গোমতীর তীর ঘেঁষা উপজেলা দেবিদ্বার। একক উপজেলা নিয়ে গঠিত এই নির্বাচনী আসনে ভোট নিয়ে উত্তাপ শুরু থেকেই। নানা ঘটনায় এই আসন এখন দেশ জুড়ে আলোচিত। বিএনপি’র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ার পর এখানে যে মেরূকরণ ছিল এখন তা আবার বদলে গেছে। বিএনপি’র পক্ষ থেকে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিনকে সমর্থন দেয়া হয়েছে। আর এতে তুমুল লড়াই জমে উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ ও জসিম উদ্দিনের মধ্যে।
বিএনপি’র দুর্গখ্যাত এ আসনে একতরফা দু’টি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তাদের ডামি প্রার্থী জিতলেও ৪টি নির্বাচনে আসনটিতে বিএনপি ভূমিধস জয় পেয়েছে। মূলত আসনটিতে বিএনপিকে একাই টেনে তুলেছেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি। তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণেই বারবার আসনটি ধরে রেখেছে বিএনপি। জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এবারো মুন্সিকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। এবার ভোটের মাঠও ছিল ব্যতিক্রম। প্রতিদ্বন্দ্বী পান ’২৪-এর জুলাইযোদ্ধা হাসনাত আবদুল্লাহকে। এতে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়ে বিএনপি। ভোটের প্রচার ও বাকযুদ্ধে দুজনে ছিলেন সমানে সমান। হঠাৎ ছন্দপতন ঘটে বিএনপি’র। প্রার্থী বৈধতা হারানোয় নিজেদের দুর্গ খ্যাত আসনটিতে ভোট করতে পারছে না বিএনপি। এতে ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। অনেকে ধরে নিয়েছিলেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পাচ্ছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তবে বিএনপি’র সমর্থন পেয়ে ইতিমধ্যে হাসনাতের জয়ের পথে অন্যতম বাধা হয়েছেন বিএনপি’র জোট শরিক গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিন। মাত্র ৪ দিন আগেও আলোচনার বাইরে থাকা ট্রাক প্রতীক এখন আলোচনার কেন্দ্রে। নিয়মিত শত শত কর্মী-সমর্থক নিয়ে শোডাউন দিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন জসিম উদ্দিন।
বিএনপি সূত্র বলছে, বুধবার কেন্দ্র থেকে ট্রাক প্রতীকের পক্ষে মাঠে নামার মৌখিক নির্দেশনা দেয়া হয়। দলীয় নির্দেশ পেয়েই ১৬টি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে বিএনপি’র নেতাকর্মীরা ট্রাকের পক্ষে প্রচারে নেমে পড়েন। এতে ভোটের হিসাব রাতারাতি পাল্টে গেছে। শাপলা কলিকে হটিয়ে জয়ের স্বপ্ন দেখছে ট্রাক প্রতীক।
দেবিদ্বার ডাকবাংলো এলাকায় ট্রাকের একটি প্রচারে অংশ নেয়া নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা হলে তারা মানবজমিনকে বলেন, আমরা আজ থেকে ট্রাকের প্রচারে নেমেছি। আমাদের দলীয় প্রার্থী বাদ পড়ার পরেই আমরা ট্রাকের প্রচারে এসেছি। গতকাল রাতে দলের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেয়া হয় ট্রাক প্রতীকের হয়ে কাজ করতে। তাই আমরা দুই ওয়ার্ডের সকল নেতাকর্মী নেমে পড়েছি। ষড়যন্ত্র করে আমাদের মঞ্জুরুল আহসান মুন্সিকে টিকতে দেয়া হয়নি। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ব্যালটের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রের জবাব দিয়ে দিবে মানুষ।
দেবিদ্বার সুপার মার্কেট এলাকায় শাপলা কলির একটি প্রচারণায় ভোটের হালচাল জানতে চাইলে আলম হোসেন নামের এক সমর্থক বলেন, দেবিদ্বারের জনগণ সব দলের এমপিকে দেখেছে। হাসনাত এমপি না হয়ে গত ১ বছরে দেবিদ্বারে যা উন্নয়ন করেছে অন্য কেউ ৪ বার এমপি হয়েও এত উন্নয়ন করতে পারেনি। আর হাসনাত গরিবের ছেলে, তার সবসময়ই গরিব অসহায় মানুষের প্রতি খেয়াল থাকবে। লাখ লাখ সাধারণ ভোটার হাসনাতের পক্ষে আছে। জয় তারই হবে। ট্রাক দিয়ে কখনো শাপলা কলিকে থামানো যাবে না। এতে জনগণ আরও তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হচ্ছে।
দেবিদ্বার পৌরসভার সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, মুন্সি মনোনয়ন পাওয়ার পরে বিএনপি’র নেতাকর্মীরা ৩টা গ্রুপ হয়ে যায়। কিন্তু তার মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় আবার সবাই এক হয়ে ট্রাক প্রতীকের প্রার্থীর পক্ষে নেমেছেন। ট্রাকের আগে তেমন হাঁকডাক না থাকলেও বিএনপি’র মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের সমর্থন পেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। এতে মুন্সি বাদ পড়লেও হাসনাত আবদুল্লাহ’র এখন ট্রাক মার্কার জসিম উদ্দিনের সঙ্গে লড়াই করতে হবে। সহজে জয়লাভের কোনো সুযোগ নেই। ইতিমধ্যে ট্রাক-শাপলা কলি হাড্ডাহাড্ডি প্রচারণা চালাচ্ছে। ভোটাররাও দুই ভাগ হয়ে গেছে।
রাজামেহার বাজার এলাকায় সবুর উদ্দিন প্রামাণিক বলেন, হাসনাত আবদুল্লাহ জনপ্রিয় নেতা। বাংলাদেশের সবাই তাকে চেনেন। দেবিদ্বারের সাধারণ মানুষ তাকে নির্বাচিত করতে দিন-রাত প্রচার করছেন। কিন্তু বিএনপি’র নেতারা হাসনাতকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। তারা মুন্সিকে হারিয়ে এখন ট্রাক প্রতীক নিয়ে মাঠে নেমেছে। ৭ দিন আগেও গণঅধিকারের প্রার্থী ট্রাকের কোনো খবর ছিল না, এখন বিএনপি’র সমর্থন পেয়ে রাতারাতি শক্তিশালী প্রার্থী হয়ে গেছে। দেবিদ্বারে ট্রাক-শাপলা কলি সমানে সমানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়।
হাসনাত আবদুল্লাহ’র গ্রাম সুবিল গ্রামের বাসিন্দা আজমত আলী বলেন, আদালতে মুন্সি বাতিল হওয়ার পর দেবিদ্বারের ৯০ শতাংশ মানুষ হাসনাতকে এমপি হিসেবে ধরে নিয়েছিল। আমরা মিস্টি বিতরণ করেছি। কিন্তু এখন বিএনপি নতুন গেইম খেলছে। তারা দুর্বল প্রার্থী ট্রাকের জসিম উদ্দিনকে সমর্থন দিচ্ছে। ট্রাকের পক্ষে মাঠে নেমেছে। এতে ভোটের লড়াই আবার জমে উঠেছে। বিএনপি’র ৩টি গ্রুপ এক হয়ে হাসনাতকে ঠেকাতে মাঠে নেমেছে। এখন মনে হচ্ছে ভোটের হাল উল্টে যাচ্ছে। হাসনাত জিতলেও ট্রাকের সঙ্গে হাড্ডিহাড্ডি লড়াই হবে, এটা মোটামুটি নিশ্চিত।
গুনাইঘর ইউনিয়নের লস্করপুর গ্রামে মো. সামাদ ফকির বলেন, মাত্র ৫ দিন আগেও প্রচার প্রচারণার সময় গণঅধিকারের প্রার্থী জসিম উদ্দিনের সঙ্গে ৫ থেকে ১০ জন মানুষ দেখেছি। কিন্তু মুন্সি বাদ পড়ার পার জসিমের সঙ্গে শত শত মানুষ। এতো মানুষ জসিম কোথায় পেলেন। পরে দেখা গেলো তার আশপাশে সব বিএনপি’র লোক। ধানের শীষ বাতিল হওয়ায় বিএনপি’র লোকজন এখন ট্রাকের পক্ষে নেমেছে। এতে হাসনাত আবদুল্লাহর চাপ বেড়ে গেছে। সহজে জেতার স্বপ্ন মুহূর্তে কঠিন হয়ে গেছে। বিএনপি যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাকের পক্ষে নেমে পড়ে তাহলে হাসনাত আবদুল্লাহর জেতার সম্ভাবনা কম। দেখা যাক কি হয়।
কাশিনগর গ্রামের হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, আগে মুন্সি আর হাসনাত আব্দুল্লার লড়াইয়ের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আদালতে মুন্সি বাদ পড়ার পর বিএনপি এখন ট্রাকের জসিম উদ্দিনের পক্ষে নেমেছে। এতে হাসনাতের জয় অনিশ্চিত হয়ে গেছে। কঠিন ভোট লড়াই হবে বলে মনে হচ্ছে। দেবিদ্বার মুক্তিযুদ্ধ চত্বরের পাশে আজগর হোটেলের কথা হয় রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি বলেন, গতকাল ট্রাকের শোডাউন দেখে অবাক হয়েছি। এতো লোক তারা কোথায় পেলো। পরে শুনলাম বিএনপি’র লোকজন তাকে দিয়ে হাসনাতকে হারানোর পরিকল্পনা করছেন। বিএনপি’র সবপক্ষ এক হয়ে ট্রাকের জসিম উদ্দিনের ভোট করছে। এতে হাসনাতকে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব এএফএম তারেক মুন্সি মানবজমিনকে বলেন, দল থেকে আমাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ট্রাকের পক্ষে কাজ করতে। আমি অলরেডি আমার সকল নেতাকর্মীকে ডেকে ট্রাকের পক্ষে কাজ করতে বলেছি। আমি নিজেও কাল থেকে মাঠে নামবো। আশা করি আমরা কেন্দ্রের নির্দেশনা পালন করে ট্রাককে জয়যুক্ত করতে পারবো।
গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, আমি মাঠে গিয়ে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের প্রচুর সাড়া পাচ্ছি। তারা আমার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। বিএনপি’র ভোটাররাও আমাকে ভোট দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ভোটাররা বলছেন বিএনপি থেকে যার পক্ষে নামতে বলবে আমরা তার পক্ষে ভোট দিবো।
এ বিষয়ে মঞ্জরুল আহসান মুন্সি মানবজমিনকে বলেন, দল থেকে আমাকে ট্রাকের পক্ষে কাজ করতে বলেছেন। আমি জসিম উদ্দিনকে ডেকেছি এবং তাকে সমর্থন দিয়েছি। আমার নেতাকর্মীরা ইতিমধ্যে তার পক্ষে নেমে পড়েছে। আমার সঙ্গে যে ষড়যন্ত্র হয়েছে, ১২ই ফেব্রুয়ারি ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ তার জবাব দিয়ে দিবেন।
গতকাল দেবিদ্বার পৌরসভার চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ ও নির্বাচনী প্রচারণা চালান শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ। রাতে চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকার সমাবেশে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের নেতারা বক্তব্য রাখেন। সেখানে হাসনাত আবদুল্লাহ তার বক্তব্যে বলেন, এলাকার উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ শাপলা কলিকে বিজয়ী করবে।
উল্লেখ্য, আসন্ন সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পান সাবেক এমপি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি। তবে ঋণখেলাপির অভিযোগে হাইকোর্ট ও নির্বাচন কমিশন তার প্রার্থিতা বাতিল করেন। পরে চেম্বার আদালত পেরিয়ে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়ায়। পরে আপিল বিভাগ তার লিভ টু আপিল খারিজ করে দেন। এতে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে যান। এতে কপাল খুলে যায় বিএনপি’র জোটসঙ্গী গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিনের। দলীয় প্রার্থী না থাকায় বিএনপি’র পক্ষ থেকেও জসিম উদ্দিনকে সমর্থন দেয়া হয়। পরে মঞ্জরুল আহসান মুন্সি, কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব এএফএম তারেক মুন্সি, সাবেক ছাত্রনেতা এমএ আউয়াল খানও ট্রাকের পক্ষে প্রচারণায় নামেন। এ ছাড়া স্থানীয় ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দলের নেতারা ট্রাকের পক্ষে নেমেছেন। এতে রাতারাতি ভোটের হিসাব পাল্টে যায়। শাপলা কলি ও ট্রাকের মধ্যে তুমুল লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয় পার্টির মাধ্যমে রাজনীতিতে আসেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি। ১৯৮৬ সালে তিনি প্রথমবার জাপা থেকে এমপি হন। পরে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পরপর ৩ বার এমপি হন। এতে তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। স্থানীয় ভোটারদের কাছে সুপরিচিত মুখ মঞ্জুরুল মুন্সি। দেবিদ্বারে যত উন্নয়ন হয়েছে তা এই নেতার হাত ধরেই শুরু হয়। এরপর দু’টি একতরফা ভোটে আওয়ামী লীগ ও তাদের ডামি প্রার্থী জয়লাভ করলেও কুমিল্লা-৪ আসন এখনো মুন্সির দুর্গ হিসেবেই জনশ্রুতি আছে। এজন্য ভোটের হিসাব নিকাশে মুন্সির অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। কুমিল্লা-৪ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজার ৫৫৯। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৫ হাজার ২৩৭টি ও নারী ভোটার ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩১৯ ভোট।