Image description
তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ ১২৩ বার পিছিয়ে অবশেষে প্রস্তুত ফাইনাল রিপোর্ট * আলামত ধ্বংস হওয়ায় খুনিরা চিহ্নিত হচ্ছে না-দাবি তদন্তসংশ্লিষ্টদের * নতুন করে আশার আলো দেখেছিলাম, সেটাও হয়তো নিভে গেল-বাদী নওশের আলম রোমান

দেশে অসংখ্য ‘ক্লুলেস’ হত্যা মামলা শনাক্ত হয়েছে। বিচার পেয়েছেন স্বজনরা। কিন্তু আড়ালেই রয়ে গেল সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনীর খুনিরা। ১৪ বছর আগের নৃশংস এই হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্সও খুনিদের শনাক্ত করতে পারেনি। তারা এক বছরের বেশি সময় ধরে তদন্ত করেও কোনো কূলকিনারা পাননি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ইতোমধ্যে এ মামলার ফাইনাল রিপোর্ট (চূড়ান্ত প্রতিবেদন) প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে সরকারের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় আছেন তারা। উল্লেখ্য, চূড়ান্ত প্রতিবেদন হলো ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক কোনো মামলার তদন্ত শেষে আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদন, যাতে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা না পেলে বা পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।

এদিকে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডের পর আলামত ধ্বংস হয়ে গেছে। এজন্য তদন্তে খুনিরা চিহ্নিত হচ্ছে না। মামলার বাদী নিহত রুনীর ভাই নওশের আলম রোমান বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, বিচারের আশা আগেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর নতুন করে আশার আলো দেখছিলাম। ভেবেছিলাম এবার কিছু একটা হবে। সেটাও হয়তো নিভে গেল। জানতে চাইলে টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল নিজ কার্যালয়ে যুগান্তরকে বলেন, ‘সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যা মামলার তদন্তের কাজ অলমোস্ট শেষ। আমাদের দৃষ্টিতে যে যে বিষয় আগের তদন্তে টাচ করা হয়নি সেগুলোকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।’ খুনি কারা, কেন খুন করা হয়েছে-এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এখনো পারসন (ব্যক্তি) ডিটেক্ট করতে পারিনি। খুনের মোটিভ (কারণ) সম্পর্কে ধারণা পেলেও এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।

এক প্রশ্নের জবাবে পিবিআই প্রধান বলেন, ‘তদন্ত শেষে পারসন ডিটেক্ট হলে চার্জশিট, আর না হলে যা হয় তাই। আমরা টাইম টু টাইম আদালতকে তদন্তের বিষয়ে অবহিত করছি।’ খুনি এখনো ডিটেক্ট না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থলের আলামত নষ্ট হয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডের পর মানুষজন ও সাংবাদিকরা গিয়ে সবকিছু এলোমেলো করে ফেলেন। ১৩ বছর পর তদন্ত করতে গিয়ে ছবি আর ভিডিওর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।’

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী। সাগর মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক ছিলেন। রুনী ছিলেন এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। হত্যার পর থেকে সরকারের আশ্বাসের মধ্যেই সীমিত থেকেছে তদন্ত কার্যক্রম। একে একে ব্যর্থ হয়েছে থানা পুলিশ, ডিবি ও র‌্যাব। দিনের পর দিন পেছানো হয়েছে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ, যা বর্তমানে ১২৩ বারে ঠেকেছে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সরকার সাগর-রুনী হত্যার বিচারে টালবাহানা করেছে। সরকারের ইন্ধনেই ওই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এমন অভিযোগও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ হত্যা মামলার তদন্ত গতি পাবে এমন আশা করেছিলেন স্বজনরা। অন্তর্বর্তী সরকারও বিচারের আশ্বাস দিয়েছে। সাগর-রুনী হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে গঠন করা হয় উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স। তদন্তের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। তবুও আড়ালেই রয়ে গেছে খুনিরা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তদন্তে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে। টাস্কফোর্স যত ধরনের প্রশ্ন আছে, মানুষের যত সন্দেহ আছে, সবগুলো যাচাই-বাছাই করেছে। তদন্তের যত ক্ষেত্র আছে-যেমন ফেসবুক, অফলাইন, অনলাইন এমনকি বিভিন্ন কমেন্ট থেকে শুরু করে যত অভিযোগ আছে, সব প্রশ্নের উত্তর টাস্কফোর্স জোগাড় করেছে। হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্ন সংবাদপত্রে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হত্যায় সম্পৃক্ততার বিষয়ে যাদের নাম এসেছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, ডিএনএ নমুনা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, সাগর-রুনীকে হত্যায় সরাসরি দুজন ছিল। তবে তাদের শনাক্ত করতে পারেননি তদন্তকারীরা। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, চুরির উদ্দেশ্যে বাসায় ঢুকে খুন করা হয়-এ বিষয়টিকেই এখন মূল কারণ মনে করছেন পিবিআইর তদন্তসংশ্লিষ্টরা। এর কারণ হিসাবে তারা বলছেন, যে প্রক্রিয়ায় গ্রিল কেটে বাসায় ঢুকেছে তা চোর ছাড়া সম্ভব নয়। এমনকি প্রফেশনাল কিলারের পক্ষেও এভাবে বাসায় ঢোকা সম্ভব নয়। তাই গ্রিল কাটা চোররা বাসায় ঢুকে হত্যা করেছে এমন ধারণা করছে পিবিআইও।

তদন্ত তদারকির দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, বাসার জানালার যে গ্রিল কাটা ছিল সেখান দিয়ে মানুষ ঢোকা সম্ভব কিনা তা পিবিআই পরীক্ষা করে দেখেছে। চেষ্টা করে দেখা হয়েছে ৫ তলা ফ্ল্যাটের ওই গ্রিল দিয়ে মানুষ ঢোকা সম্ভব। প্রফেশনাল কিলারদের যে বৈশিষ্ট্য তাতে তারা মূল দরজা দিয়ে ঢুকেছে বলে মনে হয় না। আবার চোর ছাড়া প্রফেশনাল কিলারদের পক্ষে ওই গ্রিলের ভেতর দিয়েও ঢোকা সম্ভব নয়।

ডিএনএ প্রতিবেদন অনুযায়ী অপরাধ চিত্রের বিশ্লেষণ : পিবিআইর তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী সাগরকে আগে ছুরিকাঘাত করা হয় এবং রুনীকে পরে। তদন্তে ধারণা করা হয়, সাগর বাধা দিতে পারেন এজন্য তার হাত-পা বাঁধা হয়। তার শরীরে ২৪টি ক্ষত করা হয়। ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণ হয় তার। মৃত্যুর আগে তিনি দীর্ঘ সময় গোঙান এবং বাঁচার চেষ্টা করেন। রুনী নারী হিসাবে দুর্বল। এজন্য তার হাত-পা বাঁধার প্রয়োজন মনে করেনি। হত্যার জন্য দুটি ছুরি ও একটি বঁটি ব্যবহার করা হয়। বড় ছুরিটি উভয়কেই হত্যার জন্য ব্যবহার করা হয়। ভিসেরা টেস্টের ফলাফল অনুযায়ী হত্যার আগে তাদের চেতনানাশক কিছু খাওয়ানো হয়নি।

লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা : হত্যার সময় সাগর-রুনীর বাসা থেকে লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা করেও সফল হননি পিবিআইর তদন্তকারীরা। তারা ল্যাপটপের আইপি অ্যাড্রেস এবং মাদারবোর্ডের ফিজিক্যাল অ্যাড্রেস সংগ্রহ করে প্রথমে বিটিসিএল এবং পরে বিটিআরসির মাধ্যমে উদ্ধারের চেষ্টা চালান। ল্যাপটপ উদ্ধারের জন্য সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। উদ্ধার প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত আছে বলে দাবি তদন্তকারীদের।

ঘনিষ্ঠ কারও হত্যায় জড়িত থাকার আলামত মেলেনি : সাগর-রুনীর ঘনিষ্ঠ কারও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকারও প্রমাণ মেলেনি। তদন্তে উঠে এসেছে, হত্যার পরদিন রুনীর দুজন ছেলে বন্ধুর সন্ধান পাওয়া যায়। তারা হলেন তানভীর রহমান ও কাজী গোলাম তৌসিফ। সাগরের সঙ্গে তাদের সবার সুসম্পর্ক ছিল। কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া দাম্পত্য কলহের কারণে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে এমন কোনো তথ্য পাননি তদন্তকারীরা।

জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেছিলেন রুনীর ভাই নওশের আলম। প্রথমে মামলাটি তদন্ত করছিল শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। চার দিন পর মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার ৬২ দিনের মাথায় ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টে ব্যর্থতা স্বীকার করে ডিবি। এরপর আদালত র‌্যাবকে মামলা তদন্তের নির্দেশ দেন। দীর্ঘ সময়েও র‌্যাব খুনিদের খুঁজে বের করতে পারেনি। ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সাগর-রুনী হত্যা মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব র‌্যাব থেকে সরানোর নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গঠিত একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সের মাধ্যমে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২৩ অক্টোবর চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধানকে আহ্বায়ক করা হয়। টাস্কফোর্সের অন্য তিন সদস্য হলেন-পুলিশ সদর দপ্তর ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ থেকে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন করে দুজন এবং র‌্যাব থেকে পরিচালক পদমর্যাদার একজন।

চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি হত্যা মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া কথা থাকলেও দেওয়া হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নতুন তারিখ দিয়েছেন আদালত। এ নিয়ে এই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ ১২৩ বার পেছানো হয়েছে। ঢাকার সিএমএম আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নতুন তারিখ ঠিক করেন। তবে উচ্চ আদালত ছয় মাসের সময় দিয়েছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজিজুল হক যুগান্তরকে বলেন, তদন্ত চলমান আছে। হাইকোর্ট আমাদের প্রথমে ছয় মাসের সময় দেন। সেই সময় ২০২৫-এর অক্টোবরে শেষ হলে আবার ছয় মাস সময় দিয়েছেন, যা আগামী এপ্রিলে শেষ হবে। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর র‌্যাব থেকে মামলা বুঝে পান তিনি।