Image description
ভুয়া ভিডিও, বিকৃত ছবি ও মিথ্যা বক্তব্য

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাস্তব রাজনীতির চেয়ে বেশি উত্তপ্ত ভার্চুয়াল জগৎ। এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও, বিকৃত ছবি ও মিথ্যা বক্তব্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছেয়ে গেছে। মহামারি আকার ধারণ করেছে এআই-অপতথ্যের। এমনকি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের জড়িয়েও এ ধরনের কনটেন্ট (ছবি-ভিডিও) প্রকাশ করা হচ্ছে। ভোট যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে এসব রাজনৈতিক অপতথ্যের দাপট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি নির্বাচনি পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছে।

জানা যায়, তফসিল ঘোষণার পর থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮৬ হাজারের বেশি এআই-কনটেন্ট (ছবি-ভিডিও) পেয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর মধ্যে ৩৬ হাজারের বেশি কনটেন্টে হিংসাত্মক ও রাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য রয়েছে। এ ধরনের কনটেন্টের ৮৯.৮৮ শতাংশ ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছে। বাকি ১০ দশমিক ১২ শতাংশ প্রকাশ করা হয়েছে এক্সে (সাবেক টুইটার)। নির্বাচন উপলক্ষ্যে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপির ই-মনিটর প্লাস প্ল্যাটফর্মের পর্যালোচনায় এসব কনটেন্ট ধরা পড়েছে। এ ধরনের কনটেন্টের বিরুদ্ধে ইসিকে এ পর্যন্ত দৃশ্যমান বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কাছে সেগুলো পাঠিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছে।

ইসি সূত্রে জানা যায়, কখনো কখনো এসব কনটেন্টের কারণে ছোটখাটো সহিংসতা ও পালটাপালটি ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে এ পর্যন্ত বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মেটার সঙ্গে বৈঠক করেছে ইসি। সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন ও নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহর নামেও ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। ওই দুটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের কনটেন্ট থেকে বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনাও ঘটতে পারে।

সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, এআই ব্যবহার করে প্রার্থীর চরিত্রহনন, গুজব ছড়ানো বা নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দুই বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। তারা নির্বাচনে এ ধরনের কনটেন্ট বন্ধে ইসিকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের যুগান্তরকে বলেন, আমাদের নেতা ও প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিদ্বেষমূলক অপতথ্য ছাড়াচ্ছে একটি মহল। এর মাধ্যমে নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। বিষয়টি আমরা ইসিকে জানিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ইসি এ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অপরদিকে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ইসির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জকারিয়া যুগান্তরকে বলেন, আমরা আগে থেকেই এ ধরনের আশঙ্কা করে ইসিকে উদ্বেগের কথা জানিয়ে আসছি। একটি দল ব্যাপকভাবে অপতথ্য ছড়াচ্ছে। তারা দেশের বাইরে থেকেও এ কাজ করে যাচ্ছে। মাত্র কয়েকদিন পর ভোট। এখনই এসব অপব্যবহার বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কিন্তু ইসিকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই হচ্ছে। আমাদের নজরে যখন যেটি আসছে, সেটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিটিআরসি, সিআইডিসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও ইসি বৈঠক করেছে। নির্বাচনে স্থিতিশীলতার জন্য তাদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

ইসি সূত্রে আরও জানা গেছে, নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিদিনই এআই দিয়ে তৈরি প্রচুর কনটেন্ট প্রকাশ হচ্ছে। তফসিল ঘোষণার পর ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭২ হাজার কনটেন্ট ধরা পড়ে ইউএনডিপি ই-মনিটর প্লাস প্ল্যাটফর্মে। ওইদিন পর্যন্ত হিংসাত্মক বক্তব্য নিয়ে কনটেন্ট ১৬ হাজার এবং রাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট ছিল ১৫ হাজার। মাত্র দুদিনের ব্যবধানে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এআই কনটেন্টের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৪ হাজারে। আর হিংসাত্মক বক্তব্য নিয়ে কনটেন্ট সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার এবং রাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক ছিল ১৬ হাজার। ২ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই কনটেন্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৬ হাজারে। অর্থাৎ সাত দিনে এ ধরনের কনটেন্টের সংখ্যা বেড়েছে ১৪ হাজার। ওইদিন পর্যন্ত হিংসাত্মক বক্তব্য দিয়ে তৈরি কনটেন্টের সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার এবং রাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট ১৮ হাজার।

সূত্র জানায়, কয়েকটি হটস্পট থেকে এ ধরনের কনটেন্ট ছাড়ানো হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে ঢাকা থেকে। এছাড়া সিলেট, ময়মনসিংহ, খুলনা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল অঞ্চল থেকেও এ ধরনের কনটেন্ট ছড়ানোর তথ্য পেয়েছে ইসি।

২ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, এআইভিত্তিক যেসব কনটেন্ট প্রচারিত বা প্রকাশিত হচ্ছে, এর ৯০ দশমিক ২৮ শতাংশই জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক। গণভোট নিয়ে কনটেন্টের হার ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ।