Image description

নির্বাচিত এমপিদের শপথ পড়াবেন কে? বিদায়ী সংসদের স্পিকার কোথায়? হাসিনা আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের রুলই বা-কি হবে? এমন বহু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। যার জবাবে ধোঁয়াশা বিদ্যমান। তবে এটা নিশ্চিত যে, সব অনিশ্চয়তা ঠেলে নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে দেশ। জোরকদমে ভোটের পথে এগিয়ে চলছেন স্টেকহোল্ডাররা। রেফারির ভূমিকায় নির্বাচন কমিশন। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং গতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে বর্তমান ইসি’র প্রতি এখনো আস্থাশীল রাজনৈতিক দলগুলো। এ অবস্থায় বোদ্ধারা আশা করছেন- ১২ই ফেব্রুয়ারি কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হবে। যার মধ্যদিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটবে ‘কক্ষচ্যুত’ বাংলাদেশের। 

ভোটের ফল কী হতে পারে? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনের সম্ভাব্য ফল কী হতে পারে তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। কোনো দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে নাকি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হবে? এসব নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা এখন রাজনীতি ও কূটনৈতিক মহলে। একইসঙ্গে আলোচনায় আছে নির্বাচনে বিজয়ী পক্ষের গঠন করা সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর কীভাবে হবে এবং নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া কী- তা নিয়েও।

এ নিয়ে বিবিসি বাংলা একটি রিপোর্ট করেছে। তাতে বলা হয়- ৩০০ আসনে এমপি এবং সংস্কারের পক্ষে-বিপক্ষে গণভোটে অংশ নিতে পারছে না ’২৪-এর আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। ফলে দৃশ্যত এবারের ভোটের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াত। নির্বাচনে কোনো দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসতে পারে কি-না তা নিয়ে যেমন কৌতূহল আছে, তেমনি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি-না সেদিকেও দৃষ্টি অনেকের।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদের মতে, একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য কোনো দল বা জোটকে কমপক্ষে ১৫১টি আসন পেতে হবে।  সাধারণত একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দলের প্রধানকেই সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়ে থাকেন প্রেসিডেন্ট। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও বেশি আসনে জয়ী দলকে তখন সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। সে ক্ষেত্রে ওই দলকে অন্য দলের সমর্থন যোগাড় করতে হয়।

ঝুলন্ত পার্লামেন্ট কী: অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ মনে করেন- সাধারণত নির্বাচনে কোনো সংসদে যদি কোনো একক দল বা জোট হিসেবে সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, সেই পরিস্থিতিটাই ঝুলন্ত পার্লামেন্ট। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার চালু আছে এমন দেশে সরকার গঠন করার জন্য বিভিন্ন দলের মধ্যে জোট বা সমঝোতা প্রয়োজন হয়।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সংবিধানে যে সব বিষয় যুক্ত হবে: ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিনেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। এই দিন আলাদা ব্যালটে ভোটাররা হ্যাঁ বা না ভোট দিবেন।  ওই নির্বাচনে হ্যাঁ জয় পেলে আগামী সংসদে ৮৪টা ধারা বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। আর যদি না জয় পায় তাহলে জুলাই সনদ উচ্ছন্নে যাবে। হ্যাঁ জয় পেলে আগামী সংসদের সংবিধান সংস্কার পরিষদ ২৭০ দিন বা নয় মাসের মধ্যে জুলাই সনদ অনুযায়ী সাংবিধানিক সংস্কারে বাধ্য থাকবে। না করলে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া সংবিধান সংশোধনের বিল পাস বলে গণ্য করা হবে। 

প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী: ক্ষমতা ও ভারসাম্য

বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি হয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরে। এর ফলে মৌলিক অধিকার স্থগিত হয়। সনদে নতুন যে প্রস্তাবনা আনা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে- জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে। সেই সভায় বিরোধী দলীয় নেতা/উপনেতাও উপস্থিত থাকতে হবে। অন্যদিকে, জরুরি অবস্থার সময় সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকারসমূহ খর্ব করা যাবে না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয় সংসদ সদস্যদের ভোটে। এই ভোট দিতে হয় প্রকাশ্যে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রপতি।

রাষ্ট্রপতি তার নিজ ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেন বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করতে দুই তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের ভোটের প্রয়োজন হয়। জুলাই সনদে সেখানে সংসদের উভয় কক্ষের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ দুই কক্ষের দুই তৃতীয়াংশের ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে। আগে সরকারের অনুমোদনে যেকোনো অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারতেন রাষ্ট্রপতি। জুলাই সনদে বলা হয়েছে- শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবার সম্মতি দিলে অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি। জুলাই সনদে বলা হয়েছে- এক ব্যক্তি এক জীবনে ১০ বছরের বেশি অর্থাৎ দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। 

সংসদ, নির্বাচন ও সরকার ব্যবস্থা

বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই। জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করার পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান উপদেষ্টাসহ এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি দল, বিরোধী দল, দ্বিতীয় বিরোধী দলের মতামতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হবে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশের সংসদ এক কক্ষ বিশিষ্ট থাকলেও এবার জুলাই সনদে সেটি দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা হবে ১০০ জন। সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারেই উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন করা হবে বলেও জুলাই সনদে বলা হয়েছে। দেশের জাতীয় সংসদে বর্তমানে নারীদের সংরক্ষিত আসন রয়েছে ৫০টি। সেটি ক্রমান্বয়ে ১০০তে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে জুলাই সনদে। গণভোটে সনদ কার্যকর হলে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন বিরোধী দল থেকে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদে এমপিরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়।

তবে, জুলাই সনদে বলা হয়েছে- বাজেট ও আস্থাবিল ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে। এতদিন বিদেশের সঙ্গে সরকারের কোনো চুক্তি করতে হলে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন হতো না। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে- রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো চুক্তি করতে হলে সংসদের উভয় কক্ষে তা অনুমোদন করতে হবে। সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে এতদিন নির্বাচন কমিশনের একক কর্তৃত্ব থাকলেও গণভোটে জুলাই সনদ পাস হলে একক কর্তৃত্ব হারাবে ইসি। তখন ইসি’র সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটিও এই দায়িত্ব পালন করবে। এর আগে নানা নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি থাকলেও এর নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীর হাতে। জুলাই সনদে বলা হয়েছে- স্পিকারের সভাপতিত্বে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং আপিল বিভাগের বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। হ্যাঁ জিতলে সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে। সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে বলা আছে রাষ্ট্রপতি যে কাউকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন। তবে, জুলাই সনদের এই অংশে বলা হয়েছে- বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে আপিল বিভাগ থেকে। 

আইন সংশোধনে সংস্কার হবে ৩৭টি

৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কারের বাইরে আর যে ৩৭টি সংস্কার প্রস্তাব আছে জুলাই সনদে সেগুলো সংশোধন করা যাবে ‘আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে। আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংসদের কমিটিসমূহ ও সদস্যদের বিশেষ অধিকার, অধিকারের সীমা এবং দায় নির্ধারণের অঙ্গীকার থাকছে জুলাই সনদে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সীমানা পুনঃনির্ধারণে আইন প্রণয়ন, বিচারকদের জন্য অবশ্য পালনীয় আচরণবিধি, সাবেক বিচারপতিদের জন্য অবশ্য পালনীয় আচরণবিধি, সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস গঠন, বিচার বিভাগের জনবল বৃদ্ধি, জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থাকে অধিদপ্তরে রূপান্তর, বিচারক ও সহায়ক কর্মচারীদের সম্পত্তির বিবরণ, আদালত ব্যবস্থাপনা সংস্কার ও ডিজিটালাইজ করা, আইনজীবীদের আচরণবিধি সংক্রান্ত বিষয় রাখা হয়েছে ‘আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কারের জন্য।

এ ছাড়া জনপ্রশাসন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি স্বাধীন ও স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন, প্রজাতন্ত্রের কর্মে জনবল নিয়োগের জন্য সরকারি কর্ম কমিশন (সাধারণ), সরকারি কর্ম কমিশন (শিক্ষা) এবং সরকারি কর্ম কমিশন (স্বাস্থ্য) গঠন করার কথা বলা হয়েছে জুলাই সনদে। অন্যদিকে, ভৌগোলিক অবস্থান ও যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুইটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠন করার কথাও বলা হয়েছে জুলাই সনদে।