জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ (রমজান মাস) কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। পরিদর্শনের পর রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার শেষে প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘রোহিঙ্গারা আগামী ঈদ নিজ দেশ মায়ানমারেই উদযাপন করবেন।’
দীর্ঘদিন থমকে থাকা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় তাঁর এই ঘোষণাকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখেছিল দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক মহল। মনে করা হয়েছিল, বহু প্রতীক্ষিত প্রত্যাবাসনে এবার বাস্তব অগ্রগতি হবে।
অথচ ওই ঘোষণার পর একটি ঈদুল ফিতর পার হয়ে গেছে। আর কয়েক সপ্তাহ পর আরো একটি ঈদুল ফিতর সমাগত। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি আছে শূন্যের কোঠায়। প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার প্রায় ১১ মাসে একজন রোহিঙ্গাও স্বদেশে ফিরতে পারেনি।
উল্টো মায়ানমারের রাখাইন থেকে দলে দলে রোহিঙ্গারা দেশে ঢুকেছে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরানোর বিষয়টি চাপা পড়ে আছে। বরং কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের শিবিরে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের অস্থায়ী রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কারণ স্থানীয়রা বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দিতে রাজি নয়। আর আশ্রিত রোহিঙ্গারাও চায় দ্রুত শরণার্থী জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে নিজ দেশ আরাকানে (রাখাইন) বাপ-দাদার ভিটায় স্থায়ী হতে।
জানা গেছে, সরকার রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মতামতকে উপেক্ষা করে সৌদি আরবে বসবাসরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার জন্য বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব পাসপোর্ট দেওয়া হবে ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরে সৌদি আরবে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের জন্য।
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, “রোহিঙ্গাদের নিয়ে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
এরই মধ্যে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ ও সৌদি আরবে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা আমাদের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে। এমন অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের ভূমিকা বেশি দায়ী। প্রত্যাবাসনের বাস্তব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকর না করে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ, নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সুযোগ দেওয়া, ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরে সৌদি আরবে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত ‘আত্মঘাতী’।” আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেওয়া কার্যত তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার শামিল। অথচ এসব গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করেনি। এমনিতেই রোহিঙ্গা নিয়ে সৃষ্ট সংকটে কক্সবাজারের স্থানীয়রা নিয়ত নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছে, সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরো জটিল করবে। তা স্থানীয় মানুষের ভোগান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) দপ্তরের হিসাবে, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এবং নোয়াখালীর ভাসানচর—সব মিলিয়ে ৩৪টি শিবিরে বর্তমানে ১১ লাখ ৭৩ হাজার ১৭১ জন রোহিঙ্গা রয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় ও বিভিন্ন সুত্রের হিসাবে, প্রায় দুই বছরে নতুন করে অনুপ্রবেশ করেছে এক লাখ ৩৯ হাজার ৩৭৮ রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে বর্তমানে ৩৪টি শিবির ও সংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে বাস করছে কমপক্ষে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫৪৯ রোহিঙ্গা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কেবল সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ঘোষণার পর কমপক্ষে ৫০ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় অনুপ্রবেশ করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রোহিঙ্গা বেড়ে যাওয়ায় দেশের জন্য নতুন করে মানবিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ তৈরি করছে।
প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ঢলের পর থেকে সরকার রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় সরকার ২০১৮ সালে মায়ানমার সরকারের কাছে এক লাখ ৮৬ হাজার ২২৮টি পরিবারের আট লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তালিকা দেয়। ওই তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের পর মায়ানমার কর্তৃপক্ষ এক লাখ ৩৮ হাজার ৮০৯ জন রোহিঙ্গাকে দেশে ফিরিয়ে নিতে ছাড়পত্র দেয়। এরপর থেকে দফায় দফায় প্রত্যাবাসনের চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও এ যাবৎ একজন রোহিঙ্গাকেও নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা সিরাজুল মোস্তফা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গেল বছরের পবিত্র রমজান মাসে জাতিসংঘ মহাসচিবকে সঙ্গে নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা আমাদের ক্যাম্পে এসেছিলেন। তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় আমাদেরকে আগামী ঈদে ঘরে ফিরে যাওয়ার যে আশ্বাসবাণী শুনিয়েছিলেন এটা এখনো কানে বাজে। কিন্তু ঘরে ফেরা তো দূরের কথা, উল্টো এখানে আমাদের জন্য নাকি পাকা ঘর করা হবে।’
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, একাধিকবার উচ্চ পর্যায়ের ঘোষণা এলেও তা কার্যকর করা হয়নি। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও একজন রোহিঙ্গাও মায়ানমারে ফিরে যেতে রাজি হয়নি। নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা ও বসবাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বারবার ভেস্তে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ঘোষণাটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও বাস্তবায়নের জন্য যে শক্তিশালী কূটনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক ঐক্য প্রয়োজন, তা এখনো দৃশ্যমান নয়। মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অস্থির পরিস্থিতি এবং নাগরিকত্ব ইস্যু অমীমাংসিত থাকায় প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি ও কক্সবাজার-৪ উখিয়া-টেকনাফ সংসদীয় আসনের দলীয় এমপি প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী জানান, নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে জনসংখ্যার চাপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। খাদ্য সহায়তা কমে আসছে, স্বাস্থ্যসেবা সংকট তীব্র হচ্ছে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও দিন দিন খারাপ হয়ে উঠছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮-৭৯ সালে কয়েক লাখ অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আমলেও রোহিঙ্গা সমস্যা জটিল রূপ ধারণ করেনি। বিএনপি যদি সরকার গঠন করতে পারে তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করবেন।’
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস জানান, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যরা সীমান্তপথে অনুপ্রবেশ রোধসহ রোহিঙ্গাদের অপরাধ কার্যক্রম থামানোর জন্য সদা জাগ্রত রয়েছে। এত কিছুর পরও অনুপ্রবেশ পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। মানবপাচার চক্র ও দালালদের তৎপরতাও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারাও রোহিঙ্গাদের কারণে ভুক্তভোগী। বনভূমি উজাড়, পরিবেশদূষণ, জীবিকার সংকট এবং সামাজিক টানাপোড়েন ক্রমেই বাড়ছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিটির সভাপতি ও উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার বাস্তবায়নের বদলে উল্টো নতুন করে দেড় লাখের কাছাকাছি রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আসলে রোহিঙ্গারা কবে নিজ দেশে ফিরবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।