সরকারি চিকিৎসক শফিকুর রহমান ২০১৯ সালে জামায়াতের দায়িত্ব নেন, যখন হাসিনার শাসনামলে দলটি নিষিদ্ধ ছিল। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে জঙ্গিবাদের মদদ দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে গভীর রাতে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৫ মাস পর জামিনে মুক্তি পান।

২০২৫ সালের মার্চে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েকমাস পর, মামলার আসামির তালিকা থেকে রহমানের নাম বাদ দেওয়া হয়। এরপর থেকে তাঁর সুপরিকল্পিত ও আবেগঘন জনসমাবেশগুলো ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। গত জুলাইয়ে ঢাকায় এক বিশাল সমাবেশে রহমান অসুস্থতার কারণে মঞ্চে দুবার জ্ঞান হারান, কিন্তু চিকিৎসকদের পরামর্শ উপেক্ষা করে তিনি বক্তব্য শেষ করতে ফিরে আসেন।

চিকিৎসকদের সহায়তায় মঞ্চে কোনোমতে বসে তিনি জনতার উদ্দেশে বলেন, "যতদিন আল্লাহ আমাকে হায়াত দিয়েছেন, আমি মানুষের জন্য লড়ব। জামায়াত নির্বাচিত হলে আমরা মালিক নই, সেবক হব। কোনো মন্ত্রী প্লট বা শুল্কমুক্ত গাড়ি নেবেন না। চাঁদাবাজি হবে না, দুর্নীতি হবে না। আমি তরুণদের স্পষ্টভাবে বলতে চাই—আমরা তোমাদের সাথে আছি।"

জামায়াতের ভাবমূর্তি নতুন করে গড়া

সমর্থকরা শফিকুর রহমানকে একজন সহজলভ্য এবং নৈতিকভাবে দৃঢ় ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন—এমন একজন নেতা যিনি ড্রয়িং রুমের চেয়ে দুর্যোগপূর্ণ এলাকাগুলোতে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন এবং সংঘাতে ক্লান্ত একটি দেশে প্রশান্তির বার্তা দেন। তৃতীয় মেয়াদে আমিরের দায়িত্ব পালন করা রহমান দলের ভেতরে কঠোর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছেন।

ঢাকার জামায়াত সমর্থক লোকমান হোসেন বলেন, "তিনি একজন ভালো ও ধার্মিক মানুষ। দলের সবাই তাকে বিশ্বাস করে।" তিনি আরও জানান, গত দেড় বছরে দলটি আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে, যেখানে জামায়াতের প্রথাগত ঘাঁটির বাইরে রহমানের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। তবে রহমানের চ্যালেঞ্জ এখন আর কেবল নির্বাচনী নয়—এটি ভাবমূর্তির।

নতুন সমর্থকরা জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে, তাই তিনি দলটিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন: কেবল মতবাদ ও ইতিহাস দ্বারা সংজ্ঞায়িত একটি ইসলামি শক্তি হিসেবে নয়, বরং সুশাসন, শৃঙ্খলা এবং পরিবর্তনের একটি মাধ্যম হিসেবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন কি কেবল বাহ্যিক নাকি সত্যিই কাঠামোগত, তার ওপরই নির্ভর করবে রহমানের নেতৃত্ব এবং জামায়াতের ভবিষ্যৎ।

জামায়াতের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টা ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত ইতিহাসের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়া এবং পরবর্তীতে দলের শীর্ষ নেতাদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড—দশকের পর দশক ধরে দেশে-বিদেশে জামায়াত সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেছে।

রহমান এই ইতিহাসের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। তিনি বিস্তারিত স্বীকারোক্তি এড়িয়ে গেলেও সম্প্রতি জামায়াতের "অতীতের ভুলগুলো" স্বীকার করেছেন এবং দলটি কোনো ক্ষতি করে থাকলে ক্ষমা চেয়েছেন। এই ভাষা সরাসরি অস্বীকার থেকে সরে আসার একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত, যদিও নির্দিষ্ট কোনো কর্মকাণ্ড বা দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়নি। সমর্থকদের মতে, এটি কোনো ছলচাতুরী নয় বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা—দলটিকে তার অন্ধকার অধ্যায় থেকে বের করে আনার চেষ্টা। এর বিপরীতে সমালোচকরা এই অস্পষ্টতাকে ইচ্ছাকৃত বলে মনে করেন। তাদের যুক্তি, এটি জামায়াতের অতীতের মূল বিষয়গুলোর মুখোমুখি না হয়েই তাদের ভাবমূর্তি নরম করার চেষ্টা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, "তিনি জানেন সেই ভুলগুলো কী ছিল। কিন্তু স্পষ্টভাবে তা বলা দলের ভেতরে তাঁর নেতৃত্বকে অস্থিতিশীল করতে পারে।" তবুও আহমেদ মনে করেন, পূর্ববর্তী নেতাদের চেয়ে রহমান কিছুটা উদারপন্থী, বিশেষ করে অমীমাংসিত ঐতিহাসিক প্রশ্ন এবং নারীর অধিকারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে, যা দলটি দীর্ঘদিন এড়িয়ে চলত। আহমেদ বলেন, "জনসাধারণ এবং গণমাধ্যমের কড়া নজরদারির কারণেও এই পরিবর্তন আসছে। মানুষ এখন প্রশ্ন করছে এবং জামায়াতকে তার উত্তর দিতে হচ্ছে।"

রক্ষণশীল সমর্থকদের আনুগত্য ধরে রেখে দলের প্রথাগত ঘাঁটির বাইরের ভোটারদের কাছে পৌঁছানো এবং বিদেশি মহলকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা একটি স্থায়ী দোটানা তৈরি করেছে—যা প্রায়শই দ্বৈত বার্তার জন্ম দেয়। সিনিয়র নেতাদের বক্তব্যে এই ভারসাম্যের খেলা স্পষ্ট। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, জামায়াত একটি মধ্যপন্থী দল এবং তারা কঠোর ইসলামি আইন চাপিয়ে দেবে না। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দলটি একজন হিন্দু প্রার্থীকেও মনোনয়ন দিয়েছে।

তবুও রক্ষণশীল সমর্থকদের উদ্দেশ্যে কথা বলার সময় দলটি তাদের ইসলামি পরিচয়ের ওপর জোর দেয়। কিছু সমর্থক জামায়াতকে ভোট দেওয়াকে ধর্মীয় পুণ্য বা সওয়াবের কাজ হিসেবে প্রচার করে—যে কৌশলটিকে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার বলে সমালোচনা করেছে।

এই কৌশল জামায়াতকে এমন সব রাজনৈতিক আলোচনায় প্রবেশ করতে সাহায্য করেছে যা একসময় তাদের জন্য বন্ধ ছিল। একই সাথে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভোট পাওয়ার চেষ্টায় রহমান দলের অতীত ও মতাদর্শকে পুনর্ব্যাখ্যা করতে কতদূর যেতে পারবেন—বা আদৌ ইচ্ছুক কিনা—তা নিয়ে সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছে।

নারী ও নেতৃত্বের প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থানে এই সীমাবদ্ধতাগুলো সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। আল জাজিরার সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমান বলেন, নারীর পক্ষে দলের শীর্ষ পদে থাকা সম্ভব নয়—এই মন্তব্য জামায়াতের লিঙ্গ রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনাকে আবার উসকে দেয়, যদিও তারা নিজেদের অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে।

রহমান বলেন, "আল্লাহ প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। একজন পুরুষ সন্তান ধারণ করতে বা স্তন্যপান করাতে পারেন না। কিছু শারীরিক সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করা যায় না। যখন একজন মা সন্তান জন্ম দেন, তখন তিনি কীভাবে এই দায়িত্বগুলো পালন করবেন? এটা সম্ভব নয়।"

সমালোচকদের মতে, এই অবস্থান জামায়াতের মধ্যপস্থার দাবির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং 'ন্যারেটিভস অফ বাংলাদেশ' বইয়ের লেখক মুবাশার হাসান জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন, এমনকি যেসব নারী নেত্রী প্রকাশ্যে এই মতামতের সমর্থন করেন, তারাও পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরেই কাজ করেন। তিনি দলের বিপুল সংখ্যক নারী সমর্থক ও মজলিসে শূরার নারী সদস্যদের কথা উল্লেখ করে বলেন, "এটি এমন একটি কাঠামোকে প্রতিফলিত করে যেখানে নারীরা দলে পুরুষদের কথাই মেনে চলেন।"

২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করে এই সমালোচনা আরও গুরুত্ব পায়। হাসান বলেন, "নারীরা সেই আন্দোলনে পুরুষদের মতোই, বা কখনো তার চেয়েও বেশি অংশ নিয়েছিল। এখন তাদের অবমূল্যায়ন করা জামায়াতের একটি গভীর সমস্যাযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।"

রাজনৈতিক ইতিহাসবিদরা মনে করেন এটি নতুন কোনো স্ববিরোধিতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের। ১৯৮৬ সাল থেকে নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করলেও জামায়াত কখনোই সাধারণ সংসদীয় আসনে কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি, বরং সংরক্ষিত কোটার ওপর নির্ভর করেছে। রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, "এটি কোনো সাময়িক অবস্থান বা কৌশলগত ভুল নয়। এটি দলটির মতাদর্শগত কাঠামোর প্রতিফলন, এবং সেই কাঠামো মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়নি।"

'দাদু' এবং জামায়াতের বিস্তৃতি

তবে জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে—বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে—বিষয়টি মতবাদের চেয়ে রহমানের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্যের জায়গা থেকে দেখা হয়। সাম্প্রতিক প্রচারণায় তরুণ সমর্থকদের প্রায়ই শফিকুর রহমানকে "দাদু" বলে ডাকতে শোনা গেছে। সাদা দাড়ি, মৃদুভাষী এবং সমর্থকদের প্রতি যত্নশীল রহমান এই ইমেজের সাথে মানানসই।

চট্টগ্রামের জেন-জি প্রজন্মের আইন বিভাগের ছাত্র ও জামায়াত সমর্থক আবদুল্লাহ আল মারুফ বলেন, "তিনি তাঁর কথার মাধ্যমে তরুণদের সাথে সংযোগ স্থাপন করেন। তাঁর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে দাদা-নাতির সম্পর্কের মতো একটা ব্যাপার আছে। যেখানে বিএনপি নেতারা প্রায়ই তরুণদের তুচ্ছজ্ঞান করেন, সেখানে শফিকুর তাদের সম্মানের সাথে কথা বলেন।"

মারুফ আরও বলেন, জামায়াতের প্রথাগত ঘাঁটির বাইরেও রহমানের জনপ্রিয়তা রয়েছে। জুবায়ের বলেন, হিন্দু প্রার্থী মনোনয়নের মতো দলের বাইরের ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টাগুলো নিছক কৌশলগত নয়, বরং এটি রাজনৈতিক সুবিধার চেয়ে জামায়াতের সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে নেওয়া।

তিনি বলেন, "আমাদের সংবিধান অনুযায়ী, যেকোনো বাংলাদেশি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতি সমর্থন করলে দলের অংশ হতে পারেন। রাজনৈতিক অংশগ্রহণের জন্য আমাদের ধর্মীয় মতবাদ সমর্থন করা বাধ্যতামূলক নয়।"

জামায়াত নেতারা যুক্তি দেন, এই পদক্ষেপ দলের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার প্রতিফলন—যা কেবল ধর্মতত্ত্বের ওপর নির্ভর না করে সুশাসন ও জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জুবায়ের বলেন, "আমরা দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি, শৃঙ্খলা এবং জনসেবার ওপর জোর দিচ্ছি। মানুষ দেখেছে আমাদের নেতারা বন্যা, কোভিড এবং জুলাই অভ্যুত্থানের সময় তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এ কারণেই সমর্থন বাড়ছে।"

খুলনার হিন্দু প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী আল জাজিরায় লিখেছেন, "যখন কোনো পরিবার দারিদ্র্যে পড়ে, জামায়াত-সংশ্লিষ্ট কল্যাণ নেটওয়ার্ক ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিচয় না জিজ্ঞেস করেই এগিয়ে আসে। এই সেবার সংস্কৃতিই ব্যাখ্যা করে কেন অনেক নাগরিক জামায়াতকে কেবল স্লোগানের দল নয়, বরং শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার দল হিসেবে দেখে।"

জামায়াতের যোগাযোগ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। জুবায়ের জানান, ভারতীয় কূটনীতিকরা শফিকুর রহমান অসুস্থ থাকাকালে তাঁর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন এবং গত মাসে ভারতীয় হাইকমিশনে ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জামায়াত নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল—যা একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ।

তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউরোপীয় ও পশ্চিমা কূটনীতিকরাও রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিংয়ে এক মার্কিন কূটনীতিককে বলতে শোনা যায় যে, আমেরিকান কর্মকর্তারা জামায়াতের সাথে "বন্ধু হতে" চায় এবং তিনি সাংবাদিকদের জিজ্ঞেস করছিলেন দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা তাদের কর্মসূচিতে অংশ নিতে ইচ্ছুক কি না।

জামায়াতের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বাড়ার সাথে সাথে এবং বিএনপির পাশাপাশি একটি শক্তিশালী নির্বাচনী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার প্রেক্ষাপটে, সাধারণ অনেক সমর্থক রহমানের নেতৃত্বের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। রহমানের ঢাকার নির্বাচনী এলাকার ভোটার আবুল কালাম বলেন, "তিনি একজন দেশপ্রেমিক। প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধীদলীয় নেতা—যেকোনো ভূমিকাতেই তিনি আমাদের ভালোভাবে নেতৃত্ব দেবেন।"

দলের পরবর্তী গন্তব্য কী তা অস্পষ্ট। তবে নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের ভেতরে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে রহমানের অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়। ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, "শফিকুর রহমান একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং তিনি প্রায়শই সংবাদের শিরোনামে থাকেন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, তবে দলের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমান।"

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন