রাজধানীর উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের একটি ছয়তলা ভবনে ১৬ জানুয়ারি অগ্নিকাণ্ডে দুই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু হয়। ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় আগুন লাগে অথচ সেখানে কেউ মারা যাননি। মারা গেছেন পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার বাসিন্দা। ওই দুটি ফ্ল্যাটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেনি। ফায়ার সার্ভিস জনিয়েছে, ভবনের ছাদ তালাবদ্ধ থাকায় সিঁড়িতে প্রচুর কালো ধোঁয়া জমে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার বাসিন্দারা ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়। ছাদ বন্ধের কারণে প্রাণহানির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কেও অবহিত করেছে ফায়ার সার্ভিস।
এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবনটিতে ছিল না কোনো ফায়ার সেফটি প্ল্যান। যদি প্রতিটি ফ্লোরে ফায়ার অ্যালার্ট বেল থাকত তাহলে দুর্ঘটনার পর দ্বিতীয় তলার লোকজন যখন বের হয়েছেন তখন তারা বেলের সুইচ টিপে দিলে প্রতিটা ফ্লোরের লোক বুঝে যেতেন অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। তখন দ্রুত অন্যরা নিরাপদে বের হয়ে যেতে পারতেন।
এর আগে গত বছরের ১৪ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুর শিয়ালবাড়ির ৩ নম্বর রোডের দুটি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। ওই ঘটনায়ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, পোশাক কারখানার ভবনের ছাদের দরজায় তালা থাকায় ধোঁয়া থেকে বাঁচতে ছাদে যেতে পারেননি কারখানার কর্মীরা। বিষাক্ত ধোঁয়ায় অজ্ঞান হয়ে পড়েন তারা। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়লে পুড়ে অঙ্গার হন তারা।
শুধু এ দুটিই নয়, গ্রিন কোজি কটেজ, এফআর টাওয়ার ও চুড়িহাট্টাসহ এমন বহু অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। ভবনগুলোর ছাদ খোলা থাকলে প্রাণহানি অনেক কমানো সম্ভব হতো বলে মনে করেন অগ্নিবিশেজ্ঞরা। একাধিক আবাসিক ভবনের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর বেশির ভাগ ভবনের ছাদের গেট দিন-রাত তালাবদ্ধ থাকে। কোনো কোনো ভবনে দিনে খোলা হলেও রাতে তালা লাগানো থাকে। বাসিন্দাদের কাছে গেটের চাবিও দেওয়া হয় না। ফলে ভবনে অগ্নিকাণ্ড হলে অসহায়ভাবে প্রাণ দিতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, গত বছর (২০২৫) দেশজুড়ে ২৭ হাজার ৬৭টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে শুধু বাসাবাড়ি ও বহুতল আবাসিক ভবনেই ঘটে ৮ হাজার ৪৬৪টি অগ্নিকাণ্ড। এর আগের বছর ২০২৪ সালে দেশে ২৬ হাজার ৬৫৯টি অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে ৭ হাজার ২৮৪টি বাসাবাড়ি ও বহুতল আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়। অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর দিক থেকে এগিয়ে আছে আবাসিক সেক্টর। এর আগে ২০২৪ সালে শুধু আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে ৬০ জন মারা যান, আহত হন ৭৯ জন। আর বহুতল বাণিজ্যিক ভবনে আগুনে মারা যান ৪৭ জন, আহত হন ৭৮ জন। ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, যখন অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে তখন ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিক প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়। সেখানে সুপারিশসহ অগ্নিকাণ্ড ও মৃত্যুর কারণ উল্লেখ থাকে। ফলে বহুতল ভবনের ছাদ তালাবদ্ধ থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাই অবগত আছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ভবনের ছাদে প্রবেশে বাধার বিষয়টি ফায়ার সার্ভিসের এখতিয়ারভুক্ত নয়। এগুলো প্রশাসনিক বিষয়। তিনি বলেন, ছাদ তালাবদ্ধ নতুন ইস্যু নয়। এর ফলে আগেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। চুড়িহাট্টা, বেইলী রোডে গ্রিন কোজি কটেজ, এফআর টাওয়ারসহ সর্বশেষ উত্তরার আবাসিক ভবনে ছাদের গেটে তালা থাকায় প্রাণহানি ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে আমাদের প্রো-অ্যাকটিভ হতে হবে। তবেই প্রাণহানি কমানো সম্ভব।
রাজউকের পরিচালক (ডেভেলপমেন্ট কন্ট্রোল) মোহাম্মদ মনিরুল হক যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে, ইতোমধ্যে মোবাইল কোর্টকে (ভ্রাম্যমাণ আদালত) নির্দেশনা দিয়েছি। মোবাইল কোর্ট ছাদ বন্ধ পেলে খুলে দিয়ে আসবেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।
বহুতল ভবন নির্মাণে অনুমোদনের সময় নকশায় ছাদ খোলা রাখার বিষয়ে কোনো শর্ত থাকে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নকশায় এমন কোনো নির্দেশনা থাকে না। তবে ফায়ার সার্ভিসের এনওসি নেওয়ার সময় ছাদ সার্বক্ষণিক খোলা থাকার বিষয়টি উল্লেখ থাকে। বিষয়টি মানা হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব আমাদের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসেরও। তারা ছাড়পত্র দেওয়া বিভিন্ন বিল্ডং ভিজিট করতে পারে। এদিকে নগরবাসীর নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। ফলে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগে বাসিন্দাদের প্রাণ রক্ষার জন্য ভবন মালিক যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছেন কিনা সে বিষয়ে দেখভালের দায়িত্বও রয়েছে সংস্থাটির। কিন্তু এ বিষয়ে সিটি করপোরেশন উদাসীন। জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ মোহাম্মদ নাঈম (পরিবেশ জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেল) যুগান্তরকে বলেন, এর মূল দায়িত্ব রাজউকের। কারণ ভবনের অনুমোদন রাজউকই দিয়ে থাকে। তবে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টি যেহেতু দুর্যোগ সেহেতু আমাদেরও দায় আছে। সবাই একসঙ্গে কাজ করলে এই সমস্যা উত্তরণ সম্ভব।