Image description

নির্বাচনে প্রার্থীদের জোর প্রচারণা চলছে পাঁচ দিন ধরে। ইতোমধ্যে ঢাকা থেকে বেরিয়ে সিলেট, চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গে পৃথক প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। উভয়েই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যেমন অবারিত, তেমনই পরস্পরকে খোঁচা দিয়েও বক্তব্য দিতে দেখা গেছে নেতাদের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মাত্রা বজায় রেখে পরস্পরের সমালোচনাকে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বলছেন, কিন্তু খোঁচাখুঁচির বাইরে এখনও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে শঙ্কার কথা বলছে কোনও কোনও দল। তবে জনসভায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে ইসি বলছে, কেউ যদি মনে করেন—প্রতিপক্ষ আচরণ বিধিমালা ভঙ্গ করেছে বা আইন ভঙ্গ করেছে, তাহলে ইসিতে অভিযোগ করতে পারেন। অথবা উনি ডিসি অফিসে, উপজেলা নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ দিতে পারেন।

রবিবার (২৫ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর বাড্ডার সাঁতারকুলের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনি প্রচারণার সময় ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘‘নির্বাচনে লেভেলে প্লেয়িং ফিল্ড এখনও নেই। একটি পক্ষ আমাদের কর্মী-সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাতে সফল হচ্ছে না। চাঁদাবাজ-সন্ত্রাস ও দখলবাজদের শেষ দিন হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।’’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এই মুহূর্তে রাজপথে বা গণমাধ্যমে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই বলে বক্তব্য দিয়ে নাহিদ ইসলামরা কী বুঝাতে চান তা বোধগম্য নয়। বর্তমান সরকার তো তরুণদেরই সরকার। প্রধান উপদেষ্টাও তো বলেছেন—তরুণরা কিছু আসনে জয়ী হয়ে যেতেও পারেন।’’

দুদু বলেন, ‘‘তারপরও নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তোলার কী কারণ থাকতে পারে? কোনও কৌশল থেকে বলেছি কিনা তা দেখার বিষয়।’’ তার মতে, এ ধরনের মন্তব্যের তেমন ভিত্তি নেই। তারপরও নাহিদ ইসলামদের কোনও অভিযোগ থাকলে নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা উচিত।

নাহিদ ইসলাম নির্বাচনি প্রচারণা মাঠে এই যে অভিযোগ করছেন, সে বিষয়ে ইসির অবস্থান জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমাদের ৩০০ ইলেকট্রাল জজের সমন্বয়ে গঠিত ৩০০ ইলেকট্রাল কমিটি কাজ করছে। কেউ যদি মনে করেন—(প্রতিপক্ষ) আচরণ বিধিমালা ভঙ্গ করেছেন বা আইন ভঙ্গ করেছেন, তাহলে ওনাদের (ইসি) কাছে অভিযোগ করতে পারেন। অথবা উনি ডিসি অফিসে, উপজেলা নির্বাচন কমিশনের অফিসের কাছে অভিযোগ দিতে পারেন। তাহলে আচরণবিধি যারা ভঙ্গ করেছেন, তাদের উনি ইনকয়ারি করে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারবেন।’’

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘খুব বড় দলের একজন অনেক দিন পরে তার বাড়িতে যাবেন, কিন্তু নির্বাচন কমিশন তাকে থামিয়ে দিয়েছে। আর কী লেভেল প্লেয়িং দরকার একটা দেশের জন্য। আমরা বললাম যে নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পোস্টারগুলো সরিয়ে ফেলবে। জামায়াতে্র আমির বললেন, সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে ফেলবেন। এটা তো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভালো লক্ষণ। আমরা তো মনে করি নির্বাচনের সময় প্রায় দেড় মাসের বেশি চলে গেছে (তফসিল ঘোষণার পর)। এখন মানুষ খুব প্রচারে নামছে। এর মধ্যে তো আমরা গুরুতর কিছু পাইনি।’’

এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘‘টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া অনেক বড় এলাকা। এখন যদি কেউ মনে করেন যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নাই, অর্থাৎ তিনি যদি মনে করেন যে আমার প্রতি জুলুম করছেন, আমার কর্মীদের মারধর করেন, আমার মাইক ছিনিয়ে নেন, আমাকে নির্বাচনে স্বাভাবিকভাবে প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করেন— তাহলে উনি বা ওনার পক্ষ থেকে বা ওনার কোনও কর্মী, বা যে কোনও ভোটার অভিযোগ করতে পারেন। নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গ হয়েছে কিনা, ইনকোয়ারি হবে। তারা (কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা) ইনকোয়ারি করে দেখবেন যে আসলে ঘটনা সত্য আছে কিনা। যদি সত্যতা থাকে, উনি নির্বাচন কমিশনের কাছে সুপারিশ করবেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে দলগুলোর নেই প্রতিক্রিয়া

বাগেরহাটে গত শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) দুপুরে সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে স্বামীর বাড়ি থেকে কানিজের ঝুলন্ত মরদেহ এবং ৯ মাস বয়সী ছেলে সেজাদ হাসান নাজিফের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। কানিজ সুবর্ণা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলার সভাপতি জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দামের স্ত্রী। জুয়েল বর্তমানে যশোর জেলা কারাগারে আছেন। স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় অংশ নিতে জুয়েলকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। এই নিষ্ঠুর ঘটনা কিংবা আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলতে না যাওয়া এবং আইসিসির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের জায়গা কী হবে—এসব নিয়ে রাজনীতিবিদরা একেবারেই চুপ। আলোচনায় নেই চড়া বাজার বা সমসাময়িক বিচারবহির্ভূত হত‍্যাকাণ্ডও।

সমসাময়িক অলোচিত বিষয়গুলো নির্বাচনি প্রচারণায় জায়গা পাওয়া দরকার মনে করেন কিনা, প্রশ্নে মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘‘মানবাধিকার লঙ্ঘন, লাগামছাড়া দ্রব্যমূল্য, কিংবা জাতীয় দলের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ না করার মতো ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন ইস্যু নয়। বরং এগুলো একটি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। রাজনৈতিক দলগুলোর এই নীরবতাও অবশ্য আকস্মিক নয়। আপাতদৃষ্টিতে তারা নির্বাচনকে আর নীতিনির্ভর গণআন্দোলনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে না। ক্ষেত্র বিশেষে ক্ষমতায় যাওয়ার একটি কৌশলগত প্রতিযোগিতা মনে হতে পারে। ফলে মানবাধিকার, জীবনযাত্রার ব্যয় বা জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নগুলো তাদের প্রচারণায় প্রাধান্য দেখছি না। অথচ এসব ইস্যুতে জনগণ তাদের অবস্থান প্রত্যাশা করে। রাজনৈতিক দলগুলো জানে—জনগণের দৈনন্দিন কষ্ট নিয়ে কথা বললে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা স্বীকার করতে হয়। আর বিরোধিতায় থাকলেও ভবিষ্যৎ সুবিধার রাস্তা সংকুচিত হয়।’’

দেশে থাকা-না থাকাও প্রচারণার ইস্যু

দেশ ছেড়ে কেউ চলে যান, আবার কেউবা দেশে থেকেই লড়াই করেছেন—নির্বাচনি প্রচারণায় এসবও পরস্পরের বিরুদ্ধে ব‍্যবহারের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সকালে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী এসএম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত ১০ দলীয় নির্বাচনি জনসভায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘‘আমরা রাজনীতি করি মজলুম মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। স্বৈরাচার সরকার গায়ের জোরে আমাদের মসজিদ থেকে বের করে দেয়—বিগত সময়ে আমাদের নেতাকর্মীরা চরম অত্যাচার-জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তারপরও তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। আমাদের নেতাকর্মীরা দেশেই থেকেছেন, মানুষের পাশে থেকেছেন। এর পাল্টা কথা বিএনপি সমাবেশ থেকেও এসেছে। গত ২২ জানুয়ারি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে প্রস্তাবিত উপজেলা পরিষদ মাঠে নির্বাচনি সমাবেশকালে তারেক রহমান বলেন, ‘‘আমরা অতীতে কী দেখেছি? কিছু হলেই পাশের এক দেশে চলে যান কেউ কেউ, চলে যান না? এখনও চলে গিয়েছেন। আবার গতকালকে (২১ জানুয়ারি) আমরা দেখেছি, এক লোক পালিয়ে গিয়েছিলেন। কোথায় পালিয়ে গিয়েছিলেন জানেন? পিন্ডি পালিয়ে গিয়েছিলেন। কেউ যান দিল্লি, কেউ যান পিন্ডি। কিন্তু বিএনপি রয়ে গেছে এই দেশে, এই দেশের মানুষের পাশে।’’ তিনি বলেন, ‘‘খালেদা জিয়া কোথাও গিয়েছেন? খালেদা জিয়া এই দেশের মানুষকে ছেড়ে কোথাও যাননি। মৃত্যুকে মেনে নিয়েছেন, যুদ্ধ করেছেন, প্রতিবাদ করেছেন, কিন্তু এই দেশের মানুষকে ছেড়ে কোথাও যাননি।’’

‘বাংলাদেশে কে ছিলেন আর কে পালিয়েছেন—এটা আলোচনায় বারবার আনা, ব্যক্তিগত আক্রমণ করা কাম‍্য না’ উল্লেখ করে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘‘প্রচারণায় নানা বিষয়ে তর্ক হবে, একজনের কথার উত্তর আরেকজন দেবেন। এটার কারণে যেন কর্মী পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি না হয়, সেটা দেখার দায়িত্ব শীর্ষ নেতাদেরই।’’