নির্বাচন এলেই দেশের ব্যবসায়ী সমাজকে যে অদৃশ্য অথচ প্রবল চাপের মুখে পড়তে হয়, তা এতদিন ছিল অনেকটাই ‘ওপেন সিক্রেট’। তবে রাজনৈতিক অর্থায়নের অস্বচ্ছ ও অনৈতিক চর্চাকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছেন শিল্প খাতের শীর্ষ এক নেতা। এমপি প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের কাছে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছেন বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। একটি টকশোতে তার সরাসরি বক্তব্য শুধু ব্যবসায়ী মহলেই নয়, রাজনীতি ও প্রশাসনিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
টকশোতে অংশ নিয়ে শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘‘এমপি প্রার্থীদের পক্ষ থেকে এ ধরনের চাঁদা দাবি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’’ তার ভাষায়, “ব্যবসা করতে গিয়ে আমাদের নানামুখী চাপ ও বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অনেক সময় এটাকে জীবনের চলার পথে এক ধরনের ‘প্যাকেজ ডিল’ হিসেবেই মেনে নিতে বাধ্য হই। কিন্তু চাঁদাবাজির বিষয়টি এখন এমন পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, যা আর কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলা যায় না।”
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, সম্প্রতি একজন এমপি প্রার্থী তাকে ফোন করে সহযোগিতা চেয়েছেন। “আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম— একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সহযোগিতা করা যেতে পারে। কিন্তু উনি যেটা প্রকাশ্যে বললেন, সেটা ছিল কোটি টাকার চাহিদা। শুনে মনে হলো, যেন আমার কোম্পানিতে তার কোনও মালিকানা আছে। ঠিক সেই ভঙ্গিতেই আবদার করা হয়েছে,” বলেন বিটিএমএ’র সভাপতি।
তিনি জানান, এ ধরনের ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন বা একক ঘটনা নয়। বরং তিনি নিজে এবং আরও অনেক ব্যবসায়ী একই ধরনের চাপের মুখে পড়ছেন। “এগুলো মোটেও সঠিক নয়। এ ধরনের চর্চা বন্ধ হওয়া উচিত,” বলেন তিনি।
চাঁদাবাজির সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘‘সাধারণভাবে আমরা চাঁদাবাজি বলতে বুঝি—যেখানে কর্মসংস্থান নেই, সেখানে বিকল্প আয়ের পথ হিসেবে কেউ কেউ চাঁদাবাজিতে জড়ায়। কিন্তু একজন এমপি পদপ্রার্থী যদি ফোন করে দুই কোটি টাকা দাবি করেন এবং এক টাকা কম হলে হুমকিসূচক আচরণ করেন— তাহলে সেটাকে কোনোভাবেই সামাজিক বা রাজনৈতিক বাস্তবতার অজুহাতে ব্যাখ্যা করা যায় না।’’
এমপি প্রার্থীদের নাম প্রকাশ না করার বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেন, “এগুলো নাম বলার বিষয় নয়। তবে যারা দল পরিচালনা করেন, কিংবা দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আছেন— এ বিষয়ে তাদের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া উচিত। সব রাজনৈতিক দলের প্রধানদের উচিত ঘোষণা দেওয়া— এ ধরনের দাবি করলে ব্যবসায়ীরা যেন নির্ভয়ে তা জানাতে পারেন।”
তিনি আরও বলেন, “এটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনা দরকার। কোনও একটি দলের জন্য নয়— সব দলের ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেন, “অভিযোগকারীর বক্তব্যে কোনও দল বা কোনও ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। কারা এ ধরনের কাজ করছেন, সেটা সুস্পষ্ট নয়। তবে আমাদের দলের কারোর বিরুদ্ধে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসলে, তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শওকত আজিজ রাসেলের বক্তব্যের পর ব্যবসায়ী মহলে আলোচনার সূত্রপাত হলেও বাস্তব পরিস্থিতির আরও বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেন নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় এমনিতেই অত্যন্ত বেশি। বিশেষ করে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ব্যবসা করার সুযোগ ও সুবিধা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। এই বাস্তবতায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অবৈধ ও অন্যায্য কোনও অতিরিক্ত ব্যয় বহনের সক্ষমতা বেশিরভাগ ব্যবসায়ীর নেই।’’
তবে বাস্তবতার কথা স্বীকার করে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “বাস্তব পরিস্থিতিতে কিছু ব্যবসায়ীকে বাধ্য হয়েই নির্বাচনি প্রার্থীদের জন্য এ ধরনের বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে।” তার মতে, নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি বড় দল নিজেদের অর্থায়ন ও নিজস্বভাবে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান থেকেই নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহ করছে। ফলে তাদের বাইরের কোনও ব্যবসায়ীর দ্বারস্থ হতে হচ্ছে না। কিন্তু অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রে সে চিত্র ভিন্ন। তাদের নির্বাচনি ব্যয় মেটাতে ব্যবসায়ীদের কাছেই যেতে হয়।
তিনি বলেন, “নির্বাচনের সময় কিছু ব্যবসায়ী হয়তো এমন ব্যয় করতে পারেন, কিন্তু সব ব্যবসায়ীর পক্ষে এই ধরনের অবৈধ খরচ বহন করা সম্ভব নয়।”
মোহাম্মদ হাতেমের মতে, প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেরই উচিত সেবামূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক এমন কাঠামো গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে নির্বাচন এলে নিজেদের নির্বাচনি ব্যয় নিজেরাই নির্বাহ করতে পারেন। এতে ব্যবসায়ী সমাজকে অপ্রয়োজনীয় চাপের মুখে পড়তে হবে না।
তিনি বলেন, “যখন এমনিতেই ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ঊর্ধ্বমুখী, তখন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনও ধরনের অবৈধ ব্যয় বহন করতে চায় না ব্যবসায়ী সমাজ। বরং শিল্প ও বাণিজ্যের টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করতে নীতিগত সহায়তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং একটি বাস্তবসম্মত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি।”
একই সুরে কথা বলেন বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘দেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ব্যবসা করার সুযোগ ও সুবিধা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় অবৈধ ও অন্যায্য কোনও অতিরিক্ত ব্যয় বহন করার সক্ষমতা বর্তমানে দেশের ব্যবসায়ীদের নেই।’’
তিনি বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছ থেকে কার্যকর লজিস্টিক সাপোর্ট প্রত্যাশা করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি সংকট স্থানীয় শিল্প খাতের উৎপাদনকে চাপে ফেলছে। গ্যাস সংকটের কারণে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে উৎপাদন ব্যয় ও সার্বিক পরিচালন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।’’
এর পাশাপাশি শিল্প খাতে করভার ও শুল্কচাপ বৃদ্ধি, শ্রম অসন্তোষ, আমদানির ক্ষেত্রে নানা প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা এবং পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজির মতো সমস্যাগুলো শিল্প খাতের উৎপাদন ও ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এসব সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবে শিল্প খাতের উৎপাদন কার্যক্রম ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, “এমনিতেই যখন ব্যবসা পরিচালনার খরচ ঊর্ধ্বমুখী, তখন নতুন করে আর কোনও ধরনের অবৈধ ব্যয় বহন করতে চায় না ব্যবসায়ী সমাজ। বরং বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণে নীতিগত সহায়তা, কার্যকর জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।”
চাঁদাবাজি অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন বলেন, ‘‘চাঁদাবাজির কারণে ইতোমধ্যে একজন ব্যক্তি পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় নিহত হয়েছেন, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।’’
বাংলা ট্রিবিউনকে তুহিন বলেন, “চাঁদাবাজি কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক হচ্ছে— এমন নয়। নির্বাচনের অনেক আগ থেকেই একটি চক্র সক্রিয়ভাবে চাঁদা আদায় শুরু করেছে।” তিনি অভিযোগ করেন, এই চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়েছেন।
এনসিপির এই নেতা বলেন, “ব্যবসায়ীরা চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। না দিলে হুমকি, হামলা এমনকি প্রাণনাশের ঘটনাও ঘটছে। পুরো দেশকে কার্যত চাঁদাবাজদের একটি বলয়ের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ‘‘চাঁদাবাজির এই সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে তা শুধু নির্বাচন নয়, দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।’’ এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এনসিপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে আগে চাঁদাবাজি ও সহিংসতার রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। না হলে সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীরা আরও বড় সংকটে পড়বেন বলে সতর্ক করেন দলটির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক।’’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘‘নির্বাচনের সময় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের ঘটনা নতুন নয়। তবে গণঅভ্যুত্থানের পরও এ ধরনের অনৈতিক কার্যক্রম চলমান থাকা সত্যিই অপ্রত্যাশিত।’’
তিনি বলেন, ‘‘একদিকে কিছু ব্যবসায়ী অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আশায় স্বেচ্ছায় অর্থ দিচ্ছেন, অপরদিকে অনেকের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করা হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সুশাসনের পরিপন্থী।’’