Image description

জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন-দুর্নীতিতে যে দল দেশকে চ্যাম্পিয়ন করেছে তাদের এবার নির্বাচনে লাল কার্ড দেখাবে জনগণ। এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, শীতে মাথা গরম করলে চৈত্র মাসে কী করবেন। চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, রাজার ছেলে রাজা হবে, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হবে- সেই সংস্কৃতির ধারা আমরা পাল্টে দিতে চাই। গতকাল সকালে ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুল মাঠে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় বক্তৃতায় এ মন্তব্য করেন তিনি। এসময় মা-বোনদের ওপর নির্যাতন ও অপমান কোনোভাবে মেনে নেয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, বীরেরা পালায় না, তারা রুখে দাঁড়ায়। জামায়াত আমীর বলেন-বেকার ভাতা দিয়ে কাউকে অপমান করা হবে না, ক্ষমতায় গেলে কর্মসংস্থান তৈরি করবে জামায়াত। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে মা-বোনদের ঘরের বাইরে যেতে দেবে না এমন গুজব ছড়ানো হচ্ছে মন্তব্য করে দলটির আমীর বলেন, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যাচার। বরং জামায়াত মায়ের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে। নারীদের ভোট জামায়াতের দিকে হেলে পড়েছে মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, তারা জানে না মায়েদের দৃষ্টি এখন পরিবর্তনের দিকে। আলেম ওলামাদের নিয়েও নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে একটি দল সুযোগ নিতে চায় দাবি করে তিনি বলেন, জামায়াত কখনো কওমি মাদ্রাসার বিপক্ষে ছিল না, যাবেও না। 

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১দলীয় জোট ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ চায় বলেও জানান তিনি। কালো চিল যেন আকাশ থেকে নেমে এসে ‘ছোঁ’ মেরে বিজয় ছিনিয়ে নিতে না পারে সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে জোট নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। ‘হ্যাঁ-না ভোট’ নিয়ে জামায়াত আমীর বলেন-দলীয় প্রতীকের আগে ‘হ্যাঁ-না ভোট’। তাই সবাইকে কেন্দ্রে গিয়ে প্রথমে হ্যাঁ ভোট দিতে হবে, তারপর দিতে হবে দাঁড়িপাল্লাসহ জোটের প্রতীকে। তিনি ১৬ বছরে বিএনপি, জামায়াত, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষদের হত্যার বর্ণনা তুলে ধরেন। এসময় জনগণের ভোটে সরকার গঠন করতে পারলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও দুর্নীতিরোধে কোনো ছাড় দেয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াত আমীর। নাম উল্লেখ করে জামায়াত আমীর বলেন, পার্শ্ববর্তী একটি দেশ অনেক ক্ষেত্রে আমাদের ওপর বৈরী আচরণ করে। ক্ষমতায় গেলে দেশটির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলে দেশের সমস্যা সমাধান করে উন্নয়ন করা হবে।

জামায়াত আমীর তার বক্তব্যে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অবদান তুলে ধরে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। এক সময় ফেনী সন্ত্রাসের জনপদ ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জনপদের মানুষ আর সে পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে চায় না। ফেনীসহ দেশের সব জেলায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন শফিকুর রহমান। সভায় এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বিএনপি’র কড়া সমালোচনা করে বলেন, ফ্যামেলি কার্ডের নামে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, এসব কার্ডের প্ররোচনা না দিয়ে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে জনগণকে বাঁচাতে কার্ডের ব্যবস্থা করুন। জেলা জামায়াতের আমীর মুফতি আবদুল হান্নানের সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাসুম, মজলিসে শূরা সদস্য অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, ডাকসু’র ভিপি সাদিক কায়েম, ফেনী-২ আসনে ঈগল মার্কার প্রার্থী এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঁইয়া, ফেনী-১ আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী এস এম কামাল উদ্দিন ও ফেনী-৩ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন।

আমাদের দলের লোকজন চাঁদাবাজ নয়, আমরা চাঁদাবাজি করি না
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, একটি পক্ষ জুলাই স্বীকার করতে চান না। তাদের বাচ্চা-কাচ্ছা, নাতি-পোতা বলেন। আমি বিস্মিত, লজ্জিত। যাদের কারণে জেল থেকে মুক্তি, দেশে ফিরে আসা, নির্বাচনের কথা বলা- তারা তাদের অস্বীকার করছেন। এটা মেনে নেয়া যায় না। যে উপকারের উপকার স্বীকার করে না, যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে ভালো মানুষ হতে পারে না। জুলাই বিপ্লবের পরে আমরা বলেছিলাম, আমরা কারও ওপর প্রতিশোধ নেবো না, আমরা নেই নাই। আমাদের দলের লোকজন চাঁদাবাজ নয়, আমরা চাঁদাবাজি করি না। আমরা দুর্নীতি করি না, দুর্নীতিকে আমরা ঘৃণা করি। দুর্নীতির সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। বলেছিলাম মামলাবাজি করবো না, মামলা বাণিজ্যও করবো না। মামলা দিয়ে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করবো না। গতকাল বিকালে লক্ষ্মীপুর সরকারি সামাদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, দেশবাসী রাজনীতির পুরনো বন্দোবস্ত দেখেছে, ৫৪ বছর দেখেছে। সে বন্দোবস্তে ফ্যাসিবাদ তৈরি হয়েছে। মানুষের অধিকার হরণ করেছে। দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। চাঁদাবাজিতে জনগণকে অতিষ্ঠ করেছে। জনগণের কেনা অস্ত্র দিয়ে জনগণের বুকে গুলি ছুড়েছে। সে রাজনীতি আমার মা-বোনের ইজ্জত হরণ করেছে। ওই রাজনীতি আবার ফিরে আসুক আমরা চাই না। ব্যাংক ডাকাতি করে জনগণের টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। আপনারা সেই বাংলাদেশ আবার চান? আপনারা পরিবর্তন চান? পরিবর্তন চাইলে গণভোটে হ্যাঁ বলতে হবে। প্রথমে হ্যাঁ ভোটে সিল মারতে হবে। প্রত্যেকটা মানুষকে হ্যাঁ ভোটে সিল মারতে হবে। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। এই পরিবর্তনের জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। এ সময় তিনি বলেন, আমরা কথা দিচ্ছি, জনগণের আস্থা যদি আমাদের ওপর আসে, আমরা আশাবাদী ইনশাআল্লাহ আমরা আস্থার প্রতিদান দেবো। জনগণ যদি তাদের পবিত্র মূল্যবান ভোট দিয়ে এই জোট এই ঐক্যকে নির্বাচিত করে আমরা কথা রাখবো। প্রথমত, আমরা জাতিকে আর বিভক্ত হতে দেবো না। পুরনো কাসন্দি নিয়ে কামড়া কামড়ি করবো না। আমরা পেছনের দিকে দৌড়াবো না। আমরা যুবকদের স্বপ্নের অগ্রগামী বাংলাদেশ দেখতে চাই। 

যুবকরা আমরা তোমাদের হাতে বেকার ভাতা তুলে দেবো না। তোমরা বেকার ভাতার জন্য কোনো দাবি জানাওনি। বেকার ভাতা দিয়ে তোমাদের অপমানিত করতে চাই না। তোমাদের হাতগুলোকে দক্ষ কারিগরের হাত হিসেবে গড়ে তুলবো। প্রত্যেকের হাতে মর্যাদার কাজ তুলে দেবো। সেদিন প্রতিটি যুবক গর্বের সঙ্গে বলবে যে আমিই বাংলাদেশ। আমায় দেখে বুঝে নাও বাংলাদেশ কি জিনিস। আমরা সেই বাংলাদেশ গড়ে দিতে চাই। আমরা বাংলাদেশের নেতৃত্ব যুবকদের হাতে তুলে দিতে চাই। আমাদের ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে ৬২ শতাংশ প্রার্থী হচ্ছে যুবক। বার্তা দিচ্ছি আমরা, আগামীর দেশ হবে যুবকদের বাংলাদেশ। আন্দোলনে যুবকরা যেমন লড়াই করেছে, আমাদের মেয়েরাও লড়াই করেছে। ১৫ই জুলাই যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের কলিজার টুকরা মেয়েদের গায়ে হাত দেয়া হয়েছিল, জুলাই সেইদিন শক্তি ফিরে পেয়েছিল। মেয়েদের গায়ে হাত দেয়া জাতি মেনে নিতে পারেনি। মুগুর বাহিনী, হাতুড়ি বাহিনী, লাঠিয়াল বাহিনী সবকিছুকে যুবক-যুবতিরা ব্যর্থ করে দিয়েছে। এখনো সেই একই প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি। একসময় যারা মজলুম ছিলেন, তারা কেন জালিমের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন, আমরা বুঝতে পারি না। বিভিন্ন জায়গায় মা-বোনদের ডিস্টার্ব করা হচ্ছে। তারা এ দেশের নাগরিক, তাদের অধিকার আছে ভোট চাওয়ার। তাদের অধিকার আছে তাদের আদর্শ নিয়ে ভোটারদের কাছে যাওয়ার। আপনি আপনার আদর্শ নিয়ে যান, আমরা বাধা দেবো না। আপনারা একদিকে বলছেন মায়েদের হাতে আপনারা দেবেন ফ্যামিলি কার্ড। আরেকদিকে সেই মায়ের গায়েই দিচ্ছেন আপনারা হাত। আপনারা মা-বোনদের কীভাবে দেখবেন এখনই বোঝা যাচ্ছে। সকালের সূর্য দেখলেই বোঝা যায় সারাদিন কেমন যাবে। ভোটের আগের আবহ দেখলে বোঝা যায় কেউ নির্বাচিত হলে আগামীটা কেমন হবে। মনে রাখবেন, সেদিন যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের মেয়েদের গায়ে হাত দেয়া জাতি ক্ষমা করেনি, গর্জে উঠেছিল, ফুঁসে উঠেছিল- আজকেও মেয়েদের গায়ে হাত দিচ্ছেন, নিজেদের কবর রচনা করবেন। মেয়েদের গায়ে হাত দেবেন না, অপমান করবেন না- কারণ আপনাদেরও মা আছে।

যাদের হাতে জনগণ নিরাপদ নয় তারা ক্ষমতায় গেলে জনগণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে
স্টাফ রিপোর্টার, নোয়াখালী জানান, যারা ধৈর্য ধরতে পারেন নাই, বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন। আল্লাহর কসম, ক্ষমতায় যাওয়ার আগে দেশের জনগণ যাদের হাতে নিরাপদ নয়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর জনগণ আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। শুক্রবার দুপুরে নোয়াখালীর মাইজদী শহরের জেলা স্কুল মাঠে আয়োজিত ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শফিকুর রহমান বলেন, যারা দেশকে ভালোবাসার প্রমাণ দিতে পেরেছে। তাদের হাতে যদি দেশ আসে তাহলে ভালোবাসার একটা দেশ তৈরি করা সম্ভব। মানুষ বুঝতে পেরেছে। তাই সারা বাংলায় এখন বাঁধভাঙা জোয়ার শুরু হয়েছে ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে। শুধু নোয়াখালী না, সারা বাংলায় আমি যেখানে যাচ্ছি মানুষের ভালোবাসা দেখতে পাচ্ছি। বিশেষ করে জুলাই যুদ্ধ যারা করেছে সেই যুব সমাজ মুখিয়ে আছে ১৩ তারিখ থেকে নতুন একটি বাংলাদেশ দেখার জন্য। তারা বুঝতে পেরেছে জুলাই চেতনার আকাঙ্ক্ষা কাদের যারা বাস্তবায়ন হবে। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য লড়াই শুরু হয়েছে। আমরা সরকারি কর্মচারীদের ন্যায়সঙ্গত দরদের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে পে-কমিশনকে বলবো যথাযথ রিকমেন্ডেশন আমাদের কাছে দেন। যাতে একটি মানুষ সরকারি চাকরি করার পরে দ্বিতীয় কোনো রুজির সন্ধান করতে না হয়। আর টেবিলের নিচে যেন হাত দিতে না হয়। এরপর যারা সততার রাস্তা যারা ছেড়ে দিবেন, সংশোধন না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেবো। সমাবেশে নোয়াখালী জেলা জামায়াতের আমীর ইসহাক খন্দকারের সভাপতিত্বে ১১ দলীয় দলের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।