Image description

গত দেড় বছরে দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম আতঙ্কের নাম মামলা বাণিজ্য। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের জন্য মিথ্যা মামলা দায়ের করা হচ্ছে। মামলা করার পর মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। না দিলে করা হচ্ছে মব সন্ত্রাস। একেই তো বেসরকারি খাত অচলপ্রায়, তার ওপর এসব মিথ্যা মামলায় অতিষ্ঠ হয়ে অনেক বিনিয়োগকারী ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে নিচ্ছেন। এটা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

২০২৪-এর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানায় জুলাই গণ অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। আহত হওয়ার ঘটনায়ও অনেক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রকৃত আসামি, সন্দিগ্ধ ব্যক্তির পাশাপাশি হয়রানিমূলকভাবেও অনেককে আসামি করা হয়েছে। যাঁদের মধ্যে ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, অন্যত্র থাকা মানুষ ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিও রয়েছেন। মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আশ্বাস, ভুলবশত আসামি করা হয়েছে মর্মে হলফনামা দিয়ে ও পুলিশ প্রতিবেদনে নির্দোষ দেখানোর প্রতিশ্রুতিসহ নানাভাবে এই বাণিজ্য করার অভিযোগ যেমন আছে, আবার প্রতিপক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েও কাউকে কাউকে মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগও রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে হতাহতসহ বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৪৯৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৫৯৯টি। অন্যান্য ৯০০টি। এসব মামলায় ১০ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব মামলার আসামি ১০ লাখের কাছাকাছি। যাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী শিল্প উদ্যোক্তা অন্তত দুই হাজার।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন শিল্প-কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, অগ্নিসংযোগ, চাঁদাবাজি, মালিকানা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাসহ নানানরকম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু কারখানা ভাঙচুর ও লুটতরাজের শিকার হয়েছে। চাঁদা না পেয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে। কোথাও ব্যক্তিগত রেষারেষিকে রাজনৈতিক মেরুকরণ করে মামলার আসামি করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। কাউকে কাউকে মামলার হুমিকও দেওয়া হচ্ছে। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠান অন্যের দখলেও চলে গেছে। এই দখলে জড়িয়েছেন কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতারা।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, ব্যবসায়ীদের কোনো দল নেই। ব্যবসা করে দেশে অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। সাধারণ ব্যবসায়ীদের হয়রানি থেকে মুক্তি দিতে হবে। ব্যবসায়ীদের হয়রানিমূলক মামলা থেকে মুক্তি না দিলে একদিকে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে, যাতে কর্মসংস্থান তৈরির পথ বন্ধ হবে। আরেক দিকে অনেক মালিক কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন, যাতে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারাবে। এ ছাড়া দেশে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্যবসায়ীরা বলেন, গণ অভ্যুত্থানের পর শিল্পকারখানা বিকশিত হওয়ার স্বপ্ন দেখা দিলেও এখন নৈরাজ্য নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে ব্যবসায়ীদের মাঝে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা চান ব্যবসায়ীরা। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে আতঙ্ক কাটবে না। এ কারণে তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো পরিচালনা করতে পারছেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের বেশ কয়েকটি বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। এখন গ্রেপ্তারের ভয়ে প্রতিষ্ঠানেই আসেন না। এতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যাঘাত ঘটছে। তারা বলছেন, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে মালিকরা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেবেন। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে এই আতঙ্ক কাজ করছে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে হাজার হাজার কর্মী বেকার হয়ে পড়বে। তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন চিন্তিত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এর বাইরেও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকরাও আতঙ্কে দেশ ছেড়েছেন। দেশের পরিস্থিতি দেখছেন। পরিবেশ ভালো হলে তারা দেশে ফিরে ব্যবসা করবেন, নইলে আর ফিরবেন না- এমন সিদ্ধান্তও নিয়েছেন অনেকেই। আবার কেউ কেউ ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরিস্থিতি সেদিকে গেলে দেশের অর্থনীতি কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, চিহ্নিত রাজনৈতিক ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ ব্যবসায়ীদের মামলা থেকে রেহাই দিতে হবে। সাধারণ ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে থাকলে এর প্রভাব পড়বে সাপ্লাই চেইনের ওপর। তাই অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের স্বার্থেই ব্যবসায়ীদের হয়রানিমুক্ত রাখা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক রাজীব চৌধুরী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সংকট উত্তরণের একমাত্র সমাধান সরকারের হাতে। কেবল সরকার চাইলেই এ সংকট থেকে সাধারণ ব্যবসায়ীরা মুক্তি পেতে পারেন।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা যদি আতঙ্কে থাকেন, নিজ প্রতিষ্ঠানে না যান, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। অনেক প্রতিষ্ঠান কয়েক মাসের মধ্যে বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের বৃহত্তর রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ও বিজিএমইএর সাবেক দুই সহসভাপতির নামে হত্যা মামলা হয়েছে। ব্যবসায়িক কাজে বিদেশে থাকা অবস্থায়ই তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও জানা গেছে।

এদিকে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী দেশে আসতে পারছেন না মামলার ভয়ে। মালিক ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। এর মধ্যে মালিকরা বিদেশে অবস্থান করায় কর্মীদের বেতন-সংক্রান্ত বিষয় স্বাভাবিকভাবে সামলাতে পারছেন না কর্মকর্তারা। এতে শ্রমিকদের বেতন বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর সময়মতো বেতন দিতে না পারলে শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এই পরিস্থিতিতে শিল্পকারখানায় প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশে থাকা মালিকদের প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এর বড় প্রভাব পড়বে রপ্তানির ওপর।

দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ব্যবসায়ীদের নামে হয়রানি ও নির্যাতনমূলক হত্যা মামলাকে শিল্প খাত ধ্বংসের গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন অংশীজনরা। তারা বলছেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প কারখানাগুলোয় অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চক্রান্ত চলছে। বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর নামে হত্যা মামলায় ক্রেতারা হতবিহ্বল হয়ে পড়ছেন। আইনজ্ঞরা বলছেন, বড় বড় ব্যবসায়ীদের নামে মিথ্যা হত্যা মামলা কেবল আইনের ব্যত্যয়ই নয়, দেশের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের পরিপন্থি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মামলার বেশির ভাগ এজাহার একই ধরনের। প্রথম ১০ থেকে ২০ জন আসামি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাসহ প্রভাবশালী কিছু পুলিশ কর্মকর্তা। এসব মামলায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাদী চেনেন না আসামিকে। আসামিও বাদীর নাম শোনেননি কখনো। ২৫ আগস্ট ঢাকার দোহার থানায় হয় তেমনই একটি মামলা। এজাহারে থাকা ঠিকানার সূত্র ধরে আসামির খোঁজ করে জানা যায়, রাজনৈতিক পরিচয় না থাকা অভিযুক্ত ষাটোর্ধ্ব এ ব্যক্তি দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের একজন।

গণমাধ্যমে তিনি দাবি করেন, ‘গত ১০ বছরেও দোহার যাইনি। ব্যবসা করি জীবনভর, সে হিসেবেই সরকারে যে-ই থাকে তাদের সঙ্গেই আমাদের সখ্য থাকে। কিন্তু আমরা কোনো রাজনীতি করি না, কখনো করিও নাই। আমার নামে হত্যা মামলা হয়েছে, অথচ গত ১০ বছরে আমি দোহার যাইনি। কেন কীভাবে কিছুই বুঝতে পারছি না। সরকারের কাছে আবেদন করব- আমাদের যেন এভাবে অপদস্থ না করা হয়।’ এ শিল্পপতিসহ ১৭৪ জনের নামে মামলার বাদী শাজাহান মাঝি অধিকাংশকেই চেনেন না। তাহলে কেন করলেন মামলা? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, রাজনৈতিক মামলা তাই সবাইকে চেনেন না, নেতারা যাদের নাম দিয়েছেন তাদের নামই মামলায় উল্লেখ করেছেন।

সম্প্রতি সুপরিচিত একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর কর্ণধারসহ প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মকর্তার কাছে আইনজীবী পরিচয় দিয়ে তিন কোটি টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় হতাহতের ঘটনায় হওয়া মামলায় আসামি করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। আইনজীবী পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি বলেন, তাদের সঙ্গে আরও অনেকেই আছেন, যারা খুবই প্রভাবশালী। পুরো অর্থ না দিলে মামলা হয়ে যাবে ব্যবসায়িক গোষ্ঠীটির কর্ণধারের বিরুদ্ধে। হুমকিদাতা ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তাকে একটি বাসায় নিয়ে দেনদরবার চালিয়ে টাকা আদায়ে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা না পেয়ে আদালতের মাধ্যমে রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় হত্যা মামলা ঠুকে দেয়। এখানেই থেমে থাকেনি ওই চক্র।

কিছুদিন পর আবারও টাকার জন্য চাপ দিয়ে জানায়, চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দিলে নতুন করে আরও মামলা দেওয়া হবে। সেই টাকা না পেয়ে পল্টন থানায় আরও একটি হত্যা মামলা করা হয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীটির কর্ণধারের বিরুদ্ধে। অথচ এই ব্যবসায়ী কখনো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারাও ঢালাও মামলার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। গণমাধ্যমকে তারা বলেন, প্রতারক চক্র মামলা-বাণিজ্য করছে, তা সত্য। নিরপরাধ ব্যবসায়ী ও লোকজনকে মামলা দিয়ে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ এসেছে। এসব বিষয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, এসব হয়রানিমূলক মামলা যারা করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু গত ১৭ মাসে মিথ্যা মামলা করার কারণে একজনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকার বলেছিল, অসত্য মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু সেই আশ্বাসও বাস্তবায়ন হয়নি।