এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে চলছে অন্য রকম উত্তেজনা। রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে এই উত্তেজনার পারদ ক্ষণে ক্ষণে ওঠানামা করছে। সে ঢেউ লাগছে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায়। নির্বাচনের মাঠে বইছে এলোমেলো হওয়া। কখনো প্রার্থী ও তার সমর্থকদের রক্ত হীম হয়ে যাচ্ছে; কখনে সেই হীম রক্তের সঞ্চালনে উত্তাপ বাড়াচ্ছে। দাখিলকৃত রেকর্ডপত্র দেখে প্রার্থীকে ‘বৈধ’ ঘোষণা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ সেটি ‘বাতিল’ করে দিচ্ছেন। আবার ইসি ‘ঋণখেলাপি’ হিসেবে যার প্রার্থিতা বাতিল করছে, হাইকোর্ট তাকে ‘বৈধ’ ঘোষণা করছেন। হাইকোর্ট যাকে ‘বৈধ’ বলে রায় দিচ্ছেন, চেম্বার কোর্টে সেটি হয়ে যাচ্ছে ‘অবৈধ’।
আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সেই ‘অবৈধতা’ নাকচ করে দিচ্ছেন। ক্ষণে ক্ষণে বদলাচ্ছে সিদ্ধান্ত। ইসি এবং উচ্চ আদালতের এসব সিদ্ধান্তই ভোটের মাঠে ছড়াচ্ছে উত্তাপ। প্রার্থীর ‘প্রার্থিতা’র এই ‘বাতিল-বহাল’ খেলায় বদলে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আসনওয়ারি হিসাব-নিকাশ। স্থানীয়ভাবে সৃষ্টি হচ্ছে চাঞ্চল্য, পাল্টে যাচ্ছে ভোটের হাওয়া। ভোটার ও রাজনৈতিক কর্মীদের মাঝে চড়ছে উত্তেজনা। সেই ‘উত্তেজনা’ কোথাও কোথাও রূপ নিচ্ছে সংঘাত-সংঘর্ষে। সব মিলিয়ে এদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ভোটের আমেজ’ বলতে যা বোঝায়, সেটি বিরাজ করছে এখন। স্বতঃস্ফূর্ত। উত্তেজনাপূর্ণ। আনন্দমুখর ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। যে পরিবেশের স্বাদ দেশের মানুষ গত ১৮টি বছর পায়নি। ফ্যাসিস্ট হাসিনা কেড়ে নিয়েছিল মানুষের ভোটের অধিকার। ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ নির্বাচনের রূপ কেমনÑ নতুন ভোটার সেটি জানেন না। তরুণ প্রজন্মের কাছে এ এক নতুন দৃশ্য। অতি আরাধ্য। দীর্ঘ প্রত্যাশিত। শহীদ জিয়া প্রবর্তিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে এ এক অনন্য উত্তরণ-যাত্রা। গতকাল (বুধবার) প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে। আজ (২২ জানুয়ারি) থেকে শুরু হচ্ছে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা। এর মধ্য দিয়ে পুনঃউন্মোচিত হতে যাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পূর্ণযাত্রা।
ইসি এবং আদালত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, এবার প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল, বহাল, পুনর্বহালের কিছু তাৎপর্য রয়েছে। প্রধান তাৎপর্যটি হচ্ছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসি এবার ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) প্রতিপালনে লক্ষ করা গেছে আন্তরিকতা। ফলে প্রার্থিতা ‘বহাল’ এবং ‘বাতিল’ এর ক্ষেত্রে মোটামুটি ‘কমন’ কিছু কারণ চিহ্নিত করা গেছে। আরপিও অনুযায়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটের অন্তত ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন সম্বলিত তালিকা ইসিতে জমা দিতে হয়। দাখিলকৃত তালিকার স্বাক্ষর বা তথ্যে গরমিল থাকায় অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করেছে ইসি।
কোনো প্রার্থী ‘ঋণখেলাপি’ হলে বা জামিনদার হিসেবে ঋণের টাকা বকেয়া থাকলে তার মনোনয়ন বাতিল হওয়ার বিধান রয়েছে আরপিওতে। এমনকি বিদ্যুৎ. পানি, হোল্ডিং ট্যাক্স, টলিফোনের মতো সরকারি ইউটিলিটি বিল বকেয়া থাকলেও বাতিল হতে পারে প্রার্থিতা।
‘দ্বৈত নাগরিকত্ব’ও একটি বিষয়। বাংলাদেশের নাগরিকত্বের পাশাপাশি অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব থাকলে প্রার্থী ‘অযোগ্য’ বিবেচিত হন। তথ্য গোপন ও হলফনামায় ত্রুটি থাকলেও ‘অযোগ্য’ হন প্রার্থী। আয়ের উৎস, সম্পদের বিবরণ বা শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কিত তথ্য গোপন করলে কিংবা যথাযথভাবে স্বাক্ষর না করলে বাতিল হয় মনোনয়ন।
আদালত কর্তৃক ২ বছরের বেশি কারাদ-ে দ-িত হলে এবং দ- ভোগের পর ৫ বছর সময় অতিবাহিত না হলে ওই প্রার্থী নির্বাচনে অযোগ্য হন।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্ধারিত সময়ের আগে মিছিল, সমাবেশ বা প্রচারণার মাধ্যমে আচরণবিধি ভঙ্গ করলে নির্বাচন কমিশন প্রার্থিতা বাতিল করতে পারে। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হলে দলের যথাযথ কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষরযুক্ত প্রত্যয়নপত্র জমা দেয়া বাধ্যতামূলক। এটি না থাকলেও বাতিল হয় প্রার্থিতা। কোনো ব্যক্তি লাভজনক সরকারি পদে অধিষ্ঠিত থাকলে বা সরকারি চাকরি থেকে অবসরের ৩ বছর পূর্ণ না হলে তিনি প্রার্থী হতে পারেন না। আর এবার এসব কারণেই ইসি অনেকের ‘প্রার্থিতা’ বাতিল করেছে। ‘বাতিল’ হওয়া সংক্ষুব্ধ প্রার্থীদের একটি সুযোগ দেয়া হয় নির্বাচন কমিশনে আপিল করার। ওই আপিলের আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়েই প্রার্থীরা গিয়েছেন উচ্চ আদালতে।
এবার দেড়শ’ প্রার্থীকে ইসি চূড়ান্তভাবে নির্বাচনের ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করেছে। ‘অযোগ্য’দের মধ্যে ৯৮ জনই স্বতন্ত্র। জাতীয় পার্টির ২১ জন। ৩১ জন ‘অযোগ্য’ ঘোষিত বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থী। ‘অযোগ্য’ ঘোষিত অনেক প্রার্থী ইসির সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে গেছেন। সেখানেও টেকেনি প্রার্থিতা।
গতকাল বুধবারের তথ্য অনুযায়ী কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী প্রকৌশলী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা টেকেনি। ঋণখেলাপি হওয়ায় ইসি তাকে নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করে। ইসির এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট করলে গতকাল বুধবার হাইকোর্ট সেটি খারিজ করে দেন। ফলে বিএনপির এই হেভিওয়েট প্রার্থী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারছেন না।
চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপি মনোনীত আরেক প্রার্থী সারওয়ার আলমগীর। তার বিরুদ্ধে ‘ঋণখেলাপি’র অভিযোগ রয়েছে। ইসি তাকে ‘বৈধ প্রার্থী’ ঘোষণা করলেও রিটের কারণে তার প্রার্থিতার ওপর হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোটের মাঠে আসতে পারবেন কি না, নির্ভর করছে উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
তার মতোই আদালতের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছেন কুমিল্লা-১০ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আব্দুল গফুর ভুঁইয়া। দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে ইসি তার প্রার্থিতা বাতিল করে। ‘ঋণখেলাপি’ হওয়ায় ইসি মনোনয়ন বাতিল করে যশোর-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী টি এস আইয়ুব।
চট্টগ্রাম-৯ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ড. এ কে এম ফজলুল হকের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে।
গাজীপুর-২ আসনের জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ ইসরাফিল মিয়া, কুমিল্লা-৮ আসনে জাতীয় পার্টি মনোনীত নূরুল ইসলাম মিলন এবং মানিকগঞ্জ-২ আসনের জাপা মনোনীত এস এম আব্দুল মান্নান, কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের জাপার মো: মুজিবুল হকের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে।
সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো: শফিকুল ইসলাম, ময়মনসিংহ-৬ আসনের বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো: সাইফুল ইসলাম, কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো: মোবাশ্বের আলম ভুইয়া এবং যশোর-১ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো: মফিকুল হাসান তৃপ্তির প্রার্থিতা বাতিল করে ইসি।
আবার বিভিন্ন কারণে প্রাথমিকভাবে প্রার্থিতা বাতিল হলেও ইসিতে আপিল শুনানির মাধ্যমে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন অনেকে। এ তালিকায় রয়েছেন ‘নাগরিক ঐক্য’র বগুড়া-২ আসনের প্রার্থী মাহমুদুর রহমান মান্না, মাগুরা-১ আসনে ‘গণফোরাম’ মনোনীত প্রার্থী মিজানুর রহমান, কুমিল্লা-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরী, চাঁদপুর-২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মো: আব্দুল মোমিন, যশোর-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো: মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ এবং জামালপুর-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থী মো: মজিবুর রহমান আজাদী।
উচ্চ আদালত এবং ইসি সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানিতে এবার ৪২১ জনেরও বেশি প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা ফেরত পেয়েছেন। ১৫০ জনের মতো প্রার্থী ‘অযোগ্য’ ঘোষিত হয়েছেন। ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের মতো আইনি জটিলতায় উচ্চ আদালতে ঝুলছে আরো বেশ ক’জন প্রার্থীর প্রার্থিতা-ভাগ্য।
এদিকে ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ গতকাল বুধবার প্রতিবেদককে বলেন, নির্বাচন সংক্রান্ত মামলাগুলো প্রায় শেষ। ডি-লিমিটেশনের মামলাগুলো ইতোমধ্যেই সব নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
‘প্রতীক বরাদ্দের সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে। যাদের প্রার্থিতা এখনো উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে তাদের প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে কি না’Ñ জানতে চাইলে সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, প্রতীক বরাদ্দের বিষয়ে একটু জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেমন নির্বাচন কমিশন একটি সিদ্ধান্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে রেফার করেছে। বিষয়টি হচ্ছে, একজন প্রার্থী জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এখন তিনি বলছেন, তাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতীক বরাদ্দ দিতে। ইসি যদি এ বিষয়টি নিয়ে কোর্টে আসে তাহলে হয়তো আগামী রোববারের দিকে আসতে পারে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের আসলাম চৌধুরীর একটি বিষয় আপিল বিভাগে পেন্ডিং আছে।
মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ বলেন, ইলেকশন সংক্রান্ত মামলায় সরকার কোনো পক্ষ নয়। তবে সরকার চায় একটি অংশগ্রহণমূলক স্বতঃস্ফূর্ত নির্বাচন। সরকারের এখানে কিছুই করার নেই। যদি কোনো আইনের ব্যত্যয় ঘটে সেটি নির্বাচন কমিশনই ডিসাইড করবে।