পোস্টাল ব্যালটে এবারই প্রথমবার প্রবাসী ও দেশের অভ্যন্তরে থাকা সরকারি কর্মকর্তা এবং কারাবন্দিদের ভোটগ্রহণ চলছে। তবে এই ব্যবস্থা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন শঙ্কা। ১৫ বছরে ভোট ব্যবস্থা নিয়ে যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে তা থেকে বের হতে পারছে না মানুষ। তাই পোস্টাল ব্যালটে ভোটের গোপনীয়তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। প্রবাসী এবং দেশের অভ্যন্তরে থাকা একাধিক ভোটার তাদের শঙ্কার কথা জানিয়েছেন মানবজমিন-এর সঙ্গে আলাপে।
তারা বলছেন, পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেয়ার সময় ঘোষণাপত্রে সাইন স্বাক্ষর দিতে হয়। সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দেয়া থাকে। ফলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তা যখন ব্যালট খুলবেন তখন একজন ভোটার কোথায় কোন প্রতীকে ভোট দিলেন সেটা দেখে ফেলতে পারেন। এতে করে ওই ভোটারের গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার শঙ্কা থেকেই গেল। যদিও বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট করেছেন পোস্টাল ব্যালটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইসি কর্মকর্তারা। তারা বলছেন- এ প্রক্রিয়ায় গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার কোনো ভয়ই নেই। সেই সঙ্গে ইসি’র ওপর বিগত দিনের অনাস্থা কাটিয়ে আস্থা ফেরাতে বলেছেন সাংবিধানিক এই সংস্থাটির কর্মকর্তারা। পাশাপাশি ভোটারদের নির্ভয়ে ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ওমান প্রবাসী মুনজুরুল তাপস নামের এক ব্যক্তি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেয়ার পর যোগাযোগ করেছেন মানবজমিন-এর সঙ্গে। তার শঙ্কা ঘোষণাপত্রে তার এনআইডি নম্বর উল্লেখ করতে হয়েছে। যেখানে ক্রমিক নম্বর ব্যালট ও ঘোষণাপত্র একই। তাপস বলেন, ভোট দেয়ার সময় বিষয়টি নিয়ে একদমই ভাবিনি। পরে মনে হয়েছে। আমার ভোট কোথায় দিলাম সেটা কেউ জেনে গেল কিনা!
একই দেশে বসবাস করা মাসুদ নামের আরেকজন জানান- তার শঙ্কার কথা। তিনি বলেন, পোাস্টাল ব্যালট খুবই ভালো প্রক্রিয়া। ভোট দিয়ে বেশ ভালো লেগেছে। এ ধরনের প্রক্রিয়া আমার মতে দেশে যারা থাকেন তাদের ক্ষেত্রেও করা উচিত। তাহলে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে কষ্টটা করা লাগবে না। কিন্তু ভয় হচ্ছে- আমার ভোটের গোপনীয়তা থাকবে কিনা। রিটার্নিং কর্মকর্তা আমার ভোটটি দেখে ফেলবেন কিনা?
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী রীতা মানবজমিনকে বলেন, এত বছর পর ভোট দিতে পেরে খুব আনন্দ লেগেছে। আমার বাবাও ভোট দিয়েছেন। কিন্তু পোস্টাল ব্যালটের ঝামেলা হচ্ছে কোনো কারণে আমার ভোটের তথ্য অন্য কেউ জানবে কিনা। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা রনিও বলেন, ব্যালটের গোপনীয়তাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে আমরা আবার ১৫ বছর পিছিয়ে যাবো।
প্রবাসের পাশাপাশি দেশের ভেতরে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদেরও একই শঙ্কা। নূর মোহাম্মদ নামের এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এনআইডি নাম্বার ঘোষণাপত্রে উল্লেখ থাকায় একটু টেনশন হচ্ছে। ভোট কিসে দিলাম সে তথ্য কেউ কি দেখলো কিনা!
অপরদিকে ফেনীর ফুলগাজী থেকে সরকারি স্কুলের শিক্ষক ফিরোজ আহমেদ বলেন, এখান থেকে তো সবই স্বচ্ছ মনে হয়েছে। কিন্তু ঘোষণাপত্র নিয়ে চিন্তা হচ্ছে। পোস্টাল ব্যালটের গোপনীয়তা নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে তা একেবারেই ভিত্তিহীন বলে মনে করেন নির্বাচন কমিশনের ওসিভি এবং আইসিপিভি প্রকল্প পরিচালক ড. সালীম আহমাদ খান। তিনি জানান, মানুষের ভোট ব্যবস্থার উপর যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে সেখান থেকেই মূলত সন্দেহ হচ্ছে। এ নিয়ে শঙ্কা সন্দেহ কিংবা অবিশ্বাস করার মতো কিছুই নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার বিকালে মানবজমিন-এর সঙ্গে আলাপকালে সালীম আহমাদ খান বলেন, ১৫ বছরে বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে ভোটারের আস্থা নষ্ট হয়েছে। সে কারণে এ জাতীয় শঙ্কা স্বাভাবিক। এ প্রশ্নগুলো উঠবে। এই আস্থার সংকট কাটতে এখনো আমাদের অন্তত তিনটি ভালো নির্বাচন করতে হবে। কিন্তু আমরা যে পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ এবং গণনা করব, তা সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ। এখানে শঙ্কার কোনো কারণ নেই।
কীভাবে ব্যালট খোলা হবে সেই প্রক্রিয়া জানাতে গিয়ে সালীম আহমাদ খান জানান, যখন পোস্টাল ভোটটি সবার সামনে গণনা করা হবে, তখন প্রথমে দেখা হচ্ছে- ঘোষণাপত্র আছে কি না। ওই সময় ব্যালটের খামটি খোলা হবে না। স্বাক্ষর দেখে ঘোষণাপত্রটি আলাদা করা হবে। গণনার সময় একটি থেকে আরেকটির ফিজিক্যাল সেপারেশন করা হবে। গণনাস্থলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। কেউ ছবি তোলার সুযোগ পাবেন না। যে প্রসেস ইনভলব আছে তাতে মুখস্থ করে ক্রমিক মেলানোর সুযোগ থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, সবার সামনে গণনার আগে রিটার্নিং অফিসার খাম খুলে খুলে দেখবেন, কে কোথায় ভোট দিয়েছেন তা জানবেন বা লিখে রাখবেন, তাহলে আর ৫ই আগস্ট হতো না বাংলাদেশে। এই সুযোগ ওখানে আছে বলে আমার মনে হয় না।
পোস্টাল ব্যালটের সঙ্গে ঘোষণাপত্রের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তিনি বলেন, কোনো ভোটার যাতে কোর্টে চ্যালেঞ্জ করতে না পারেন যে আমার ভোটটি আমি দেইনি সে জন্য ঘোষণাপত্রে একটি আট ডিজিটের ক্রমিক নম্বর রয়েছে। আবার ব্যালটেও একই ক্রমিক নম্বর রয়েছে। এই নম্বরগুলো র্যান্ডোমাইজ দেয়া। অর্থাৎ ডাক বিভাগ থেকে যে ক্রমিক নম্বরটি দেয়া হয়েছে একটানা। এটি এমন না যেকোনো নির্দিষ্ট আসনের জন্য বা কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রের জন্য আলাদা করে ক্রমিক নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। কোর্ট যদি আদেশ দেন, এই যে ম্যানুয়ালি করা হয়েছে, তখন ক্রমিক নম্বর মিলিয়ে মিলিয়ে ওই ব্যালটটি খুঁজে বের করে দেখা হবে। তখন চেক করে সত্যতা মেলানো হবে।
দেশে এলো ৩ লাখ ৮০ হাজার পোস্টাল ব্যালট
ডাকযোগে প্রবাসীদের দেয়া ভোটের প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার পোস্টাল ব্যালট দেশে পৌঁছেছে। ইসি’র ওসিভি-এসডিআই প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২৪টি পোস্টাল ব্যালট পৌঁছেছে তাদের কাছে।
পোস্টাল ব্যালটের অ্যাপের তথ্য বলছে, মোট ৪ লাখ ৮০ হাজার ৪১৬ জন প্রবাসী ইতিমধ্যে ভোট দিয়েছেন। তার মধ্যে ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫২ জন ভোট দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের পোস্ট অফিস বা ডাক বাক্সে ফিরতি খাম জমা দিয়েছেন।
‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারের পাশাপাশি দেশের ভেতরে তিন ধরনের ব্যক্তি নিবন্ধন করেছেন। নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি, নিজ এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী এবং আইনি হেফাজতে (কারাগারে) থাকা ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেয়ার সুযোগ রয়েছে।
এজন্য বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত দেশের ভেতরে ৬ লাখ ৬২ হাজার ১৯১ জন ভোটারের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠিয়েছে কমিশন। এর মধ্যে ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৪৭ জন ভোটার ব্যালট সংগ্রহ করেছেন। যাদের ২ লাখ ১১ হাজার ১২২ জন ভোটদান শেষ করেছেন এবং এদের মধ্যে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৫১৯ জন ভোটদান শেষে ডাক অফিস বা বাক্সে তাদের ব্যালট পাঠিয়েছেন।