পোস্টার-ফেস্টুনে ছেয়ে যাওয়া চেনা নির্বাচনী দৃশ্যপট ভেঙে এবার শেষ মুহূর্তে রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে ভোটযুদ্ধ নেমেছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। বিভাগের আট জেলার নির্বাচনী মাঠে মাইকিং সীমিত, দেয়াল তুলনামূলক পরিষ্কার, কিন্তু ফেসবুক লাইভ, রিলস, টিকটক ভিডিও ও গ্রাফিক পোস্টে সরব প্রার্থীরা।
স্মার্টফোনের স্ক্রিনেই জানা যাচ্ছে—প্রার্থীর প্রতিশ্রুতি, বক্তব্য এমনকি অতীত কর্মকাণ্ডও। ফলে পোস্টার বনাম সোশ্যাল মিডিয়া—এই দুই প্রচারণা মাধ্যমের প্রতিযোগিতা এবার রংপুর বিভাগের ভোটের মাঠে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
রংপুর : তরুণ ও প্রথমবার ভোটারদের বড় অংশ এখন প্রচলিত প্রচারণার চেয়ে ডিজিটাল কনটেন্টের ওপর বেশি নির্ভরশীল। প্রার্থীরাও বিষয়টি বুঝে ফেসবুক ও টিকটকে উপস্থিতি বাড়াচ্ছেন। পর্যবেক্ষকরা জানান, রংপুরে ফেসবুক প্রচারণায় বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে।
লালমনিরহাট : এ জেলার আসনগুলোতে কোনো কোনো প্রার্থী ডিজিটাল ক্যাম্পেইনও করছেন। স্থানীয়রা বলছেন, এবার জেলার তিনটি আসনের ২০ প্রার্থীর মধ্যে প্রচারণায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন লালমনিরহাট-৩ (সদর) আসনের বিএনপি প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু। ব্যানার, বিলবোর্ড, ফেস্টুন, মাইকিং—এসবের বাইরে শহর-বন্দরে তিনি পরিবেশন করছেন জারিগান। একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আবু তাহের নিজের আসনের বিভিন্ন সমস্যা ও সমস্যা ও তা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভিডিও কনটেন্ট প্রচার করছেন ফেসবুকে।
কুড়িগ্রাম : এ জেলার প্রত্যেকেই বানিয়েছেন নিজস্ব ডিজিটাল টিম ও মিডিয়া সেল। কুড়িগ্রাম-১ আসনে ডিজিটাল মাধ্যমে ভোটের প্রচারণায় এগিয়ে আছেন গণঅধিকার পরিষদের তরুণ প্রার্থী বিন ইয়ামিন মোল্লা, তাঁর সঙ্গে এগিয়ে আছেন বিএনপির প্রার্থী সাইফুর রহমান রানা। ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলামও নেই পিছিয়ে। অন্যদের মনোযোগ কিছুটা কম ডিজিটাল প্রচারণায়। কুড়িগ্রাম-২ আসনে ডিজিটাল প্রচারণায় ১১ দলীয় জোটের তরুণ প্রার্থী ড. আতিক মুজাহিদ ও বিএনপি মনোনীত সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ আছেন এগিয়ে। বাকিদের মনোযোগ নেই সেভাবে। কুড়িগ্রাম-৩ আসনে ডিজিটাল প্রচারণায় এগিয়ে আছেন ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহী। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তাসভীর-উল ইসলামও নেই পিছিয়ে। কুড়িগ্রাম-৪ আসনের ডিজিটাল প্রচারণায় এগিয়ে আছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আজিজুল রহমান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী রুকুনুজ্জামান।
দিনাজপুর : দিনাজপুর জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে ফেসবুক-টিকটকে নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াতের চেয়ে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে। চারটি সোর্স পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দিনাজপুর জেলায় ছয়টি আসনে ১০০ শতাংশের মধ্যে গড়ে বিএনপি ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ, জামায়াত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ও অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা গড়ে ১০ শতাংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালাচ্ছে।
নীলফামারী : নীলফামারীর চার আসনের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা ডিজিটাল প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন। নীলফামারী-১ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম দলের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী সোশ্যাল মিডিয়ায় এগিয়ে আছেন। জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আব্দুস সাত্তার মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় পিছিয়ে। নীলফামারী-২ (সদর) আসনে বিএনপি প্রার্থী প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন ও জামায়াতের আলফারুক আব্দুল লতিফ মাঠ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নীলফামারী-৩ ও ৪ আসনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব ভিন্ন। নীলফামারী-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয় হলেও ডিজিটালে কম, বিএনপির সৈয়দ আলী কিছুটা এগিয়ে। নীলফামারী-৪ আসনে জাতীয় পার্টির সিদ্দিকুল আলমের ব্যতিক্রমধর্মী প্রচারণা, বিশেষ করে উর্দু ভাষায় মাইকিং, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সারা দেশে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ঠাকুরগাঁও : ঠাকুরগাঁওয়ের পাঁচটি উপজেলায় এবারের মাঠের চেয়েও এখন উত্তাপ বেশি ভার্চুয়াল জগতে। ফেসবুক আর টিকটক হয়ে উঠেছে তাঁদের প্রধান ‘রণক্ষেত্র’। নির্বাচনী মাঠ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রচারণায় একটি ‘অভিজাত ও রাষ্ট্রীয়’ ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছে তাঁর ডিজিটাল টিম। জামায়াত মনোনীত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের ডিজিটাল প্রচারণায় সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক ছাপ স্পষ্ট।
গাইবান্ধা : গাইবান্ধার পাঁচটি আসনের ৪০ জন প্রার্থীর প্রায় সবাই প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে সহজসাধ্য ফেসবুক বেছে নিয়েছেন। তবে এবার প্রচারণার ছবি, প্রার্থীদের বক্তব্য ও মিটিং-মিছিলের ভিডিও এবং লাইভ বেশি করা হচ্ছে। প্রচারণায় প্রার্থীরা ফেসবুককে ব্যবহার করছেন ‘সিরিয়াস’ আলোচনার জন্য, আর টিকটককে বেছে নিয়েছেন বিনোদনমূলক ও আবেগপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিতে।