Image description
দল ও প্রার্থীদের শান্তিপূর্ণ কার্যক্রম চায় ইসি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়তে পারে বলে ধারণা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন মনে করছে, প্রচারে বড় দুই দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বাকযুদ্ধ হয়েছে। দু-একটি ছাড়া নির্বাচনের পরিবেশ-পরিস্থিতি নষ্ট করার মতো বড় ঘটনা ঘটেনি। এতে ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের উৎসাহ রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী দলের অংশ না নেওয়া, বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পোস্টাল ব্যালটে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন না হওয়ায় নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে ভোট পড়ার হার নিয়ে এমনই ধারণা তৈরি হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার ভোটের দিন রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের কার্যক্রমের ওপর ভোটার উপস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকলে ভোট পড়ার হার ৬৫-৭০ শতাংশ (প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ) হতে পারে। আর প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীরা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে ভোটার উপস্থিতি কমে যাবে। ইসি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২৯৯টি আসনে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলবে। ওই দিন দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে এ ভোটগ্রহণ হবে। এ নির্বাচনে ২ হাজার ২৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগ ও নয়টি দলটি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। আইন অনুযায়ী, কাল মঙ্গলবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে নির্বাচনি প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে।

নির্বাচনে ভোট পড়ার হার নিয়ে দুজন নির্বাচন কমিশনার তাদের ব্যক্তিগত মতামত যুগান্তরের কাছে প্রকাশ করেছেন। তারা দুজনই নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে ইসির সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনে নির্বিঘ্নে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। ভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখতে পাচ্ছি। আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, এ নির্বাচনে ৬০-৬৫ শতাংশ ভোট পড়বে।

আরেক নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ভোটগ্রহণের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এমন উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা মনে করি, দীর্ঘদিন পর মানুষ তার পছন্দের প্রার্থীকে নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে, এ নির্বাচনে ৬৫-৭০ শতাংশ ভোট পড়তে পারে। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর ওপর ভোট পড়ার হার নির্ভর করছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে এই প্রথম কোনো নির্বাচন হচ্ছে। এতে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে লড়াই হচ্ছে। এ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের অন্যতম বড় নিয়ামক তরুণ ভোটাররা। প্রতিটি দলই তাদের ইশতেহারে তরুণদের প্রাধান্যও দিয়েছে।

নির্বাচনে ভোট পড়ার হার নিয়ে ইসির ধারণার সঙ্গে একমত নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম। তিনি বলেন, দলীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকা আওয়ামী লীগ নানাভাবে তাদের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। দলটি তাদের নেতাকর্মীদের ভোট দিতে না যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একাংশ কেন্দ্রে যাবে না, এটা পরিষ্কার। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় জন্মাতে পারে। ওই সব মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাবেন কিনা-তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

বিগত নির্বাচনগুলোতে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেসব নির্বাচনে পরিবেশ ভালো ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ছিল, সেসব নির্বাচনে ভোট পড়ার হার বেশি ছিল। আর যেসব নির্বাচন বিতর্কিত, সেগুলোতে ভোট পড়ার হার কম। যেমন, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪২ শতাংশ ভোট পড়েছে। ওই নির্বাচনে ৪৪টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে অংশ নিয়েছিল আওয়ামী লীগসহ ২৮টি রাজনৈতিক দল। বিএনপিসহ ১৬টি নিবন্ধিত দল ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল। এর আগে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮০ শতাংশ। আর ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছিল। ওই তিন নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ রয়েছে; এর মধ্যে ২০১৮ সালের নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ বলে সমালোচিত। তবে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়ার হার ছিল ৮৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। এর আগে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৭৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ওই দুই নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নিয়েছিল।

ইসি সূত্র বলছে, এবার নির্বাচন ঘিরে মানুষের মধ্যে উৎসব দেখা গেলেও বিগত তিনটি নির্বাচনের ভয় কাটেনি। তারা উদাহরণ টেনে বলেন, প্রবাসে দেড় কোটি মানুষের বসবাস হলেও পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন সাত লাখ ৬৭ হাজার ২৩৩ জন আর রোববার রাত পর্যন্ত ভোট দিয়েছেন ৫ লাখ ৬ হাজার ২৪৭ জন। অপরদিকে দেশে প্রায় ১৭ লাখ ব্যক্তি ভোটগ্রহণ কাজে নিয়োজিত হলেও পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে মাত্র ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৯৮ জন নিবন্ধন করেছেন। আর ভোট দিয়েছেন ৪ লাখ ৫৩ হাজার ৯৮৭ জন। ইসির কর্মকর্তারা বলেন, প্রবাসী এবং দেশের ভেতরে নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত ও সরকারি চাকরিজীবীদের বড় অংশ স্বেচ্ছায় ভোট দেওয়া থেকে বিরত রয়েছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর একটি বড় অংশ দলীয় সিদ্ধান্তে ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। অনেকে মামলার আসামি, তারা পলাতক রয়েছেন। আর কারাবন্দিদের অনেকেই ভোট দিচ্ছেন না। এ থেকেও ভোট পড়ার হারের কিছু ধারণা পেয়েছে ইসি। এছাড়া তফসিল ঘোষণা থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনে অসত্য তথ্য ও গুজবের ছড়াছড়ি। এমনকি ভোট স্থগিত হয়েছে, এমন গুজবও ছড়িয়েছে। এতে সাধারণ ভোটাররা ভোট দিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন বলে মনে করছে ইসি। এ কারণে এ ধরনের গুজবে কান না দিতে প্রচার চালানো হচ্ছে।

নির্বাচনের প্রচার শেষ কাল সকালে : ইসি জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার কাল সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে শেষ হচ্ছে। এরপর প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রস্তুতিমূলক কাজ করতে পারবেন। কিন্তু ভোট চাইতে পারবেন না। এছাড়া ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগ থেকে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সারা দেশে জনসভা আয়োজন বা অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইসি। ওই সময়ে অস্ত্র প্রদর্শন ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের কোনো ধরনের হুমকি-ধমকি দেওয়া হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ডের বিধান উল্লেখ করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন সংশ্লিষ্ট রিটানিং কর্মকর্তারা।

নির্বাচনে প্রার্থী ও ভোটার : এবার নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে ২ হাজার ২৯ জন প্রার্থী। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ এবং স্বতন্ত্র ২৭৪। নারী প্রার্থী ৮৩ জন। আবার নারী প্রার্থীদের মধ্যে দলীয় ৬৩ এবং স্বতন্ত্র ২০ জন। মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ এবং হিজড়া ১ হাজার ২৩২ জন। ১২৪টি দেশে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছিল। ইতোমধ্যে ৪ লাখ ২২ হাজার ৯৬০টি পোস্টাল এসে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৯৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৬ শতাংশ নারী।

মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী : সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাঠে নেমেছেন সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা ভোটের পর ২ দিনসহ মোট ৭ দিন দায়িত্ব পালন করবেন। এ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মোট ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে নামছে। সেনাবাহিনী আগে থেকেই মাঠে আছে। তবে রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের জন্য বাড়তি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটের পরিবেশ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আমরা মনে করি নির্বাচনি পরিবেশ সম্পূর্ণ ভালো আছে।