রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের হিড়িক পড়ে গেছে। ভোটগ্রহণের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, বিধি লঙ্ঘনের ঘটনাও ততই বাড়ছে। বিভিন্ন সংসদীয় আসনে পোস্টারের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। ব্যবহার করা হচ্ছে রঙিন ব্যানারও। ঢাকা-৫ ও ঢাকা-৮ আসনে এখনো রঙিন পোস্টার দেখা যাচ্ছে। এছাড়া বিধি লঙ্ঘন করে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের প্রচারণায় বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা’ অনুযায়ী এবার নির্বাচনে পোস্টার ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ব্যানার ও ফেস্টুন হবে সাদা-কালো রঙের। আচরণ বিধি লঙ্ঘনে জেল, জরিমানা ছাড়াও প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রয়েছে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, প্রচারের শেষ সময়ে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে। এ অবস্থা রোধে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে বলেও তারা মনে করেন।
ইসি সূত্রমতে, ৮ জানুয়ারি থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারা দেশে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ২১৩টি সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ১৩৭টি মামলা হয়েছে। ১৩ লাখ ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাচনি অনুসন্ধান এবং বিচারিক কমিটিও কাজ করছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ২১টি সংসদীয় আসনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ১৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা। এছাড়া পোস্টার না ছাপাতে প্রেসগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে ইসি।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার যুগান্তরকে বলেন, আচরণবিধি প্রতিপালন দেখভালে প্রতিটি উপজেলা বা থানায় দুজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রতিটি আসনে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি কাজ করছে। পাশাপাাশি আমাদের কাছে যেসব অভিযোগ আসছে, সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একটি অবাধ, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে যা যা করার তা সবই করা হচ্ছে।
তবে ইসিকে আরও কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। শুক্রবার যুগান্তরকে তিনি বলেন, সারা দেশে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। সামনের দিনে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে। এর জন্য দায়ী বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অসহিষ্ণু মনোভাব। কারণ তাদের দলের প্রার্থীরা যে কোনো মূল্যে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হতে চান, ক্ষমতায় যেতে চান। তবে দুঃখজনক হলো, ইসিকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।
সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা-৮ আসনের মালিবাগ মোড়, শান্তিনগর, কাকরাইল ও মতিঝিল এলাকার রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিশালাকৃতির রঙিন সাইনবোর্ড ঝুলছে। বিশেষ করে নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে ফকিরাপুল পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে সারি সারি রঙিন সাইনবোর্ড পথচারীদের চোখ এড়াচ্ছে না। মতিঝিলের জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের নিচেও দেখা গেছে একাধিক রঙিন ব্যানার। এসব প্রচার ব্যবস্থায় বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ছবি ও প্রতীক দেখা গেছে। মতিঝিল শাপলা চত্বরের চারপাশে সরকারি স্থাপনা, এমনকি পুলিশ বক্সের ওপরও শোভা পাচ্ছে শাপলা কলি প্রতীকের রঙিন ব্যানার। একই চিত্র লক্ষ করা গেছে পুরানা পল্টনের অলিগলিতেও। সেখানেও নিয়ম ভেঙে ব্যবহার করা হয়েছে ডিজিটাল সাইনবোর্ড ও রঙিন ব্যানার।
নির্বাচনি বিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে এনসিপি মনোনীত ‘শাপলা কলি’ প্রতীকের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে অন্য একজন কল রিসিভ করেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে পরে কথা বলবেন জানিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে পরে হোয়াটসঅ্যাপে বিস্তারিত জানিয়ে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও প্রার্থীর পক্ষ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে বিএনপি মনোনীত ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী মির্জা আব্বাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বারবার ফোনকল বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বললে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন দাবি করেন, নির্বাচনি প্রচারণার জন্য ৫০ থেকে ৬০টি রঙিন ব্যানার ব্যবহারের সুযোগ বিধিমালার মধ্যেই রয়েছে।
যদিও ইসির কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যমান আচরণবিধিতে রঙিন ব্যানার বা সাইনবোর্ড ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই।
এছাড়া ঢাকা-৫ আসনে ডেমরা-রামপুরা সড়কের মীরপাড়া এলাকায় গিয়ে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিম রণকের বড় ফেস্টুন ও ব্যানার দেখা গেছে। এর একটু সামনে দেখা গেল বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থী মো. আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সীর রঙিন পোস্টার। আর ওই সড়কের অধিকাংশ স্থানে, এমনকি বিদ্যুতের খুঁটিতেও বিএনপির প্রার্থী নবী উল্লাহ নবীর ব্যানার-ফেস্টুন সাঁটানো রয়েছে। এদিকে ডেমরা-যাত্রাবাড়ী সড়কের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় ৩৩ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের পোলের মধ্যে ও বিদ্যুতের খুঁটিতে হাতপাখা মার্কার প্রার্থী ইবরাহীমের ফেস্টুন ব্যানার দেখা গেছে। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসেনের আগের সাঁটানো রঙিন পোস্টার রয়ে গেছে এলাকার অলিগলিতে।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও একের পর এক আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। বুধবার নির্বাচনি আচরণবিধি অমান্য করার অভিযোগে চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) সংসদীয় আসনের জামায়াত প্রার্থী মো. আলাউদ্দীন শিকদারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটি। একই দিন চট্টগ্রাম-১৪ চন্দনাইশ আসনে এলডিপির প্রার্থী ওমর ফারুককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির চেয়ারম্যান সানজিদা আফরোজ বৃষ্টি। চট্টগ্রামে বিএনপির কয়েক প্রার্থীকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন আসনে নির্বাচনি প্রচারে হামলা-পালটাহামলার ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহীতে প্রার্থীদের নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘনের হিড়িক পড়েছে। প্রার্থীরা একের পর এক নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন করে চলেছেন। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীনকে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়ে আদালতে তলব করলে তিনি জবাব দিয়েছেন। একই আসনে জামায়াতের প্রার্থী দলটির কেন্দ্রের সিনিয়র নায়েবে আমির মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে নোটিশ দেওয়া হয়।
খুলনায় নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ৪ শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে খুলনা-৬ আসনের নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারক কমিটি।