Image description
ট্রাইব্যুনালে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেছেন, ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় তারেক রহমানকে (বিএনপির চেয়ারম্যান) তুলে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছিল। গুম-খুনের ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে তিনি এ কথা বলেন।

ইকবাল করিম ভূঁইয়া আরও বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল নিয়ন্ত্রক ছিল ডিজিএফআই। তারা বিভিন্ন সময় ব্যক্তিদের তুলে নিয়ে নিজেদের সেলে রাখত এবং জিজ্ঞাসাবাদ করত। এর মধ্যে অনেক মন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিও ছিলেন। তারেক রহমানকেও এই প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখা হয়েছিল এবং অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছিল।

রোববার ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলের সামনে ইকবাল করিম ভূঁইয়া সাক্ষ্য দেন। প্যানেলের অপর সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ। এদিন দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে সাক্ষীর ডায়াসে ওঠেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া। শুরুতেই তাকে শপথ পড়ানো হয়। এরপর নিজের পরিচয় দেন তিনি। ২০১২ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন এই কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, আমি সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে গুম ও খুনের সংস্কৃতি কীভাবে বেড়ে উঠেছে, সে ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে এসেছি। পাশাপাশি সেনাপ্রধান থাকাকালীন র‌্যাব নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে এসেছি। এরপর একে একে বিবরণ দিতে থাকেন ইকবাল করিম।

জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, আমরা যদি ধরে নিই যে, ২০০৮ সাল থেকে সেনাবাহিনীতে খুন শুরু হয়েছে, তা ভুল বলা হবে। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই খুনের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সেনানিবাসের বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে। সেসময় কথিত অপরাধীদের ধরে সেনা ক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করা হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তবে তার সংখ্যা ছিল সীমিত। পরবর্তী সময়ে তদন্ত আদালতের মাধ্যমে ও আইন প্রয়োগ করে সেসব নিয়মিত করা হয়েছে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অপারেশন চলাকালে বেশকিছু মৃত্যু হয়েছে। সেসব কর্তৃপক্ষের নজরে আসায় দোষীদের যথাযথ শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

ইকবাল করিম বলেন, সামরিক বাহিনীর প্রধান কাজ হলো বহিঃশত্রু থেকে দেশকে রক্ষা করা। তবে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সামরিক বাহিনীকে তাদের সাহায্যে সময়ে সময়ে মোতায়েন করা হয়। এছাড়া দুর্যোগকালীন মুহূর্তেও মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনীকে। এমনকি নির্বাচনের সময়ও মোতায়েন করা হয়। সবার ধারণা, সেনাবাহিনী মোতায়েন করলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। তাই এটি একটি অলিখিত নিয়ম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তিনি বলেন, সেনাবাহিনীকে যখনই বাইরে মোতায়েন করা হয়, তখন অধিনায়কদের মনে সার্বক্ষণিক চাপ থাকে তাদের কত তাড়াতাড়ি সেনানিবাসে ফেরত আনা হবে। কারণ, তাদের প্রত্যেকের কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে। তাদের প্রশিক্ষণ ‘এক গুলি, এক শত্রু’ নীতির ওপর পরিচালিত হয়ে থাকে। বস্তুত এটি না হলে সেনাবাহিনী কখনো যুদ্ধ করতে পারবে না। এজন্য প্রশিক্ষণকালে সেনা সদস্যদের ডি-হিউম্যানাইজ করা হয়। তারা ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ মনে করা ভুলে যায়। মানুষকে টার্গেট বলতে শুরু করে। ফায়ারিং রেঞ্জে মানুষ আকৃতির টার্গেটের ওপর গুলি করে তাদের মানুষ হত্যার মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর করা হয়। এ কথা মনে রেখে সেনাবাহিনীকে কখনো বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি। অথচ সেটাই ঘটেছে ২০০৩ সালে যখন র‌্যাব গঠন করা হয়। এটি ছিল একটি মারাত্মক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। সেনা সদস্যদের যে প্রশিক্ষণ, তা র‌্যাবে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ছিল না।

সাক্ষ্যে সাবেক এই সেনাপ্রধান আরও বলেন, ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। র‌্যাব গঠনের আগে অপারেশন ক্লিন হার্টেও অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সেনাসূত্র অনুযায়ী, ১২ জন হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, এ সংখ্যা ছিল ৬০ জন। পরবর্তী সময়ে ক্লিন হার্টের সব সদস্যকে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়। বস্তুত এই দায়মুক্তি ছিল হত্যার লাইসেন্স প্রদান। অর্থাৎ লাইসেন্স টু কিল।

এদিকে রোববার সকালে কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। এ মামলায় তাকেই একমাত্র আসামি করা হয়েছে। গত ১৪ জানুয়ারি তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। সেই ধারাবাহিকতায় প্রথম সাক্ষী হিসাবে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া জবানবন্দি দেন। এর আগে মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী নাজনীন নাহার ও মুনসুরুল হক চৌধুরী।

ট্রাইব্যুনালে সিরিয়াল কিলারের বিচার চলছে : রোববার ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিং করেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিচারের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন আজ। দেশের ইতিহাসে সিরিয়াল কিলার হিসাবে যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করেছেন, তেমন একজনের বিচার এই ট্রাইব্যুনালে চলছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তার (জিয়াউল) বিরুদ্ধে বলপূর্বক অপহরণ-গুম করে মানুষদের হত্যা করার যে অভিযোগ প্রসিকিউশন এনেছে, সে মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া। তিনি অত্যন্ত আলোচিত, মেধাবী ও অত্যন্ত দূরদর্শী একজন সেনাপ্রধান ছিলেন। জবানবন্দিতে কীভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর পেশাদারি নষ্ট করা হয়েছে; তা তুলে ধরেছেন জবানবন্দিতে।

তাজুল ইসলাম বলেন, একজন সাবেক সেনাপ্রধান হিসাবে সেনাবাহিনীকে রক্ষা করার জন্য যত ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তিনি সেই ব্যবস্থাগুলো কীভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছেন এবং তার চেষ্টাগুলোকে কীভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তারিক আহমেদ সিদ্দিকের নেতৃত্বে একটা যে চক্র তৈরি হয়েছিল, তারা কীভাবে এটাকে ব্যর্থ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, সেই কথাগুলো আদালতের সামনে তুলে ধরেছেন তিনি। এছাড়া কীভাবে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদ তৈরির মাধ্যমে একটা ডিপ স্টেট তৈরি করা হয় এবং সেনাবাহিনীর কমান্ডের বাইরে আরেকটি কমান্ড স্ট্রাকচার তৈরি করা হয়; সেই কমান্ড স্ট্রাকচারকে দিয়ে সেনাবাহিনীর কোনো অংশের মাধ্যমে তাদের নানা ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম চালানো হয়েছে বলে তিনি সাক্ষ্যতে বলেছেন।

সর্বোপরি সাবেক এই সেনাপ্রধান আজ যার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন, তিনি সেই সময়ে কর্নেল জিয়া নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি কীভাবে মানুষ হত্যা করেছেন, র‌্যাবে গিয়ে গুমপূর্বক মানুষ হত্যার ব্যাপারে তার যে দক্ষতা ও বেপরোয়া মনোভাব ছিল, সেসব বিষয়ে আদালতে তুলে ধরেছেন বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।

সেনাবাহিনীকে নিয়ে গিবত গেয়েছেন ইকবাল করিম : এদিকে জবানবন্দিতে সেনাবাহিনীকে নিয়ে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া গিবত গেয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের আইনজীবী নাজনীন নাহার। রোববার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি। নাজনীন নাহার বলেন, একটি গৌরবময় অধ্যায় রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। দেশ গঠনে, বিপদে-আপদে বা কোনো সংকটে পড়লে আমরা সেনাবাহিনীর দিকে তাকিয়ে থাকি। দীর্ঘ ৪০ বছর সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া। তিনি সেনাপ্রধান ছিলেন। অথচ এই সেনাবাহিনী সম্পর্কে অনেক গিবত গেয়েছেন তিনি। একজন সেনাবাহিনীর প্রধানের কাছ থেকে এটা আমি আশা করিনি। তিনি বলেন, জবানবন্দিতে উনি (ইকবাল করিম) বলেছেন যে, ১৯৭২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত যত অন্যায়-অপরাধ হয়েছে, সবকিছুর সঙ্গে সেনাবাহিনী যুক্ত। ওনার, মোদ্দা কথা আমি এটুকুই বুঝতে পেরেছি। তার জবানবন্দি সম্পন্ন হলে আমরা তখন বলব।