Image description
ইসি বলছে এবার পরিবেশ চমৎকার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। প্রার্থীদের প্রচারে মাঠে মুখরতা থাকলেও তার আড়ালে একের পর এক ঘটছে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা, উঠছে হামলা ও হেনস্তার অভিযোগ। এসব ঘটনার বেশিরভাগই জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচনী প্রচার ঘিরে। এ বিষয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দিয়েছে জামায়াত ও এনসিপি।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, অতীতের অনেক নির্বাচনের তুলনায় এবারের ভোটের মাঠে পরিবেশ এখন পর্যন্ত চমৎকার। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির মধ্যে ১২৮টি নির্বাচনী এলাকায় ১৪৪টি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় এবং ৯৪টি মামলা হয়েছে। এর বাইরে জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থীদের প্রচারে একাধিকবার হামলা ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। জামায়াতের নারীকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘নির্বাচন যত এগোয়, মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তত তীব্র হয়। এ সময় আচরণবিধি লঙ্ঘন বা প্রতিপক্ষকে ভীত করার ঘটনা বাড়লে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। কমিশনের উচিত, এসব অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া—যাতে সব দল সমান সুযোগ পায়।’

সর্বশেষ মঙ্গলবার, ঢাকা-৮ আসনে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ও এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর শান্তিনগরে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে পিঠা উৎসবে অংশ নিতে গেলে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তাকে একাধিক ডিম ছোড়া হয়।

পরে তিনি কলেজের বিপরীত পাশে সড়কে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমরা কলেজে গেলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ফুল দিয়ে স্বাগত জানায়। এরপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর হামলা করে। আমরা কিছু করব না। ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধৈর্য ধরে থাকব।’

এর আগে, ২৩ জানুয়ারি রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় পথসভায় অংশ নিতে গেলে তার ওপর নোংরা পানি ও ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছিল।

মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে ফকিরেরপুল মোড়ে নির্বাচনী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে হামলার প্রতিবাদ জানান এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে। একদিকে মঞ্চে উঠে ভালো কথা বলবেন, অন্যদিকে বিরোধীদের সন্ত্রাসী কায়দায় দমন করবেন—এই দ্বিচারিতা চলতে দেওয়া যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এ ঘটনার ব্যবস্থা দেখতে চাই। কার কী ভূমিকা থাকে তা দেখব। এরপর রাজপথে ও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আমরা এর জবাব দেব।’

এ হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। এক বিবৃতিতে দলটি বলেছে, এটি গণতান্ত্রিক রাজনীতির ওপর আঘাত এবং নির্বাচনের পরিবেশকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে বলেন, ‘নির্বাচনী কাজে বাধা দেওয়া গুরুতর অপরাধ। এতে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত তৈরি করে।’

এর আগে সোমবার, ঢাকা-১৮ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। ডুমনি বাজার এলাকায় পথসভা চলাকালে এ হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করে এনসিপি।

পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুনের বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুর ও হুমকির অভিযোগ করেছেন বিএনপি জোটের প্রার্থী গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর।

মঙ্গলবার গলাচিপা উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নুরুল হক বলেন, ‘আসনটি আমাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও বিএনপির একাংশ প্রার্থী হাসান মামুনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আমার নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগেই হামলা হলে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা থাকা স্বাভাবিক। আমি প্রশাসনকে জানিয়েছি, তারা লিখিত অভিযোগ দিতে বলেছে।’

বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা শাহাদাতুজ্জামানের নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার বগুড়া প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে কিচক ইউনিয়ন শাখার আমির মোফাজ্জল হোসেন জানান, উত্তর বেলাই গ্রামে এ হামলায় তাদের তিন কর্মী আহত হন।

এ বিষয়ে শিবগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

এ ছাড়া পাবনা-৫ (সদর) আসনের বুদেরহাট এলাকায় জামায়াতের নারীকর্মীদের প্রচারে বাধা ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। হেমায়েতপুর ইউনিয়নের বুদেরহাটে এ ঘটনা ঘটে, পরে দুই পক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

টাঙ্গাইলের গোপালপুরেও জামায়াতের নারীকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ ও শারীরিক লাঞ্ছনার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি নির্বাচন কমিশনে পৃথকভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিএনপি কর্মীদের হামলার অভিযোগ করেছে।

কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু রয়েছে। সোমবার, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাছির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করে জামায়াতের চার সদস্যের প্রতিনিধিদল। প্রায় এক ঘণ্টার এ বৈঠকে নারীকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়।

নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘সভার বক্তৃতা, প্রতিশ্রুতি, ইশতেহার—সবই গণতন্ত্রের অংশ। এগুলোর মাধ্যমে জনগণ বিচার করবে, কাকে ভোট দেবে। মাঠে এখনো চমৎকার পরিবেশ বিরাজ করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক নেতারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তারা পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ দিচ্ছেন। আমরা সে অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

আনোয়ারুল ইসলাম জানান, অভিযোগ এলেই তা রিটার্নিং অফিসার, মোবাইল কোর্ট এবং নির্বাচনী তদন্ত কমিটি তাৎক্ষণিকভাবে আমলে নিচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৫০-৬০টি মামলা হচ্ছে, জরিমানা ও শোকজ করা হচ্ছে। কার্যক্রম জোরেশোরেই চলছে।’