Image description

অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনায় এবার চাহিদার তুলনায় রমজাননির্ভর পণ্যের ৪০ শতাংশ বেশি মজুত গড়ে তোলা হয়েছে। আমদানিতে পাইপলাইনে আছে আরও বিপুল পরিমাণ পণ্য। যা রোজার আগেই দেশে ঢুকবে। তবুও বাজারে ক্রেতার মনে ভর করেছে সিন্ডিকেট আতঙ্ক। কারণ রমজান শুরুর ১৮ দিন বাকি থাকলেও পুরোনো সেই চক্র লাখ লাখ টন ভোগ্যপণ্য এখনো সাগরে ভাসিয়ে রেখেছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিতে বন্দরে পণ্য খালাস করছে না। পাশাপাশি তদারকি সংস্থাগুলোও নির্বাচনসহ বিভিন্ন কারণে হাত গুটিয়ে বসে আছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রোজার আগে মূল্য বৃদ্ধি হতে পারে। তখন দিশেহারা হবেন ভোক্তা।

প্রতিবছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যবসায়ীরা দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও এর প্রতিফলন বাস্তবে দেখা যায় না; বরং উলটো মূল্য বৃদ্ধি পায়। এজন্য সবাই সিন্ডিকেটকে দায়ী করলেও বরাবরই জড়িতরা থাকেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা ২৫ লাখ টন। এর মধ্যে রোজার মাসে চাহিদা ৩ লাখ টন। সেক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ টন। আর সবশেষ নভেম্বর-ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৬৬ হাজার টন। পাশাপাশি ওই দুই মাসে ৩ লাখ ৯২ টন ভোজ্যতেল আমদানি করতে এলসি খোলা হয়েছে। যা রোজার আগেই দেশে ঢুকবে। এতে দেখা যায়, রোজায় চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ মজুত আছে।

মসুর ডাল বছরে চাহিদা সর্বোচ্চ ৭ লাখ টন। এর মধ্যে রোজায় চাহিদা ৮০ হাজার টন। ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার টন। সবশেষ নভেম্বর ও ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ৭২ হাজার টন। আমদানি পর্যায়ে পাইপলাইনে আছে আরও ১ লাখ ৭৮ হাজার টন। যা রোজার আগেই দেশে ঢুকবে। এতে দেখা যায়, রোজার মাসের চাহিদার তুলনায় ইতোমধ্যে দেশে দ্বিগুণ মসুর ডালের মজুত আছে। বছরে দেশে চিনির চাহিদা মোট ২০-২১ লাখ টন। রোজায় চাহিদা ৩ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়েছে ৩৭ হাজার টন। সবশেষ নভেম্বর ও ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার টন। আমদানি পর্যায়ে পাইপলাইনে আছে ৩ লাখ ২৯ হাজার টন। সেক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে দেশে চিনির কোনো ঘাটতি নেই। বরং রোজায় চাহিদার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি চিনির মজুত গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৬-২৭ লাখ টন। রোজায় চাহিদা ৫ লাখ টন। এর মধ্যে এবার মৌসুমে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়েছে ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার টন। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ৫ হাজার টন। আমদানি পর্যায়ে আছে আরও ৫৬ হাজার টন। দেখা যাচ্ছে শুধু রোজার চাহিদা নয়, বছরে চাহিদার তুলনায় দেশে বেশি পেঁয়াজ রয়েছে।

পাশাপাশি বছরে ছোলার চাহিদা সর্বোচ্চ ২ লাখ টন। এর মধ্যে রোজার মাসেই ১ লাখ ৫৫ হাজার থেকে ২ লাখ টন ছোলার চাহিদা রয়েছে। ইতোমধ্যে দেশে উৎপাদন হয়েছে ২২ হাজার টন। সবশেষ গত দুই মাসে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার টন। আমদানি পর্যায়ে পাইপলাইনে আছে আরও ১ লাখ ৩০ হাজার টন। যা কয়েকদিনের মধ্যে দেশে আসবে। এতে রোজায় যে পরিমাণ চাহিদা, তা থেকে মজুত অনেক বেশি। বছরে খেজুরের চাহিদা ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টন। এর মধ্যে রোজায় চাহিদা ৬০-৮০ হাজার টন। গত দুই মাসে ১০ হাজার টন আমদানি হয়েছে ৫৬ হাজার টন আমদানি পর্যায়ে আছে। যা কয়েকদিনের মধ্যে দেশে ঢুকে যাবে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, প্রতিবছর রোজার আগে অসাধুদের কারসাজির কৌশল ওপেন সিক্রেট। তবুও সবাই নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকে। দেশে পণ্যের মজুত পর্যাপ্ত থাকলেও রোজার আগেই মূল্য বাড়িয়ে ভোক্তাকে নাজেহাল করে ফেলে। পরে নেওয়া হয় লোক দেখানো কিছু পদক্ষেপ। কোনো বছরই এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই নির্বিঘ্নে ওই চক্র বছরের পর বছর চালিয়ে গেছেন তাদের অপকর্ম। তাদের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তা। এবারও যাতে তার পুনরাবৃত্তি না হয় সেক্ষেত্রে মনিটরিংও আগেভাগেই করতে হবে। অনিয়ম পেলেই কঠোর তদারকির মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, গত বছরের চেয়ে এবার নিত্যপণ্যের গড় আমদানি ৪০ শতাংশ বেশি। আমদানি ও উৎপাদনের পরিমাণগত বিশ্লেষণ করেছি। দেখেছি, গত বছরের চেয়েও এবার রমজানের বাজার আরও ভালো হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকবে। দাম বাড়বে না, বরং কিছু পণ্যের কমবে।

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, রোজা ঘিরে কারসাজি বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা সরকারকে আশ্বস্ত করেছে, ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। মূল্যও স্বাভাবিক থাকবে।

রাজধানীর খুচরা বাজারে পণ্য মূল্য চিত্র : রাজধানীর কাওরান বাজার, নয়াবাজার, মালিবাগ কাঁচাবাজারসহ একাধিক খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা। যা এক মাস আগেও ১১৫ টাকা ছিল। আর দুই মাস আগে বিক্রি হয়েছে ১১০ টাকা। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৯৫ টাকা। যা এক মাস আগে ১৯৮ টাকা ও দুই মাস আগে ১৯০ টাকা ছিল। প্রতি কেজি সরু মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা। যা এক মাস আগে ১৬০ টাকা ও দুই মাস আগে ১৫০ টাকা ছিল। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা। যা এক মাস আগে ১৫০ টাকা ছিল। আর দুই মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকায়। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকা। যা এক মাস আগে ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর দুই মাস আগে ১৭০ টাকা ছিল। এছাড়া প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১২৬ টাকা। যা এক মাস আগে ১৩৫ টাকা ও দুই মাস আগে ১২৫-১২৬ টাকা ছিল। প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১০৫ টাকা। যা গত মাসে ১১০ ও দুই মাস আগে ১১৫ টাকা ছিল।