আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে ‘ট্রাম্পকার্ড’ হতে পারে নতুন ভোটারেরা। কারণ এই নির্বাচনে নতুন করে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৪৫ লাখ ভোটার। আর তারাই নির্বাচনে প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারেন।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্যমতে, আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ৪৫ লাখ ৭১ হাজার ২১৬ জন ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ লাখ ৭০ হাজার নতুন ভোটার পুরুষ। আর ২৭ লাখ নারী ভোটার। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ২৫১ জন।
আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার।
মোট ভোটারের ৩৪ শতাংশই নতুন। ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী এসব নতুন ভোটারের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নির্বাচনের চিত্র বদলে দিতে পারে বলে জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, নতুন ভোটাররা ভোটের ধারাই বদলে দিতে পারেন। বিশেষ করে সেসব আসনে যেখানে অতীতে জয়ের ব্যবধান ছিল খুবই সামান্য।
‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারেন নতুন ভোটার
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ তরুণ ভোটার। এই নির্বাচনকে ঘিরে তাদের আগ্রহের কমতি নেই। তারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ-তরুণী। তাদের অনেকে কিন্তু আগে ভোট দিতে পারেনি। তারাই নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন।”
কুষ্টিয়া-১ আসনের ভোটার আলপনা খাতুন। ২০১৩ সালে ভোটার তালিকায় নাম উঠে এই নারীর। তবে কোনও নির্বাচনে ভোট দেননি তিনি। পুরোনো অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে আলপনা খাতুন বলেন, “আমি ভোটের জন্য গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগেই কেউ একজন আমাকে বললো, সেখানে যাওয়ার দরকার নেই। আমার ভোট কাস্ট হয়ে গেছে।”
এবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন জানিয়ে এই নারী বলেন, “অবশ্যই ভোট দেবো।”
সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন অনেকে
নরসিংদী-৪ আসনের ভোটার হজরত হানিয়া রাতুল। গত নির্বাচনে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন এই নারী। এবারের নির্বাচন নিয়ে তিনি শঙ্কায় রয়েছেন। তার মতে, এবারও একপাক্ষিক নির্বাচন হতে পারে। হানিয়া বলেন, “আমি জানি নির্বাচনের ফলাফল কী হবে। এবার সংসদ নির্বাচনের ভোট না দিলেও গণভোটের জন্য আমি কেন্দ্রে যাবো। সংস্কারের জন্য হ্যাঁ ভোট দেবো আমি।”
তরুণদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে পরিবর্তনের দাবি
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নতুন ভোটাররা পরিবর্তনের আশায় রয়েছে। তারা আগের রাজনীতি দেখতে পছন্দ করছেন না। কর্মসংস্থানের সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা, সুশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও আধুনিক নাগরিক সুবিধা তরুণ ভোটারদের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার্থীদের মাঝেও এসব আশা দানা বাঁধছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আফরোজা খন্দকার বলেন, “শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি অগ্রাধিকারে থাকতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “যদি শিক্ষার মান উন্নত না করা হয় এবং আশানুরূপ কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করা যায় তাহলে তরুণ-তরুণীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে থাকবে। এই কারণেই আগামী নির্বাচনে বিষয়গুলো নতুন ভোটারদের প্রায়োরিটিতে থাকবে।”
একই কথা জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী অনিক কুন্ডু। তিনি বলেন, “তরুণ ভোটারদের কাছে গণতন্ত্রই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঠিক গণতান্ত্রিক বিকাশ ছাড়া সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য ও সহিংসতার মতো সমস্যা সমাধান করা যাবে না। যদি এবারের ভোট গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে তাহলে অনেক কিছুর পরিবর্তন হবে।”
আনুগত্যের পরিবর্তন ও সিদ্ধান্তহীনতা
সম্প্রতি ইনোভেশন কনসাল্টিং একটি নির্বাচনি জরিপ প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা গেছে, বয়স অনুযায়ী ভোটের পছন্দে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। তরুণ ভোটার, যাদের বয়স ১৮ থেকে ২৪ তারা জামায়াতে ইসলামীর দিকে ঝুঁকছে। তবে ৪৫ থেকে ৬০ বছর বয়সীরা বিএনপিকে সমর্থন করছে। ১৮ থেকে ৪৫ বছরের বয়সের মধ্যে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে, বিশেষ করে ২৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে।
ইনোভেশন কনসাল্টিংয়ের পরিচালক রুবায়েত সারোয়ার বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে আমরা বেশ কয়েকটি জরিপ চালিয়েছে। তবে জরিপে অংশ নেওয়া জেন-জির অনেকে এখনও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। তরুণ ভোটারদের একটি বিরাট অংশ সুইং ভোটার। তারা পরিবর্তন চাচ্ছে।”
আসন্ন নির্বাচনের বৃহৎ বিজয়ের প্রত্যাশা নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, “বেশির ভাগ আসনে ভোটের ব্যবধান হতে পারে ৮, ১০ বা ১২ শতাংশ। ১২ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে।” কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে অনেক ভোটার নতুন রাজনৈতিক দলকে ভোট দিতে পারেও বলে ইঙ্গিত দিয়েছে রুবায়েত। নির্বাচনের শেষ সময়ের প্রচারণায় সহিংসতা বাড়তে পারে বলে হুঁশিয়ারি করেছেন তিনি।
ইসির সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। মোট ভোটারের ৩০ শতাংশ দলটি সমর্থক বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, এনসিপিসহ বেশিরভাগ বামপন্থি ও ইসলামিক দল অংশ নিচ্ছে। জরিপ অনুযায়ী, এই নির্বাচনে মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মধ্যে।
তরুণ ভোটারদের চিন্তায় কি
প্রথমবারের মতো ভোটারদের মধ্যে অংশগ্রহণই প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। পাবনা-৩ আসনের ভোটার আব্দুল্লাহ আল সাফি। নতুন এই ভোটার বলেন, “ভোটের মাধ্যমে আমরা নিজের পছন্দ প্রকাশ করতে পারি।” তিনি আরও বলেন, “যেহেতু গণতন্ত্র আমাকে আমার প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে, তাই আমি ভোট দেবো।” স্থানীয় কৃষি সমস্যাগুলো নতুন এই ভোটারের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে বলে জানান তিনি।
অনেক তরুণ এখনও সিদ্ধান্তহীনতায়
ঢাকা-১৪ আসনের ভোটার মুনতাহা রহমান মানামি। প্রথমবারের মতো ভোটার হওয়া এই নারী আসন্ন নির্বাচনকে ‘সুপরিকল্পিত’ আখ্যা দিয়েছেন। মানামি বলেন, “এমন প্রহসনমূলক নির্বাচনে আমি আমার প্রথম ভোট নষ্ট করতে চাই না। আমি এখনও সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছি। যে প্রার্থী জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করবে আমি তাকেই বেছে নেবো।”
মানামির মতো চিন্তা করছেন না ব্র্যাকে চাকরি করা তরুণ সৈকত আদনান। তার কাছে এবারের নির্বাচনি পরিবেশ আলাদা। আদনান বলেন, “গতবার আমি ভোট দিতে পারিনি। এবার আমি এমন একটি দলকে সমর্থন করবো, যারা কিনা গণতন্ত্রের উন্নয়ন করবে। এছাড়া মৌলিক চাহিদা পূরণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থায় যারা কাজ করবে আমি তাদের সঙ্গেই থাকবো।”
তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব
তরুণ ভোটারদের প্রভাবের বিষয়টি আন্ডারলাইন করা আছে নির্বাচন কমিশনের বয়সভিত্তিক ভোটারদের তথ্য। ইসির তথ্যমতে, ১৮ থেকে ২১ বছরের মধ্যে ভোটার ৮৫ লাখ ৩০ হাজার, ২২ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে এক কোটি ৯৬ লাখ দুই হাজার, ২৬ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে এক কোটি ২২ লাখ দুই হাজার এবং ৩০ থেকে ৩৩ বছরের মধ্যে ভোটার রয়েছে এক কোটি ৬৮ লাখ সাত হাজার। আর ৬০ বছরের বেশি বয়সের ভোটার এক কোটি ৯৩ লাখ পাঁচ হাজার।
নির্বাচন সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলে তরুণ ভোটাররা মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। যদি তরুণ ভোটাররা একটি নির্দিষ্ট পার্টিকে ভোট দেয় তাহলে ফলাফলে পরিবর্তন চলে আসবে।”
ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে জামায়াত সমর্থিতরা ভালো ফলাফল করলেও সংসদ নির্বাচনে এর প্রভাব থাকবে কিনা তা নিয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলতে পারেনি বদিউল আলম। তিনি বলেন, “সংসদ নির্বাচনে কি হবে তা এখন একটি খোলা প্রশ্ন।”
ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি সম্পন্ন
আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন। ইসির সিনিয়র সচিব আক্তার আহমদ বলেন, “সারা দেশের ৪২ হাজার ৭৬৬টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এসব কেন্দ্রে দুই লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি বুথ থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “আসন্ন নির্বাচনে সাত লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার দায়িত্বে থাকবেন।”