Image description
সংঘাত-সহিংসতার শঙ্কা

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ততই বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো আসনে সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। পুলিশের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত দেশের অর্ধশতাধিক আসনে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে- নির্বাচনের আগে ও পরে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে। এমনকি খুন-খারাবি, গুপ্তহত্যা, টার্গেট কিলিংয়ের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ইতিমধ্যে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ আসন শনাক্ত করেছে। যেসব আসনে সংঘাত-সহিংসতার বেশি শঙ্কা রয়েছে। এরমধ্যে কিছু আসনকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ও মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এ সব তথ্য মাঠ পর্যায়ের পুলিশের কাছে পৌঁছে দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। গোয়েন্দারাও এ সব আসনে বেশি নজর দিচ্ছেন। ফের যাতে এ সব আসনে কোনো ঘটনা না ঘটে- সেদিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে পুলিশ। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। গোয়েন্দারা মনে করছেন, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় আগামীতে আরও বড় ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। তাই এ সব এলাকার ছোট-বড় সন্ত্রাসী, কিলার, শুটারসহ বিভিন্ন অপরাধীর তালিকা করে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা কোনো প্রার্থীর হয়ে কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের পাঁয়তারা করছে কি না সেদিকে নজর দিচ্ছে পুলিশ ও গোয়েন্দারা। 

পুলিশের একটি সূত্র গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ১৩টি আসনকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এ সব আসনে গোলাগুলি, ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, আধিপত্য ও পেশিশক্তি বিস্তার, ভোটারদের ভয় দেখানো, প্রচারণায় বাধাসহ নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই এ সব আসনকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া ও সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া প্রার্থীরা যাতে নিরাপদে প্রচারণা, ভোটকেন্দ্রে যাওয়া-আসা, নির্বিঘ্নে যাতে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে, ঢাকা-৮, ঢাকা-১৫, ঢাকা-৭, পাবনা-১ ও ৩, খুলনা-৫, পটুয়াখালী-৩, বরিশাল-৫, টাঙ্গাইল-৪, শেরপুর-৩, কুমিল্লা-৪, নোয়াখালী-৬ ও চট্টগ্রাম-১৫। এই ১৩টি আসনের বাইরে আর ৪৫টি আসনকে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সেগুলো হলো- ঢাকা-১০, নারায়ণগঞ্জ-৩, ময়মনসিংহ-১০, ময়মনসিংহ-১১, নেত্রকোণা-৩, কিশোরগঞ্জ-৫, মানিকগঞ্জ-১, মুন্সীগঞ্জ-৩, ফরিদপুর-৪, সুনামগঞ্জ-২, মৌলভীবাজার-৩, কুমিল্লা-১১, চাঁদপুর-৪, নোয়াখালী-২, চট্টগ্রাম-১৪ ও চট্টগ্রাম-১৬, পঞ্চগড়-১, ঠাকুরগাঁও-১, ঠাকুরগাঁও-৩, লালমনিরহাট-১, ঝিনাইদহ-৪, যশোর-২, খুলনা-৪, সাতক্ষীরা-১, বরগুনা-২, পটুয়াখালী-২, ভোলা-১, বরিশাল-৩, পিরোজপুর-২, টাঙ্গাইল-৮, রংপুর-৩, রংপুর-৪, গাইবান্ধা-৫, বগুড়া-২, বগুড়া-৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, রাজশাহী-১, রাজশাহী-২, নাটোর-১, সিরাজগঞ্জ-৪, কুষ্টিয়া-১, কুষ্টিয়া-৩, চুয়াডাঙ্গা-১, ঝিনাইদহ-৩।  
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ৫১টি আসনে নির্বাচনী সংঘর্ষ হয়েছে। এ সব আসন হলো- ঢাকা-১৫, কুমিল্লা-১১, যশোর-৫, কুমিল্লা-৯, বাগেরহাট-১, খুলনা-৩, শরীয়তপুর-১, সিরাজগঞ্জ-১, ঢাকা-১২, ভোলা-৩, চট্টগ্রাম-২, ফেনী-৩, ফেনী-১, নারায়ণগঞ্জ-৪, লক্ষ্মীপুর-৩, ময়মনসিংহ-১, বগুড়া-৫, কিশোরগঞ্জ-৪, চট্টগ্রাম-১১, বরিশাল-১, মাদারীপুর-৩, ভোলা-২, ময়মনসিংহ-৯, লক্ষ্মীপুর-২, টাঙ্গাইল-১, খুলনা-২, সিরাজগঞ্জ-২, জামালপুর-৪, শরীয়তপুর-২, নারায়ণগঞ্জ-২, ঢাকা-৩, ঝালকাঠি-১, চট্টগ্রাম-১, পিরোজপুর-৩, ময়মনসিংহ-২, ঢাকা-৪ ও ভোলা-৪।  পঞ্চগড়-১, লালমনিরহাট-১, চুয়াডাঙ্গা-১, বরগুনা-২, পটুয়াখালী-৩, ভোলা-১, বরিশাল-৩, টাঙ্গাইল-৮, শেরপুর-৩, নেত্রকোণা-৩, মানিকগঞ্জ-১, মুন্সীগঞ্জ-৩, ঢাকা-৮। 

সংঘাত সহিংসতা ঠেকাতে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঝুঁকিপূর্ণ আসনের পাশাপাশি অন্যান্য আসনগুলোতে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। ভোটের নিরাপত্তায় প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী এক লাখ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী পাঁচ হাজার, বিমানবাহিনী তিন হাজার ৭৩০, পুলিশ এক লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড তিন হাজার ৫৮৫, র‍্যাব সাত হাজার ৭০০ এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ১৩ হাজার ৩৯০ জন। পুলিশের সূত্রগুলো জানিয়েছে, নির্বাচনে যাতে অবৈধ অস্ত্র ও পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহার করতে না পারে সন্ত্রাসীরা সেজন্য অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিটি থানা এলাাকায় তালিকা ধরে ধরে বিভিন্ন ধরনের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এছাড়া আয়ত্তের বাহিরে থাকা সন্ত্রাসী ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। গোয়েন্দারা ইতিমধ্যে শতাধিক পেশাদার শুটার ও কিলারের তালিকা করে তাদের গতিবিধি মনিটরিং করছে। ভোটের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও বডি অর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। 

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, এবার নির্বাচনে সহিংসতা, সংঘর্ষ, গুলি, গুপ্তহত্যা, টার্গেট কিলিংয়ের মতো ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ, ঘটে যাওয়া ঘটনা বিশ্লেষণ, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনা, ছোট-বড় অপরাধীদের তৎপরতা, জেল থেকে পালানো বন্দিদের ধরতে না পারা, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্ত হওয়াসহ বেশ কিছু কারণে এবারের আশঙ্কাটা অতীতের তুলনায় একটু বেশি। নাশকতা সহিংসতা বেশি হতে পারে এমন কিছু জেলাকেও তালিকায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। হেভিওয়েট প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এমন কিছু জেলাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জোর দেয়া হয়েছে। যেসব এলাকায় আগের নির্বাচনগুলোতে সহিংসতা, অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। 

গোয়েন্দারা বলছেন, খুন-খারাবির আশঙ্কা থেকে কোনো এলাকাকেই কম গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। কারণ যে এলাকায় নির্বাচনী গুপ্তহত্যা ও টার্গেট কিলিংয়ের মতো ঘটনা ঘটবে সেই এলাকার নির্বাচনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি দুর্বৃত্তরা গোলাগুলি, ককটেল বিস্ফোরণ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে যাতে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি করতে না পারে সেদিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ভোটকেন্দ্র দখল, আধিপত্য বিস্তারসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে না পারে সেটিও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর সন্ত্রাসী, কিলার, শুটার, পেশাদার অপরাধীদের তালিকা ধরে জেলা পুলিশ কাজ করছে। 

এদিকে, আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি গবেষণা বলছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ৩৬ দিনের মধ্যে ১৫ রাজনৈতিক নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতা, ১০২ নিহত, ১ হাজার ৩৩৩ অস্ত্র নিখোঁজ, ডিপফেক ও ভুল তথ্যের বাড়তি হুমকি, সংখ্যালঘুদের ওপর ৫০-এর বেশি হামলার ফলে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।