আর মাত্র দুদিন পরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দীর্ঘ বিরতির পর ব্যালট যুদ্ধের এই মাহেন্দ্রক্ষণ ঘিরে সারা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন সরগরম। শেষ মুহূর্তে এসে নির্বাচনী প্রচার এখন তুঙ্গে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানীর অলিগলিতে দিনরাত চলছে প্রার্থী ও দলীয় প্রধানদের গণসংযোগ। এই নির্বাচনী ডামাডোলে ভোটারদের মন জয়ের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এলাকাভিত্তিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। দেশের দুই অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের কেন্দ্রীয় ইশতেহারের বাইরেও আঞ্চলিক সমস্যা সমাধান ও জনকল্যাণমূলক নানা অঙ্গীকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট সামনে রেখে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চষে বেড়াচ্ছেন। তাদের বক্তব্যে উঠে আসছে নির্দিষ্ট জেলার জন্য সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন পরিকল্পনা। একদিকে তারেক রহমান যেমন উত্তরবঙ্গের রুগণ শিল্প ও কৃষি বিকাশের কথা বলছেন, অন্যদিকে ডা. শফিকুর রহমান তিস্তা চুক্তি ও সিলেটের প্রবাসী সেবার মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এলাকাভিত্তিক এই বিশেষ মনোযোগ ভোটারদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই হবে আগামীর মূল চ্যালেঞ্জ।
বিএনপি চেয়ারম্যানের যত আঞ্চলিক প্রতিশ্রুতি: বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত ২২ জানুয়ারি সিলেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন। এর পর থেকে তিনি এখন পর্যন্ত দেশের ২৯টি বিভাগ ও জেলা সফর করেছেন। প্রতিটি জনসভায় তিনি আগামী পাঁচ বছরে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকার জন্য কী কী করবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরছেন। তিনি মোটাদাগে কর্মসংস্থান, সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি ও কৃষকদের জন্য আর্থিক সহায়তা, ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ঠাকুরগাঁওয়ে পুরোনো বিমানবন্দর চালু এবং রুগণ ও কৃষি শিল্পের বিকাশ, ফরিদপুরে ভুট্টা চাষের উন্নয়ন, বরিশালে ভোলা-বরিশাল পর্যন্ত সেতু, কুমিল্লায় ইপিজেড সম্প্রসারণ, দিনাজপুরে লিচু-আম চাষের সম্প্রসারণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। গত ২২ জানুয়ারি সিলেটের প্রথম নির্বাচনী জনসভায় অংশ নেওয়ার আগে এক পলিসি ডায়ালগে তারেক রহমান বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত করা হবে। একই দিনে মৌলভীবাজারে তিনি স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ঢাকা থেকে সিলেটে আসতে আট ঘণ্টা লাগে। লন্ডন যেতেও এত সময় লাগে না। আমি আসতে দেখলাম, রাস্তা ভাঙা। স্কুল-কলেজ, হাসপাতালের একই অবস্থা। আগামী দিনে এই অবস্থার পরিবর্তন চাইলে ধানের শীষের সরকার লাগবে। যখনই ধানের শীষের সরকার ছিল, তখনই উন্নয়ন হয়েছে। নারী, কৃষক সবার উন্নয়ন হয়েছে।
তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘কৃষি কার্ড’ ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’। বিভিন্ন জনসভায় পকেট থেকে এই কার্ডগুলো দেখিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে কৃষকদের কৃষি কার্ড দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে সহজে সার, কৃষিঋণ ও শস্যবীমা সুবিধা মিলবে। অন্যদিকে, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীদের মাসিক আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়ে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে বন্ধ থাকা বিমানবন্দর চালু করা, ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং রুগণ শিল্প পুনরুজ্জীবনের অঙ্গীকার করেন। সিরাজগঞ্জ ও পঞ্চগড়ের জনসভায় তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় থেকে শুরু করে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত সমগ্র উত্তরাঞ্চলে আমরা কৃষিনির্ভর শিল্প গড়ে তুলতে চাই। রাজশাহীর জনসভায় তিনি আইটি পার্ক সচল ও আইটি ভিলেজ তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান এবং পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। এ ছাড়া ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার ঘোষণাও দেন তিনি।
চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে তিনি বন্দর নগরীকে ‘প্রকৃত বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন। ঢাকার জনসভায় তিনি যানজট নিরসন, গাজীপুরে নারী শ্রমিকদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার এবং রাজধানীতে ৪০টি নতুন খেলার মাঠ তৈরির ঘোষণা দেন।
জামায়াত আমিরের যত অঙ্গীকার: জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও তার প্রচারে আঞ্চলিক সমস্যাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। গত ৭ ফেব্রুয়ারি সিলেটে এক জনসভায় তিনি সিলেটের খনিজসম্পদ ও প্রবাসীদের অধিকার নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, সিলেটবাসী নিজেদের খনিজসম্পদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ক্ষমতায় গেলে বঞ্চনা থাকবে না। সুপেয় পানি আর ড্রেনেজ-ব্যবস্থার উন্নতি করা হবে। কথা দিচ্ছি—প্রবাসীনির্ভর সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি নামে নয়, কাজে পূর্ণাঙ্গ হবে। ম্যানচেস্টার বিমানের রুট আবারও নতুন নতুন রুট করা হবে। কোনো প্রবাসী মৃত্যুবরণ করলে তার মরদেহ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে আনা হবে।
উত্তরবঙ্গের প্রাণভোমরা তিস্তা নদী নিয়ে তিনি লালমনিরহাটে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, কথা দিচ্ছি, এই তিস্তাকে ইনশাআল্লাহ আমরা জীবন দেব। তিস্তা হবে উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। এখান থেকে হাইড্রো পাওয়ার হবে। এখানকার পানি সারা উত্তরবঙ্গকে উর্বর করে তুলবে। কুড়িগ্রামের জনসভায় সীমান্ত হত্যা নিয়ে তিনি কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশের প্রতিবেশী বন্ধু থাকবে, কিন্তু আমরা কোথাও কাউকে প্রভু মানব না, কোথাও কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করব না। আমরা ক্ষমতায় গেলে আর কোনো ফেলানীকে কাঁটাতারে ঝুলে থাকতে হবে না।
ডা. শফিকুর রহমান বিভিন্ন জেলাকে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ফরিদপুর নামেই বিভাগ হবে ইনশাআল্লাহ। বগুড়াকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার এবং সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন তিনি। একইভাবে দিনাজপুরকেও সিটি করপোরেশনে রূপান্তরের কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান আমলে যে ১৯টি বড় জেলা ছিল, সেই ১৯ জেলার মধ্যে দিনাজপুর ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। দিনাজপুরকে গণ্য করা হয় বাংলাদেশের শস্য ভান্ডার হিসেবে। এখানে প্রচুর পরিমাণ আম ও লিচু উৎপাদন হয়; তাড়াহুড়া করে বিক্রি করতে হয়। এর সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও উন্নতমানের ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা হবে।
শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের জন্য তিনি রেলক্রসিংয়ে ওভারপাস ও ড্রেনেজ সিস্টেমের আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেন। উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য তার অঙ্গীকার হলো—মহেশখালীকে একটি ‘স্মার্ট ইকোনমিক জোন’ হিসেবে গড়ে তোলা এবং কক্সবাজারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। পঞ্চগড়ের সভায় তিনি ঘোষণা করেন, আমরা উত্তরবঙ্গের চেহারা বদলে দেব। ১৮ কোটি মানুষের ৬৪ জেলার কোথাও মেডিকেল কলেজবিহীন থাকবে না।
বিশ্লেষক অভিমত: বিএনপি ও জামায়াতের এই বিশাল প্রতিশ্রুতির বহর নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তারা মনে করছেন, আঞ্চলিক সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করা ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হবে, সেটিই দেখার বিষয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধ্যাপক ড. মো. মহিউদ্দিন কালবেলাকে বলেন, বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলই তাদের ইশতেহারে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। সেইসঙ্গে অঞ্চলভিত্তিক প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে। কারণ একেক অঞ্চলের সমস্যা একেকরকম। দলগুলো বিভিন্ন অঞ্চলের সমস্যা চিহ্নিত করে তাদের পরবর্তী করণীয় বিষয়ে জানাচ্ছে। তবে ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কার প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা রাখবেন, তা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট পেপারেই নিশ্চিত হবে। আপাতত বাংলাদেশের আকাশে-বাতাসে বইছে নির্বাচনী উৎসব আর প্রতিশ্রুতির জোয়ার।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক কালবেলাকে বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে যে আঞ্চলিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো বিভিন্ন অঞ্চলের সমস্যা বিবেচনায় রেখেই নেতৃবৃন্দ দিচ্ছেন। কেননা, সাধারণ মানুষ প্রায়ই বলে থাকেন যে, ভোটের আগে রাজনৈতিক নেতারা যেভাবে প্রতিশ্রুতি দেন, ভোটের পর সেভাবে তা রক্ষা করা হয় না। এ ছাড়া একটি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া নির্বাচনী ইশতেহারের ১০ শতাংশও তারা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করে না। ফলে বিএনপি বা জামায়াত যেই ক্ষমতায় আসুক, তাদের পক্ষেও এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে।