Image description

শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টা। কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার রামমোহন বাজার। একটি চায়ের দোকানে জম্পেশ ভোটের আড্ডা। আলোচনার এক পর্যায়ে হঠাৎই রাগে ফেটে পড়লেন এক ব্যক্তি।

উচ্চৈঃস্বরে বলতে লাগলেন, ‘দেখেন ভাই, তারেক রহমান কিভাবে এসব কথা বলেন! আগামী পাঁচ বছর নাকি মানুষ তাদের পা ধরে থাকবে!’

প্রাণবন্ত আড্ডায় হঠাৎ উত্তেজনা দেখে প্রবল আগ্রহে এই প্রতিবেদক জানতে চাইলেন, ঘটনাটা কী। কেন তিনি ক্ষেপে গেলেন তারেক রহমানের প্রতি?

জবাবে নিজের মোবাইল ফোনে ইউটিউবে একটি ভিডিও চালু করে দিলেন। ভিডিওতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা জনগণের পা ধরবেন, তারপর বাকি পাঁচ বছর জনগণ আপনাদের পা ধরবে।’

ভিডিও শেষ হতেই এই প্রতিবেদকের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন তিনি।

নাম ইলিয়াস মোল্লা। বয়স আনুমানিক ৫৫ বছর। তাঁর ছেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মোবাইলটি পাঠিয়েছিলেন। এরপর কাজের শেষে অবসর পেলেই ইউটিউবে ঢুকে দেশ-দুনিয়ার খোঁজখবর নেন।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক নির্বাচনী পরিবেশে রাজনৈতিক বক্তব্যগুলোই তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। 

যে বক্তব্যটি ঘিরে ইলিয়াস মোল্লা ক্ষুব্ধ, সেটি কি সত্যিই তারেক রহমানের নিজের বক্তব্য? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ধরনের একটি বক্তব্য দিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান, তবে এটি ওই বক্তব্যের খণ্ডিতাংশ। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বরিশালে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রতিপক্ষ দলের দিকে ইঙ্গিত করে  করে বলেন, ‘তাদের আরেক নেতা, যার বাড়ি কুমিল্লা জেলায়, তিনি কিছুদিন আগে দলীয় এক সমাবেশে কর্মীদের বলেছেন, ১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা জনগণের পা ধরবেন, এরপর পরবর্তী পাঁচ বছর জনগণ আপনাদের পা ধরবে। চিন্তা করুন, এই রকম কথা কে বলতে পারে? এই কথা থেকে প্রমাণিত হয়, তাঁদের মানসিকতা কোন পর্যায়ের। তাঁরা জনগণকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছেন।

প্রতিপক্ষ দলের নেতার মন্তব্য উদ্ধৃত করে দেওয়া সেই বক্তব্যের অংশবিশেষ কেটে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ভাইরাল করে দিয়েছে কোনো একটি চক্র। আর সেই খণ্ডিত বক্তব্যই গেঁথে গেছে সরলমনা ইলিয়াসদের মনে। তাঁরা ধরেই নিয়েছেন এটি সত্যি। কেননা, তাঁরা ভাইরাল কোনো ভিডিও বা বক্তব্যের সত্য-মিথ্যার যাচাই করেন না কিংবা সেই সুযোগ নেই। 

শুধু এই ঘটনাই নয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে অনলাইন দুনিয়ায় গুজব এবং তথ্য বিকৃতির প্রবণতা এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে খণ্ডিত বক্তব্য, পুরনো ভিডিও, বিকৃত শিরোনাম ও বিভ্রান্তিকর দাবি, যার বড় একটি অংশ সরল বিশ্বাসে লুফে নিচ্ছেন অসচেতন ভোটাররা।

সম্প্রতি লক্ষ করা যায়, যশোরে পাঁচ বিদেশি পিস্তল ও ৫০ রাউন্ড গুলিসহ এক যুবককে আটকের ঘটনাকে ‘জামায়াত নেতার বাসায় বিপুল অস্ত্র উদ্ধার’ দাবি করে ছড়ানো হয়। আবার ‘শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের নূর’—এমন একটি চটকদার শিরোনামও ভাইরাল হয়। অনেকেই নুরুল হক নুরের ছবি দিয়ে ফটোকার্ড বানিয়ে ছড়িয়ে দেন। পরে যাচাই করে দেখা যায়, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো প্রার্থীটি হলেন মৌলভীবাজার-১ আসনের মো. আব্দুন নূর।

সর্বশেষ গতকাল একটি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ছবি দিয়ে লেখা হয়, ‘ভোটকেন্দ্রে কেউ বিশৃঙ্খলা করলে সেনাবাহিনীকে গুলি করার নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার।’ অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রধান উপদেষ্টা এ ধরনের কোনো নির্দেশ দেননি। এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করেও ওই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভোটের আগ মুহূর্তে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতার মতো গুজবও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মাঠের রাজনীতির পাশাপাশি ভার্চুয়াল দুনিয়াও বিভক্ত। তীব্র মতবিরোধ, তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনার সঙ্গে চলে ভুয়া তথ্যের ছায়াযুদ্ধ। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই ব্যবহার করে এখন সহজেই বানানো যাচ্ছে নকল ফুটেজ। দেখতে হুবহু কোনো নেতার মতো, কণ্ঠও অবিকল। ফলে সতর্কভাবে যাচাই না করে এর প্রকৃত অবস্থা বোঝার উপায় থাকে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্য-প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অপতথ্যের বিস্তারও বেড়েছে বহুগুণে। সত্যকে আড়াল করে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করার এই প্রবণতা দিন দিন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। জন্ম দিচ্ছে অকারণ বিতর্কের, বিভাজনের এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিরপরাধ ব্যক্তিদেরও ঠেলে দিচ্ছে সামাজিক ও রাজনৈতিক হয়রানির মুখে।

বিশ্বব্যাপী তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে খণ্ডিত বক্তব্য, গুজব, জাল ই-মেইল বা নকল মিডিয়া ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে, যা নির্বাচনকে দূষিত করছে।

ঢাকাভিত্তিক ডিজিটাল অনুসন্ধানমূলক সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশির দীর্ঘদিন ধরে গুজব প্রতিরোধে ফ্যাক্ট চেকিং কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, গুজব প্রতিরোধে ফ্যাক্ট চেকিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে দেশে বর্তমানে কিছু স্বতন্ত্র সংস্থা ফ্যাক্ট চেকিং কার্যক্রম চালালেও মূলধারার গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে সে ধরনের উদ্যোগ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। অথচ ইউরোপ, আমেরিকা এমনকি পাশের দেশ ভারতেও নির্বাচনকেন্দ্রিক ফ্যাক্ট চেকিং কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালিত হয়।

তিনি বলেন, ভোটের সময় স্বাভাবিকভাবেই মানুষ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে। আর যেকোনো প্রতিযোগিতায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা চলে নানাভাবে। গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এখন সেই প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ভোটের প্রাক্কালে এই প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ কোনো তথ্য যাচাই না করেই দ্রুত বিশ্বাস করে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। কারো প্রতি ক্ষোভ থাকলে, সে বিষয়ে অপতথ্য আরো দ্রুত ছড়ায়।

কদরুদ্দীন শিশির আরো বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত সক্রিয়তাও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ থেকে সাধারণ ভোটারদের পরিত্রাণ পেতে হলে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। কোনো তথ্য বিশ্বাস করার আগে ন্যূনতম পর্যায়ে হলেও যাচাই করা জরুরি। একইভাবে কোনো বক্তব্য বা ভিডিও দেখার ক্ষেত্রে খণ্ডিত অংশের ওপর নির্ভর না করে পুরো বক্তব্যটি দেখার বা জানার চেষ্টা করতে হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের খণ্ডিত ভিডিও বা অপতথ্য ভোটের ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সাধারণ ভোটারদের উচিত, সত্য জানার জন্য বিদ্যমান ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা বা ফ্যাক্ট চেকারদের সহায়তা নেওয়া।

এদিকে ভোটের বাকি মাত্র চার দিন। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন স্থগিত হয়েছে বলেই গুজব ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাধ্য হয়ে জনসাধারণের উদ্দেশে জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল রবিবার ইসির জনসংযোগ অধিশাখার পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ আসন্ন গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত হওয়ার বিষয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য হলো, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২৯৯টি সংসদীয় আসনে (শেরপুর-৩ ব্যতীত) জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।’