Image description
দুদকের অভিযানে উন্মোচিত স্বাস্থ্য খাতের নোংরা চিত্র

সরকারি হাসপাতাল—যেখানে মানুষ আসে জীবন বাঁচাতে, সেখানে পা রেখেই অনেককে নামতে হয় আরেক যুদ্ধের ময়দানে। চিকিৎসার বদলে অবহেলা, সেবার বদলে হয়রানি, আর জনগণের টাকায় চলে নির্লজ্জ লুটপাট। এখানে রোগী কেবল ভুক্তভোগী আর দুর্নীতিই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একের পর এক অভিযানে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে দেশের সরকারি স্বাস্থ্য খাতের ভয়াবহ, অমানবিক ও নৈরাজ্যকর এ চিত্র।

এ তথ্য বলছে, সরকারি হাসপাতাল পরিণত হয়েছে এক লুটের স্বর্গে, যেখানে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা রোগীর ভাগ্যে জোটে না সুষম খাবার, অথচ কাগজে-কলমে বিল ওঠে পূর্ণমাত্রায়। দায়িত্বে থাকার কথা যাদের, সেই চিকিৎসক ও নার্সদের অনেকেই থাকেন অনুপস্থিত। চিকিৎসকের পরিবর্তে রোগী দেখেন টেকনোলজিস্ট বা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট। সরকারি ওষুধ বাইরে বিক্রি হয়, মেয়াদোত্তীর্ণ রিএজেন্ট দিয়ে করা হয় পরীক্ষা, অকেজো যন্ত্রপাতি দিয়েই চলে চিকিৎসা কার্যক্রম।

হাসপাতালের ওয়ার্ড, বাথরুম ও রান্নাঘর পরিণত হয়েছে অস্বাস্থ্যকর নরককূপে। আর চত্বরে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে ভর্তি, বেড, ট্রলি কিংবা অক্সিজেন পেতেও গুণতে হয় ঘুষ। টেন্ডার, আউটসোর্সিং, ফি আদায়—সবখানেই অনিয়ম আর আত্মসাতের ছাপ। এ চিত্র কোনো একটি হাসপাতালের নয়; বরং দুদকের অভিযানে ধরা পড়া শতাধিক সরকারি হাসপাতালের অভিন্ন বাস্তবতা।

এ বাস্তবতার সাম্প্রতিক উদাহরণ নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্তব্য অবহেলা এবং রোগীদের খাবার সরবরাহে অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত ১৫ জানুয়ারি সেখানে অভিযান চালায় দুদক। প্রথমে ছদ্মবেশে অভিযান পরিচালনা করে দলটি। এতে দেখা যায়, ওইদিন কর্তব্যরত দুজন চিকিৎসক ও কয়েকজন কর্মচারী কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। হাসপাতালে ভর্তি ৩৫ জন রোগীর মধ্যে মাত্র ২০ জনকে খাবার সরবরাহ করা হয়। পুরো হাসপাতালই ছিল অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা।

অভিযান পরিচালনাকারীরা জানান, সেনবাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্বরত চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে সরকার নির্ধারিত কর্মঘণ্টা অনুসরণ করছেন না। কেউ সকাল ১০টার পর, আবার কেউ দুপুরের পর হাসপাতালে উপস্থিত হন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হয় এবং অভিযানে অভিযোগগুলোর প্রমাণও পাওয়া গেছে।

এ চিত্র শুধু সেনবাগের নয়; বরং এটি সারা দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোরই প্রতিচ্ছবি। একদিকে অনুমোদিত পদের বিপরীতে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্য খাতের জনবলে রয়েছে চরম সংকট, অন্যদিকে নিয়মিত ও নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে উপস্থিত না থাকার অভিযোগ রয়েছে চিকিৎসক ও নার্সদের বিরুদ্ধে। হাসপাতালের ওয়ার্ড, বাথরুম ও রান্নাঘরের পরিবেশ চরম অস্বাস্থ্যকর। দরপত্র, বিল পাস ও আউটসোর্সিং ব্যবস্থায় আর্থিক অনিয়মের প্রমাণও বিভিন্ন সময়ের অভিযানে উঠে এসেছে। বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে অবৈধ যোগসাজশ এবং হাসপাতাল চত্বরে দালালদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এতে একদিকে রোগীদের আর্থিক ক্ষতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঘটছে। ফলে দেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। গত বছর দেশজুড়ে পরিচালিত দুদকের অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণ ও কালবেলার নিজস্ব অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতাল ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। জনস্বাস্থ্য রক্ষা, মহামারি নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটাতে সে সময় জেলা ও মহকুমা পর্যায়ে হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। পাকিস্তান আমলে কাঠামো কিছুটা সম্প্রসারিত হলেও স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে সরকারি হাসপাতাল ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটায়। বর্তমানে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালের প্রধান লক্ষ্য বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে সব নাগরিকের জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে সরকার প্রতি বছর বিপুল ভর্তুকি দিচ্ছে। যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল, তবে তারও সঠিক বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

গত জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দুদকের চালানো অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রায় ১০০টি সরকারি হাসপাতালে সরেজমিন অনুসন্ধান করেছে কালবেলা। এতে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের ১১১টি সরকারি হাসপাতালে দুদক অভিযান পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১টি হাসপাতালে রোগীর খাবার সরবরাহে অনিয়ম ধরা পড়েছে, যা মোট অনিয়মের প্রায় ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ। ২৮টি হাসপাতালে দরপত্র ও অন্যান্য আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে, যার মধ্যে রয়েছে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় গাফিলতি, অতিরিক্ত ফি আদায়, আউটসোর্সিং বেতন আত্মসাৎ ও ভুয়া বিল তৈরি, যা মোট অনিয়মের ২৫ দশমিক ২ শতাংশ। ২৪টি হাসপাতালে ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ধরা পড়েছে, যা মোট অপরাধের ২১ দশমিক ৬ শতাংশ। ২১টি হাসপাতালে চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সময়মতো কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকার প্রমাণ মিলেছে, যা মোট অপরাধের ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এ ছাড়া সাতটি হাসপাতালে দালালের দৌরাত্ম্য, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে যোগসাজশের চিত্র উঠে এসেছে, যা মোট অপরাধের ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।

দুদকের কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ বলেন, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের একটি মৌলিক অধিকার এবং এ খাতে সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকারি হাসপাতালে যে সেবা ২০ থেকে ৪০ টাকায় পাওয়ার কথা, সেটির জন্য বাইরে গিয়ে রোগীদের ২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে, যা বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ মানুষের পক্ষেই বহনযোগ্য নয়। অনেক মানুষ এখনো ‘হ্যান্ড টু মাউথ’ জীবনযাপন করছে, অথচ সরকারি ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ বাস্তবতা বিবেচনায় দুদক বছরজুড়ে অভিযান চালাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে একই প্রতিষ্ঠানে দুই বা তিনবার অভিযান করা হচ্ছে, যাতে স্বাস্থ্যসেবায় উন্নতির স্পষ্ট বার্তা যায়। তবে এটি এখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও মানসিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে, যেখানে অনেক কর্মকর্তা পোস্টিংকে শাস্তি হিসেবে দেখেন।

এ ব্যবস্থার উত্তরণে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, সরকার, এনজিও ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতা প্রয়োজন বলে মনে করেন হাফিজ আহসান ফরিদ। তিনি জানান, অনিয়ম পাওয়া মাত্র ফের অভিযান ও প্রয়োজনে মামলা করা হবে। কনস্ট্রাকশন, ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও রিএজেন্ট খাতেই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়। তাই শাস্তির পাশাপাশি ভালো সেবা দেওয়া চিকিৎসকদের স্বীকৃতি ও সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

কালবেলার অনুসন্ধান ও দুদকের এক বছরের অভিযানের চিত্র

দুদকের গত এক বছরের অভিযানে দেশের স্বাস্থ্য খাতের যে খণ্ডচিত্র উঠে এসেছে, তা আঁতকে ওঠার মতো। গত ১৯ জানুয়ারি রংপুর ও সিলেট ন্যাশনাল ইলেক্ট্রো মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপে অভিযানে দেখা যায়, পুরোনো যন্ত্রপাতিতে নকল স্টিকার লাগিয়ে নতুন হিসেবে সরবরাহ করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। ২৩ জানুয়ারি বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে খাবার সরবরাহে অনিয়ম ও হয়রানির প্রমাণ পাওয়া যায়। পিরোজপুর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ২৭ জানুয়ারি অভিযানে মেলে রিএজেন্ট কেনাকাটায় বড় ধরনের দুর্নীতি।

গত বছরের ২৯ জানুয়ারি নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে দেখা যায়, হাসপাতালের ভেতরেই চলছে অনুমোদনহীন বেসরকারি ফার্মেসি। মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩০ জানুয়ারি অভিযানে নিম্নমানের খাবার ও কেনাকাটায় দুর্নীতির সত্যতা পায় দুদক। ৫ ফেব্রুয়ারি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখা যায়, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন তুলছেন চিকিৎসক ও কর্মচারীরা। ১০ ফেব্রুয়ারি বিএমইউ প্রিজন সেলে কারাবন্দিদের অবৈধ ভিআইপি সুবিধা দেওয়ার তথ্য বেরিয়ে আসে।

পটুয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি টাকা আদায় এবং ওষুধ বিতরণে অনিয়ম ধরা পড়ে। টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ মার্চ রিএজেন্ট কেনাকাটার দরপত্রে অনিয়ম পায় দুদক। ১৩ এপ্রিল মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভুয়া রোগী ভর্তি দেখিয়ে সরকারি টাকা পকেটে ভরার প্রমাণ মেলে। ১৭ এপ্রিল সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে জনবল নিয়োগে দুর্নীতির চিত্র ফুটে ওঠে। ২২ এপ্রিল হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে চিকিৎসকের বদলে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট দিয়ে রোগী দেখা এবং গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে এক্স-রে ফিল্মের কৃত্রিম সংকট তৈরি, ২৩ এপ্রিল দিনাজপুরের বীরগঞ্জে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় এবং কুড়িগ্রামে সরকারি ওষুধ বিতরণে নয়ছয়ের প্রমাণ মেলে। জাতীয় অর্থোপেডিক ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (নিটোর) ২৭ এপ্রিল অভিযানে দেখা যায়, অধিকাংশ জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ২৮ এপ্রিল মিলেছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ।

হাসপাতালের খাবারের মান নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতাল, যশোরের অভয়নগর, লালমনিরহাট, ফেনীর দাগনভূঞা এবং কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর—সবখানেই রোগীদের নিম্নমানের খাবার দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে দুদক। অনেক ক্ষেত্রে বাসি-পচা খাবার সরবরাহের অভিযোগও সত্য প্রমাণিত হয়েছে। উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৯ মে অভিযানে দেখা যায়, মাংসের ওজনে কারচুপি করা হচ্ছে।

দুর্নীতির ধরন আরও ভয়াবহ রূপ নেয় যখন হাসপাতালের আইসিইউ বা জরুরি বিভাগ বন্ধ রেখে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করা হয়। ১ জুন মাদারীপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে দেখা যায়, আইসিইউ চালু না করেই বরাদ্দ শেষ করা হচ্ছে। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ৩ জুন আউটসোর্সিং কর্মীদের বেতন আত্মসাতের প্রমাণ মেলে। ১৬ জুন নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে রোগী মারধরের মতো অমানবিক ঘটনাও দুদকের তদন্তে উঠে আসে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৫ জুন ট্রলি ব্যবহারে ঘুষ গ্রহণ এবং অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য হাতেনাতে ধরে দুদক। জুলাই মাসে রাজধানীর শ্যামলী শিশু হাসপাতালে কোনো নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই চিকিৎসক নিয়োগের নথিপত্র পাওয়া যায়। মুগদা মেডিকেল কলেজে ১৭ জুলাই অভিযানে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় বড় দুর্নীতির তথ্য মেলে। আগস্ট মাসে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে সরকারি ভ্যাকসিন হাসপাতালের বাইরে বিক্রির চাঞ্চল্যকর প্রমাণ পায় দুদক।

সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসেও অভিযানের গতি কমেনি। পাবনার ভাঙ্গুড়া, বাগেরহাটের শরণখোলা, টাঙ্গাইলের কালিহাতী (যেখানে মেয়াদোত্তীর্ণ ইনজেকশন ব্যবহারের প্রমাণ মেলে), এবং নওগাঁর মহাদেবপুরে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে ৫ অক্টোবর ওষুধ কেনাকাটায় দুর্নীতি এবং সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ১৩ অক্টোবর ‘সিট বাণিজ্যের’ খবর দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কদর্য রূপটিই সামনে আনে।

অক্টোবরের শেষদিকে কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। নভেম্বরে যশোরের মনিরামপুরে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ায় অনিয়ম, মুন্সীগঞ্জে দরপত্রে দুর্নীতি এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দিয়ে মূল চিকিৎসা কার্যক্রম চালানোর চিত্র ধরা পড়ে। ২৭ নভেম্বর হবিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে অভিযানে দেখা যায় অধিকাংশ চিকিৎসকই তাদের স্টেশনে নেই।

জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সেবা খাতগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য খাত অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত। বিভিন্ন গবেষণা ও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই বাস্তবতার এরই মধ্যে প্রমাণিত।’

তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ অত্যন্ত কম। তবে যে সামান্য বরাদ্দ দেওয়া হয়, তারও বড় একটি অংশ ক্রয় প্রক্রিয়া ও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের কারণে অপচয় হয়ে যায়। এতে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিয়মিতভাবে সুবিধা ভোগ করছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর কালবেলাকে বলেন, দুদক বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায়। কিন্তু সেখানে যেসব অনিয়ম বা গাফিলতি পাওয়া যায়, সেটা স্বাস্থ্য প্রশাসনকে অবহিত করে না। ফলে এ-সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে আমাদের বেগ পেতে হয়। আমরা সাধারণ দুদকের অভিযানের পর গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে জানতে পারি। তখন স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনকে (সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক) খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়ে থাকি। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-সংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রমাণ থাকলে সেটা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অবহিত করলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।