Image description
♦ তাতেও লাগবে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি ♦ পুরোটাই ছিল ভুল পরিকল্পনা : ড. সায়ের গফুর

বিআরটি প্রকল্প নিয়ে কঠিন এক সংকটে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রকল্পটির সময়সীমা ও ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত সমস্যা জর্জরিত বিআরটি প্রকল্পটি বন্ধের কোনো উপায় এখনো বের করতে পারেনি সরকার। এমনকি এটি ভেঙে ফেললেও তেমন কোনো লাভজনক সমাধান বা টেকসই সমাধান পাওয়া যাবে না। আবার বেসরকারি খাতে বাস চলাচলের জন্য ছেড়ে দেওয়ার মতো উপযুক্তও নয়।

এ প্রকল্পটি এমন এক জটিল অবস্থায় চলে গেছে যে বাতিল করেও কোনো সমাধান পাচ্ছে না ড. ইউনূসের সরকার। এজন্য পরবর্র্র্তী নির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য রেখে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। 

খোদ পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, এ প্রকল্পটি ভেঙে ফেলতে চাইলেও তাতে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হবে। আবার ভেঙে ফেললেও তেমন টেকসই কোনো সমাধান পাওয়া যাবে না। প্রকল্পের পুরো এলাকাজুড়ে এখন এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে, যা সমাধান করা খুবই জটিল। বুয়েটের বিশেষজ্ঞরাও এর কোনো সম্ভাব্য সমাধান দিতে পারেননি। এ প্রকল্পে ইতোমধ্যে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সম্প্রতি আরও ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হলে তা একনেক সভায় প্রত্যাখ্যাত হয়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে বুয়েটের অধ্যাপক এবং এ প্রকল্পের পরামর্শক ড. সায়ের গফুর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এই প্রকল্পটি ছিল পুরোপুরি একটি ভুল পরিকল্পনা, ভুল নকশার এবং ভুল সিদ্ধান্তের। কিন্তু সেটা সে সময়ের সংশ্লিষ্টরা বুঝতেও চায়নি হয়তো। এজন্য দীর্ঘদিন সময় এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়ে এটা এখন একটা বিরাট জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। মোট কথা এটি একটি ব্যর্থ প্রকল্প। আমি তো এটার সঙ্গে যুক্ত হয়েছি স্বল্প সময়ের জন্য। সময় শেষ হয়ে গেলে আবার নিজের জায়গায় ফেরত চলে যাব। কিন্তু এটার একটা গ্রহণযেগ্যা সমাধান বের করাটাই এখন সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার।’

সূত্র জানায়, গত অক্টোবরে রেল ও সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা মুহম্মদ ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় অনুমোদিত ৪ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যেই কেবল জরুরি কাজগুলো সম্পন্ন করতে প্রকল্পটি চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা আর অনুমোদন পায়নি। তা প্রত্যাখ্যাতও হয়ে যায়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় অন্তর্বর্তী সরকার এখন আর এ প্রকল্পের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে না। তবে পরবর্তী সরকারের কাছে সুপারিশ রেখে যাচ্ছে এটি ভেঙে অপসারণ করার জন্য। কেননা দীর্ঘ ২০ কিলোমিটারের এ প্রকল্পে এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগই ভুল নকশা, ভুল সিদ্ধান্ত এবং ভুল পরিকল্পনা। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটি ভেঙে ফেলার বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে গাজীপুর থেকে ঢাকা বিমানবন্দর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে এটিকে কীভাবে অপসারণ করা যায় সে বিষয়ে পরবর্তী সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে বলে মনে করে অন্তর্বর্তী সরকার।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল আমিন খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বরং তিনি বলেন, এটি এখন সড়ক ও জনপদ বিভাগের প্রকল্প। ফলে তিনি কিছু জানেন না। জানা গেছে, সম্প্রতি আধুনিক যানবাহন চালুর মাধ্যমে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট লাইন-৩ (বিআরটি-৩) স্থাপন ও পরিচালনায় বাধা হয়ে দাঁড়ানো অনেক ত্রুটি প্রকল্পের মূল নকশায় চিহ্নিত করা হয়। প্রকল্পের নকশাকে ‘বিকট ও অপরিকল্পিত’ আখ্যা দিয়ে একনেক নকশা ও বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো তদন্তেরও নির্দেশ দেয়। একনেকের প্রত্যাখ্যান ও সুপারিশের ভিত্তিতে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ এবং এই দুরবস্থার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অধীনে দুটি কমিটি গঠন করা হয়। প্রকল্পের বাইরের কর্মকর্তারা ছিলেন এই কমিটিতে।

সূত্র জানায়, ওই কমিটিগুলোর প্রতিবেদনে কোনো সমাধান না পেয়ে সম্প্রতি সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হকের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি গঠন করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। সেই কমিটি অবশ্য এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি।

বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটারের বেশি সড়কপথে বাসের জন্য বিশেষ লেন নির্মাণ বা বিআরটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১২ সালে। যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৬ সালে। তবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবিক অর্থে এর কাজই শুরু হয় ২০১৭ সালে। নির্মাণকাজে ধীরগতি ও একাধিক দুর্ঘটনার কারণে বারবার কাজ পিছিয়েছে। ব্যয় সংশোধন করা হয়েছে তিনবার। এবার চতুর্থবারের মতো ব্যয় সংশোধনের প্রস্তাবও ফেরত পাঠানো হয়েছে নানা অসংগতির কারণে। ২০১৬ সালে নেওয়া প্রকল্পটির ব্যয় মূল ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৪ হাজার ২৮৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এ প্রকল্পের নির্মাণ এলাকার বিভিন্ন স্থানের জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যেসব স্থানে লিফট স্থাপনের কথা সেসব জায়গায় প্রকল্পের বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী রাখা হয়েছে। সেগুলোও চুরি হয়ে যাচ্ছে। এই লেনে নির্মাণাধীন বাসস্ট্যান্ড এবং যাত্রীছাউনীগুলো রাস্তার মাঝের লেনে স্থাপন করা হচ্ছে। এতে করে একদিকে এসব বাসস্ট্যান্ড, সিঁড়ি, লিফট ও যাত্রীছাউনী নির্মাণ শেষ হয়নি। অন্যদিকে রাস্তার একটি বড় জায়গা বছরের পর বছর অব্যবহৃত থাকছে। ফলে এই মহাসড়কে লেগে থাকছে যানজট। তৈরি হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল। কেননা এই সড়কে পথচারী পারাপারের জন্য যেসব ফুটওভার ব্রিজ ছিল সেগুলোর বেশির ভাগই অপসারণ করা হয়েছে। এতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ রাস্তা পারাপার হচ্ছে। ফলে হরহামেশাই দুর্ঘটনা ঘটছে। কখনো কখনো পথচারীরা প্রাণও হারাচ্ছে। দেখা গেছে, বিমান বন্দর, উত্তরা, আবদুল্লাহপুর ও টঙ্গী এলাকায় কয়েকটি স্টেশনের কাজ অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অনেক জায়গায় পদচারী-সেতুর কাজ অসমাপ্ত রয়েছে। কোনো কোনো স্টেশনে এস্কেলেটর ও লিফট লাগানো হয়নি।

সড়কের মাঝখানে বিআরটির জন্য নির্ধারিত লেন আলাদা করার জন্য কিছু জায়গায় লোহার রেলিং লাগানো হয়েছে। সেসব রেলিংয়ে কোথাও কোথাও মরচে পড়ে গেছে। এস্কেলেটর বসানোর সিঁড়ি প্রস্তুত করে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে বছরের পর বছর। এতে করে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অনেক মূল্যবান জিনিসপত্রও।