বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনের বিতর্কিত অভিজ্ঞতা ও সমালোচনাকে পেছনে ফেলে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন জেলা প্রশাসকরা (ডিসি)। কোনও প্রকার হুমকি ছাড়াই একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন উপহার দিতে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তবে গণভোটে সরকারের ‘হ্যাঁ’ সূচক ভোটের পক্ষে কাজ করার যে অভিযোগ উঠেছে, তাকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন তারা।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রশাসনের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে তৎকালীন ডিসিদের অনেককেই ওএসডি বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৩৩ জন সাবেক ডিসিকে ওএসডি করা হয়। এর আগে বিচ্ছিন্নভাবে ১২ জনকে ওএসডি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
বর্তমান ডিসিরা বলছেন, তারা সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চান না। একাধিক জেলা প্রশাসক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের মাধ্যমে তারা এবার নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে চান।
গণভোট নিয়ে বিতর্ক ও কর্মকর্তাদের উদ্বেগ
গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে জনমত তৈরিতে জনসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনও কর্মকাণ্ডে ডিসিরা সম্পৃক্ত নয় বলেও জানিয়েছেন তারা। তবে প্রকাশ্যে ডিসিরা নিরপেক্ষতার দাবি করলেও মাঠ পর্যায়ে ভিন্ন গুঞ্জন রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করতে কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক চাপ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরিশাল বিভাগের একজন ইউএনও বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সরকার যা-ই বলুক, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী করতে এক প্রকার চাপ অনুভব করছি। যদি আমার উপজেলায় ‘না’ জয়ী হয়, তাহলে আমার অবস্থা কি হবে তা অনুমান করতে পারবেন? তাই বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করছি।”
তবে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম ও বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমন এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গণভোটে অংশ নিতে জনসচেতনতা বাড়ানোর বাইরে অন্য কোনও কর্মকাণ্ডে তারা সম্পৃক্ত নন। তাহসিনা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “গণভোটে আমাদের করণীয় বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আমরা সেই মোতাবেক কাজ করছি। কেউ যদি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করে—তা হবে ভিত্তিহীন।” পুরো শরীয়তপুরে কোনও প্রকার সমস্যা বা হুমকি নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি। এদিকে মো. খায়রুল আলম সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “প্রধান উপদেষ্টার প্রতিশ্রুত সেরা নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবাইকে নিয়ে কাজ করছি।”
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন অর রশীদ দাদাভাই বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে সরকারের সর্বস্তরের লোকজন কাজ করছে। সরকারি দফতরের আশপাশে ও ব্যাংক বিমা কোম্পানির পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার জন্য ব্যানার ফেস্টুন লাগানো হয়েছে।
নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার বিশেষ ব্যবস্থা
বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। ভোটারদের ভয়ভীতি দূর করতে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “পক্ষপাতিত্বের কোনও সুযোগ নেই।”
উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক মোহম্মদ কামাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ভোটাররা যাতে বাড়ি থেকে এসে স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।”
রাজনৈতিক মহলের শঙ্কা ও প্রশাসনের জবাব
ঢাকার একটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য অভিযোগ করেছেন, সরকারে থাকা একটি মহল নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ চেষ্টা করছে। যারা ২০০৮ সালের মতো প্রভাবিত নির্বাচন করতে চায়।
এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকরা বলেছেন, এবার কোনোভাবেই ফলাফল পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এবারের নির্বাচন হবে আগের যেকোনও নির্বাচনের তুলনায় সেরা এবং চমৎকার। সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের সঙ্গে সমন্বয় করে সাধারণ মানুষ, প্রার্থী, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে নিয়মিত সভার মাধ্যমে যেকোনও সমস্যা তাৎক্ষণিক সমাধান করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞের মতামত ও প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি
একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে বিতর্ক এড়িয়ে ডিসিদের নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কাজ করা প্রসঙ্গে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “নির্বাচনের সময় পুরো প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকে। এ ক্ষেত্রে কমিশনের নির্দেশনা মেনে চলাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। বিশেষ করে গণভোটের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কমিশনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করলে যেকোনও ধরনের বিতর্ক এড়ানো সম্ভব।”
জেলা প্রশাসকরা মনে করেন, নির্বাচনের দিন ভোটাররা যেন বাড়ি থেকে স্বাচ্ছন্দ্যে ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেন এবং ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। এরই মধ্যে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ভোটকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশবাসী একটি সুন্দর ও উৎসবমুখর নির্বাচন পেতে যাচ্ছে বলে দাবি করছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।