জামায়াতকর্মীরা চরমোনাই পীরের কর্মীদের সঙ্গে করছে বাকযুদ্ধ, নীরবে কাজ করে যাচ্ছে বিএনপিÑ এমন শিরোনামে দেশের একটি জাতীয় পত্রিকার ডিজাইন সংবলিত একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয় সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
রেশমি রুমাল নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে কার্ডটি শেয়ার করা হয়। সেখানে দেখা যায়, আড়াইশ’ রিঅ্যাকশন ও ৮২টি মন্তব্যও পড়ে। ওই পোস্টে আবার বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নামের আরেকটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মন্তব্যে বলা হয়- দুটাই শিক্ষিত মূর্খ দল। ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকের লোগো দিয়ে ফটোকার্ড ডিজাইনের আদলে ফটোকার্ড তৈরি করে ভুয়া এই দাবিটি প্রচার করা হয়েছে বলে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করেছে।
কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপি’র প্রার্থী ছিলেন মঞ্জুর রহমান নামে-বেনামে বিভিন্ন গণমাধ্যমের লোগো দিয়ে ফটোকার্ড তৈরি করে ছড়িয়ে দেয়া হয়। বলা হয়, ঋণখেলাপির তথ্য গোপন রাখার অভিযোগে কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাতিল করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত ১৭ই জানুয়ারি বিকালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আপিল শুনানিতে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এরপর গত ১৯শে জানুয়ারি মঞ্জুরুল আহসান উক্ত সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। এরই প্রেক্ষিতে, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন বৈধ- হাইকোর্ট শীর্ষক দাবিতে একটি তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, হাইকোর্ট বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেননি বরং, তার রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট।
ঘনিয়ে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ। প্রতীক বরাদ্দের পর আজ থেকেই শুরু হচ্ছে প্রচার-প্রচারণা। সেইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৎপরতা চালাচ্ছে একটি মহল। তারা বিভিন্ন প্রার্থী ও দলের গুজব, অপপ্রচার ও ভুয়া তথ্য দিয়ে কন্টেন্ট তৈরি করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে করে ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) যুগে গুজব আর অপতথ্যে ভরপুর সোশ্যাল মিডিয়া। প্রতিনিয়ত ছড়ানো হচ্ছে গুজব।
সূত্রগুলো বলছে, বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ভুয়া নামে-বেনামে তৈরি করা ফেসবুক পেজ থেকে বিভিন্ন গুজব আর অপতথ্য ছড়িয়ে দেয়া হয়। যা হাজার হাজার শেয়ারও হয়। সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকায় এবং সঠিকভাবে তথ্য যাচাই না করার ফলে এসব গুজব রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, গুজব ছড়িয়ে এক পক্ষ আলাদা একটি বয়ান তৈরি করার চেষ্টা করে। যা মানুষের মনে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তির বিষয়ে আলাদা একটি ধারণা তৈরি করে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমও এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও, কিংবা অনেক আগে প্রচারিত কোনো ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুঞ্জন ও অপতথ্যের প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এটি নির্বাচনে সহিংসতাও বাড়িয়ে দিতে পারে।
জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার মন্তব্যের ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা শনাক্ত করেছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ফ্যাক্টচেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম বাংলাফ্যাক্ট। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ সালে হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’- এমন মন্তব্য করেছেন দাবি করে প্রথম সারির একটি জাতীয় দৈনিকের লোগোসহ একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। অনুসন্ধান টিমের যাচাইয়ে জানা যায় তা ভুয়া। চট্টগ্রামে ভারতীয় কূটনৈতিক কার্যালয়ে হামলার গুজব ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য, দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বিশ্লেষণে তা প্রমাণিত হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরে অগ্নিসংযোগের দৃশ্য দাবিতে একটি ছবি সামাজিক মাধ্যম এক্সে প্রচার করা হয়। ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো অনুসন্ধান করে জানায়, প্রচারিত ছবিটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়। প্রকৃতপক্ষে, ২০২২ সালের ১৫ই জুলাই নড়াইলের লোহাগড়ার দিঘলিয়া গ্রামের সাহাপাড়ায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকটি বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ধারণকৃত ছবিকে সাম্প্রতিক সময়ে উক্ত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।
ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানারের পরিসংখ্যান বলছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০৯টি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। সবমিলিয়ে এক বছরে রাজনীতি বিষয়ে ২ হাজার ২৮১টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে, যা অন্য সব ক্যাটাগরি থেকে বেশি। এই তথ্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে রাজনৈতিক ইস্যুই ছিল গত বছর ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রধান ক্ষেত্র। ক্যাটাগরি হিসেবে একক মাসে ভুল তথ্য বেশি শনাক্ত হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই (ডিসেম্বরে ৪৪৬টি)।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছর এআই-ডিপফেকের ব্যবহার বেড়েছে ৪০৯ শতাংশ। আর নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে অপতথ্যের প্রবাহ। গত বছরের অক্টোবর থেকে রাজনৈতিক অপতথ্য জ্যামিতিক হারে বাড়তে দেখা গেছে।
খোদ নির্বাচন কমিশন বলছে- গুজব ও অপতথ্য ঠেকানো অসম্ভব। তবে গুজব কিংবা ভুয়া ফটোকার্ডের বিপক্ষে অবস্থান রয়েছে কমিশনের। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, সাইবার সিকিউরিটি ফোর্সগুলো ফাংশনিং। দেশের যে সকল সাইবার সিকিউরিটি স্ট্রাকচার আছে সেগুলোকে নির্বাচন কমিশন ব্যবহার করছে। তারা বিশেষভাবে এখন নির্বাচনের দিকে ফোকাস করছে। নির্বাচন কমিশনও একটি সাইবার সিকিউরিটি সেল তৈরি করেছে। সেটি এখন সমন্বয়ের কাজ করছে, যোগাযোগের কাজ করছে। আর এই সকল সেলগুলো বিভিন্ন বাহিনীর অধীনে কাজ করছে। অতীতে অপতথ্য নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। অপতথ্য ঠেকানো যায় না। বরং এটার বিস্তার ঠেকাতে পারা যাবে। সেটাই আমরা করে যাচ্ছি। যাদেরকে চিহ্নিত করা যাবে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা যাবে।
গুজবের ভিড়ে অনেকে সত্য ভিডিওকেও অবিশ্বাস করছেন। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে অপতথ্য ও সাইবার মাধ্যমে ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে শুরু থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেইসঙ্গে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন নেয়া। কেননা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বিশেষ করে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটক, ইমো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের সমঝোতা চুক্তি না থাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে না বাংলাদেশের সাইবার পুলিশ। ডিএমপি’র সিটিটিসির সাইবার ইউনিট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকার আসনগুলো থেকে যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের তথ্য সংগ্রহ করে সাইবার মাধ্যমে গুজবের শিকার হতে পারেন এমন প্রার্থীদের তালিকা করা হচ্ছে। এ ছাড়াও দেশের বাইরে থেকেও অনেকে সামাজিকমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দেন। বিভিন্ন নামে-বেনামে খোলা গ্রুপ ও পেজ থেকেও গুজব ছড়ানো হয়। এ ধরনের শতাধিক পেজ ও গ্রুপ সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে।
এএফপি’র ফ্যাক্টচেক এডিটর কদরুদ্দিন শিশির মানবজমিনকে বলেন, গুজব কিংবা অপতথ্য ছড়ানোর বিষয়টি অলরেডি এলার্মিং হয়েই গেছে। ফেক নিউজ, মিসইনফরমেশন প্রতিনিয়ত মিডিয়া এবং মিডিয়ার বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। একদল আরেক দলের বিরুদ্ধে ছড়াচ্ছে, এক রাজনৈতিক নেতা আরেক রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে ছড়াচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিডিয়া সেগুলোতে ইনভল্ভ হচ্ছে। এআই জেনারেটেড ছবির প্রসার ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে গেছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে তত আরও বাড়বে। এটি কতোটা খারাপ হতে পারে সেটি আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। এসবের প্রভাব নির্বাচনের ওপর যাতে না পড়ে এর জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
বাংলাদেশি ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্ট ওয়াচের রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর ও ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক জুলকার নায়েন মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচনের সময় ফটোকার্ড ও এআই জেনারেটেড ছবি অনেক সংকট তৈরি করবে। সবচেয়ে বেশি সংকট তৈরি করবে এআই জেনারেটেড অডিও। নির্বাচনের সময় যখন প্রার্থীরা তাদের প্রচারণা করবে তখন অডিও বা ভিডিও সংকটে ফেলে দিতে পারে প্রার্থীদের। আরও ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে, স্যাটায়ার পেজগুলো প্রার্থীদের মতামতকে বিকৃত করে ছড়িয়ে দিয়েও প্রার্থীদের আক্রমণ করা হবে। সবচেয়ে বেশি ভয়ের কারণ হচ্ছে, নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সেক্সুয়াল হ্যারেজমেন্ট থেকে শুরু করে তাদের ছবি-ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটবে, যা আগেও হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বির আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, গুজব, ভুয়া ফটোকার্ড কিংবা এআই এখন বড় ধরনের সংকট। অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্কে ভালোমতো জানেন না। সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন তথ্যে বিভ্রান্ত হতে পারে যা তাদের সহিংসতার দিকে নিয়ে যায়। এসব নির্বাচনী পরিবেশের ওপর অনেক প্রভাব ফেলবে। এগুলো হচ্ছে এবং আরো হবে। এটা থেকে পরিত্রাণ পেতে না পারলে যেকোনো সময় নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন মানবজমিনকে জানান, নির্বাচনকে ঘিরে সাইবার পুলিশ সেক্টরে চব্বিশ ঘণ্টা অনলাইনে বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটিজ মনিটর করার জন্য টিম রয়েছে। যেসব জেনুইনলি গুজব, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী সেগুলো আইডেন্টিফাই করে আমরা রিমুভ করানোর ব্যবস্থা করবো।