কুমিল্লা সদর উপজেলার কালীরবাজার ইউনিয়নের অলিপুর গ্রামে মঙ্গলবার রাতে প্রবেশ করতেই ভিন্ন এক আবহ চোখে পড়লো। পুরো গ্রামই শোকে স্তব্ধ। মানুষের মুখে প্রিয়জন হারানোর ছাপ স্পষ্ট।
কারণ, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত র্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া এই গ্রামেরই বাসিন্দা। বিনয়ী আর ভদ্র হিসেবে পরিচিত বিজিবি’র এই কর্মকর্তাকে এলাকার মানুষ বেশ পছন্দ করতেন, ভালোবাসতেন।
এ জন্যই তার এমন মৃত্যুতে কাঁদছে পুরো গ্রাম। মঙ্গলবার রাতে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কালীবাজার অলিপুর নূরে মদিনা হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা মাঠে মরহুমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে নিজ বাড়ির সামনে মসজিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেনের জানাজায় কুমিল্লা জেলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পক্ষে ৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন, র্যাব-১১ এর সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাজ্জাদ হোসেন, র্যাব-৭ এর সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান, কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান, র্যাব-১১ সিপিসি-২ এর কোম্পানি অধিনায়ক সাদমান ইবনে আলমসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
মোতালেব হোসেন অলিপুর গ্রামের প্রয়াত আবদুল খালেক ভুঁইয়ার ছেলে। আট ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। মোতালেব এক ছেলে ও দুই মেয়ের বাবা। রাজধানীর পিলখানা এলাকায় থাকতেন তার স্ত্রী ও সন্তানরা। মোতালেব হোসেনের বাড়ির কাছাকাছি যেতেই দূর থেকে স্বজনদের কান্নার শব্দ কানে ভেসে আসছিল। বাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করে চোখে পড়লো স্বজনদের ভিড়। মোতালেবের ভাইবোন ও স্বজনরা তার জন্য বিলাপ করছেন।
সরজমিন দেখা যায়, মোতালেব হোসেনদের আট ভাইয়ের বাড়ি পাশাপাশি লাগোয়া। মোতালেব নিজ বাড়িতে একতলা একটি ভবন নির্মাণ করছিলেন। যেটির কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। নির্মাণাধীন একতলা ভবনের পাশে রয়েছে একটি টিনের ঘর। সেই ঘরের সামনে বসে স্বজনেরা অপেক্ষা করছিলেন মোতালেবের নিথর দেহের জন্য। বাড়ির এক কোণে দাঁড়িয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলছিলেন সাইফুল ইসলাম। একই গ্রামের বাসিন্দা সাইফুল সম্পর্কে মোতালেবের ভাগ্নে। বড় বোনের ছেলে হলেও তারা দুজনই বাল্যবন্ধু। একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৯৩ সালে দুজনে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না আমার মামা মোতালেব আর নেই। মামার সঙ্গে কতো স্মৃতি। একসঙ্গে পড়ালেখা, বেড়ে ওঠা। বাড়িতে এলে সবার আগে আমার সঙ্গে দেখা করতো। গত প্রায় ১৫ দিন আগে একদিন রাতে হঠাৎ কল দিয়ে বাড়িতে আসতে বললেন। আসামাত্রই অনেকগুলো মাছ দিয়ে বাড়িতে নিয়ে যেতে বললো। এটাই ছিল আমাদের শেষ দেখা।
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা মোতালেবের আরেক ভাগ্নে আবুল খায়েরও তার বাল্যবন্ধু। তিনি বলেন, মোতালেব মামা, আমি আর সাইফুল ছোটবেলার খেলার সাথী। তিনি অনেক ভালো মানুষ। সব সময় চেষ্টা করেছেন সততার সঙ্গে জীবনযাপন করার। তার এমন মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। পরিবারের সদস্যরা জানান, মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে মোতালেবের লাশ পতেঙ্গায় র্যাব-৭ এর কার্যালয়ে আনা হয়। এর আগেই মরদেহ গ্রহণ করে কুমিল্লার বাড়িতে আনার জন্য মোতালেবের স্ত্রী শামসুন্নাহার, ছেলে মেহেদী হাসান, বড় মেয়ে শামিমা জান্নাত ও ছোট মেয়ে সিদরাতুল মুনতাহা এবং মোতালেবের দুই ভাইসহ কয়েকজন আত্মীয় পৌঁছান র্যাব কার্যালয়ে। সেখানে জানাজার পর বিকালে মোতালেবের মরদেহ নিয়ে স্বজনেরা গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করেন। রাত নয়টার দিকে স্থানীয় অলিপুর ভূঁইয়াপাড়া ঈদগাহে জানাজা শেষে তাকে বাড়ির সামনের মসজিদ-সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার ভাই মো. মনির হোসেন অপেক্ষা করছেন ছোট ভাইকে শেষবিদায় জানানোর জন্য। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সর্বশেষ গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে বাড়িতে এসেছিলেন মোতালেব। মাত্র দেড় ঘণ্টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রওনা দেন চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। এটাই ছিল ভাইকে শেষবার দেখা। আমার আট ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই আগেই মারা গেছেন, আজকে হারালাম ছোট ভাইকে। ভাইয়ের এই মৃত্যু কীভাবে মেনে নেবো? ১১ ভাইবোনের মধ্যে ১০ম মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার বোন আঞ্জুমান আরা বেগম (মুন্নি)। তিনি ভাইয়ের জন্য বিলাপ করছিলেন বাড়ির আঙিনায়। বিলাপ করতে করতে আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, আমার ভাইটা শেষ হয়ে গেল। আমার তো একটাই ছোট ভাই-এখন আমি কাকে স্নেহ করবো। আপা বলে আর কেউ ডাকবে না আমায়। আমার ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা কাকে বাবা ডাকবে। তার পুরো পরিবারটাই শেষ হয়ে গেল। আমি ওই সন্ত্রাসী, খুনিদের বিচার চাই।
গত সোমবার সন্ধ্যায় র্যাবের একটি দল সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলার মুখে পড়ে। হামলায় মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। আহত হন র্যাবের আরও তিন সদস্য। পরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল গিয়ে র্যাব সদস্যদের উদ্ধার করে নিয়ে আসে। আহত তিনজন চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।