বাংলাদেশের নির্বাচন মানেই শুধু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক পরীক্ষা। ভোটের পরিবেশ কতটা শান্ত থাকবে, ভোটার নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে যেতে পারবেন কি না, ফলাফল ঘোষণার পর পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে কি না—এসব প্রশ্ন প্রতিটি নির্বাচনেই সামনে আসে। এই অনিশ্চয়তার পটভূমিতে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি অনেক সময় জনগণের কাছে আশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠে। শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার কারণে সেনাবাহিনীকে মানুষ শেষ ভরসা হিসেবে দেখেন।
ইতিহাস বলছে, সংকটকালে সেনাবাহিনী বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে তাদের ভূমিকা জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। নির্বাচনকালেও এই অভিজ্ঞতা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। অতীতের নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, যেখানে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিল সুসংগঠিত ও দৃশ্যমান, সেখানে সহিংসতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম ছিল এবং ভোটারদের অংশগ্রহণে এক ধরনের মানসিক স্বস্তি তৈরি হয়েছিল।
১২ ফেব্রুয়ারি ঘিরে জনমনে যে প্রত্যাশা, তার মূল কারণও এখানেই। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার ঘাটতি, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং সামাজিক মাধ্যমে গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার ভোটের মাঠকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীকে দেখা হচ্ছে এমন একটি শক্তি হিসেবে, যারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এবং বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। জনগণ আশা করছে, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ভোটের মাঠে শান্তি ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করবে।
তবে এই প্রত্যাশার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও জড়িত। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ও বেসামরিক প্রশাসনের। সেনাবাহিনী সেখানে সহায়ক শক্তি—নির্ধারক নয়। ঐতিহাসিক ভূমিকা বলতে এখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নয়, বরং সংবিধান ও আইনের আওতায় থেকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্বশীল ভূমিকার কথাই বোঝানো হচ্ছে। এই সীমারেখা স্পষ্ট না হলে প্রত্যাশা যেমন বাড়ে, তেমনি বিতর্কও বাড়তে পারে।
জনগণের অপেক্ষার আরেকটি দিক হলো আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠা। অনেক ভোটার মনে করেন, সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকলে প্রভাব বিস্তার, কেন্দ্র দখল বা প্রকাশ্য ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঝুঁকি কমে। এটি বাস্তবের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ও। মানুষের মনে যদি নিরাপত্তার অনুভূতি না থাকে, তাহলে ভোটাধিকার প্রয়োগ অর্থহীন হয়ে পড়ে। সে কারণে ১২ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রত্যাশা মূলত ভোটার আস্থা পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত।
এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও কম নয়। সেনাবাহিনীর ওপর অতিরিক্ত প্রত্যাশা চাপিয়ে দিলে কিংবা তাদের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী হিসেবে সেনাবাহিনীকে নিরপেক্ষ ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখাই সবার স্বার্থে। নির্বাচনকালীন সময়ে রাজনৈতিক সংযম, দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং সহিংসতা থেকে দূরে থাকার মানসিকতা না থাকলে শুধু সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দিয়েই কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়।
বর্তমান সময়ে নির্বাচন আরও একটি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—গুজব ও অপতথ্য। সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভুল তথ্য অনেক সময় মাঠের বাস্তব পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী সরাসরি তথ্যযুদ্ধে অংশ না নিলেও মাঠপর্যায়ে তাদের দৃশ্যমান উপস্থিতি গুজবের প্রভাব অনেকাংশে কমাতে পারে। মানুষ যখন দেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে, তখন আতঙ্ক ও উত্তেজনাও স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পায়।
সবশেষে বলা যায়, ১২ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনীর আরেকটি ঐতিহাসিক ভূমিকা দেখার যে অপেক্ষা জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছে, তা মূলত শান্তিপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই এসেছে। এই ভূমিকা যদি সংবিধানসম্মত, সীমাবদ্ধ ও পেশাদার হয়, তাহলে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ মানে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করা নয়, বরং ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্য পূরণে সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা সত্যিই ইতিহাসের পাতায় একটি ইতিবাচক অধ্যায় যোগ করতে পারে।
লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক