Image description

প্রতীক বরাদ্দ পেয়ে আজ থেকে ভোটযুদ্ধে নামছেন প্রার্থীরা। গতকাল সারা দেশে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে প্রার্থীদের জন্য প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রতীক পেয়ে তারা শুরু করেন প্রচারের প্রস্তুতি। রাত বারোটার পর থেকেই দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচার কার্যক্রম শুরু হয়ে যায় অনলাইনে।

আজ সকাল থেকে তারা আনুষ্ঠানিক প্রচারে নামবেন। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতে গতকাল রাতেই সিলেট পৌঁছেন। মাজার জিয়ারত ও দলীয় সভার মাধ্যমে সিলেট থেকে তিনি দলের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন। একই দিন সাতটি নির্বাচনী জনসভায় তিনি বক্তব্য রাখবেন। জামায়াত আমীর তার দলের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন রাজধানী থেকে। একই দিন তিনি উত্তরাঞ্চলের ৫ টি জেলায় নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেবেন।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি (জাপা), জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ২৯৮টি সংসদীয় আসনে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ১ হাজার ৯৭২ জন। সীমানা জটিলতার কারণে পিছিয়ে থাকা পাবনার দু’টি আসনে এখনো প্রার্থী চূড়ান্তের প্রক্রিয়া চলছে। পাবনা-১ আসনে সাতটি এবং পাবনা-২ আসনে পাঁচটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে।

নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় কী করা যাবে, আর কী করা যাবে না-সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে আচরণবিধিতে। প্রথমবারের মতো পোস্টার ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপচনশীল দ্রব্য দিয়ে ব্যানার, লিফলেট ও ফেস্টুন তৈরি করা যাবে না। পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ও ব্যানারে নিজের প্রতীক ও ছবি ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহার করা যাবে না। তবে কোনো প্রার্থী নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল থেকে মনোনীত হলে তিনি তার বর্তমান দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহার করতে পারবেন, যা অবশ্যই পোর্ট্রেট আকারের হতে হবে। এবার প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট কিংবা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কেউ প্রচার চালাতে পারবেন। তবে শর্ত হলো- প্রচারণা শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইলসহ শনাক্তকরণ তথ্য রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হবে। অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা যাবে না।  

এ ছাড়া ভোটের স্বার্থে ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচন সংক্রান্ত যেকোনো কনটেন্ট প্রকাশ বা শেয়ারের আগে তার সত্যতা যাচাই করতে হবে। ভোটারদের বিভ্রান্ত করা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্রহনন বা সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল বা মানহানিকর তথ্য তৈরি, প্রকাশ বা প্রচার করা নিষিদ্ধ। এছাড়া, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশে জনসভা বা প্রচারণা; সংসদীয় আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার; নির্বাচনের দিন ও প্রচারকালীন সময়ে ড্রোন ব্যবহার করা যাবে না। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন/তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা কোনো প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে যত অভিযোগ: এদিকে, এখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকা নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। যার মধ্যে রয়েছে- বিএনপি, জামায়াত, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এনসিপি, জাতীয় পার্টিও। বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা ইউসুফ আশরাফ বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকার অভিযোগ দিয়েছি। কিছু দলের প্রার্থীরা আচরণবিধি ভঙ্গ করলেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এ থেকে বোঝা যায় নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই।

এছাড়া, দলটির অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির কারণে সুষ্ঠু নির্বাচন হুমকির মুখে। চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্তি দিয়ে মাঠে সক্রিয় করা হচ্ছে। দলটির প্রার্থী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে হামলা, হুমকি এবং সন্ত্রাসী তৎপরতা চলছে।

একইদিনে ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক গ্রহণ করে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের অভিযোগ করেন, সন্ত্রাসীরা আমাদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এখনো পক্ষপাতমূলক আচরণ হচ্ছে। লেভেল-প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয়নি, তারা বিশেষ একটি দলের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। ইসি’র কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপিও। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম গত রোববার সিইসি’র সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বলেন, বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় রিটার্নিং অফিসার, পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা একটি দলের পক্ষে ন্যক্কারজনকভাবে কাজ করছে বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। ইসি’র কয়েকজন কর্মকর্তাও একটি দলের পক্ষে কাজ করছেন বলেও অভিযোগ পেয়েছি। তিনি আরও বলেন, জামায়াতের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডি’র কপি, বিকাশ নম্বর, মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করছেন, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ, ক্রিমিনাল অফেন্স, এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ইসিকে আহ্বান জানিয়েছি।

এদিকে ঢাকার ১৫টি আসনের প্রার্থীরাও বুধবার সেগুনবাগিচায় রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রতীক নিতে এসে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। ভোটের পরিবেশ নিয়ে ঢাকা-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ জয়নাল আবেদিন বলেন, গতকাল মিরপুরের পর চৌদ্দগ্রামে যে ঘটনা ঘটেছে, এ ধরনের ঘটনা যদি আরও ঘটতে থাকে, তাহলে নির্বাচনের জন্য যে পরিবেশ প্রয়োজন, জনগণ ও ভোটাররা যে পরিবেশ প্রত্যাশা করে, তা নিশ্চিত হবে না। তিনি বলেন, একটি উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমাদের প্রধান উপদেষ্টা বারবার বলে আসছেন, সবাই নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন। আমরা সেটার বাস্তবায়ন দেখতে চাই।  

ঢাকা-৬ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী আবদুল মান্নান বলেন, যেভাবে নির্বাচন অফিসগুলো পরিচালিত হচ্ছে, তাতে ব্যালটসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নির্বাচনী উপকরণের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এতে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা আছে।
মনোনয়ন ফিরে পেয়ে ঢাকা ১৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন রনি বলেন, সারা বাংলাদেশের চিত্র বলা হলে, যারা জনগণের হয়ে প্রার্থিতা করতে এসেছেন তাদের দৃশ্যপট বলা হলে বলবো এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। শুধুমাত্র একটি বিশেষ দলের প্রার্থী হওয়ায় ১৫শ/১৭শ’ কোটি টাকার ঋণখেলাপি থাকা সত্ত্বেও তাদের মনোনয়ন বৈধ হচ্ছে। তাদের প্রার্থিতা বৈধ হলে যারা মানুষের হয়ে কথা বলতে চায় প্রশাসনিক আইন দেখিয়ে তাদের মনোনয়ন অবৈধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা যা দেখছি, মনে হচ্ছে হয়তো জুলুমবাজরা ফ্যাসিস্টদের সহযোগিতা নিয়ে তারা হয়তো জুলুম করার চেষ্টা করবে। 

ঢাকা-১২ আসনের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হক বলেন, আমি লক্ষ্য করেছি, বেশ কিছু অঞ্চলে ভোটারদের হুমকি চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে আমি দু-একটা থানায় অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছি। এত বড় একটি জাতীয় নির্বাচন, কিন্তু সরকার অধিকাংশ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি। কিন্তু সরকারের উচিত ছিল বহু আগেই অবৈধ অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে সেগুলো সরকারে আয়ত্তে নেয়া। ওসমান হাদি হত্যা এবং বিভিন্ন প্রার্থীকে হামলার পর তাতে ভোটার এবং প্রার্থীদের মাঝে একটি উদ্বেগ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ওদিকে, আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে আশঙ্কা নেই  বলে জানিয়েছে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নির্বাচনী পরিবেশ যাতে ঠিক থাকে সে বিষয়ে আমরা চেষ্টা করবো। আমরা আশাবাদী আমরা পারবো। বেশির ভাগ প্রার্থী আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আমরা তাদের আশ্বস্ত করেছি। নির্বাচন কমিশন এবং সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, তারা আমাদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে আশঙ্কা নেই।  

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকা, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দলগুলোর অভিযোগ সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়তে থাকবে। তিনি বলেন, আচরণবিধি ভঙ্গ করলেই আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে, মাঠটাকে সমান রাখা দরকার। 

২৯৮টি আসনে প্রার্থী ১৯৭২ জন

এদিকে ইসি’র সর্বশেষ হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, ৩০৫ জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় ২৯৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী দাঁড়িয়েছে ১৯৭২ জন। এবার নির্ধারিত সময়ে ৩০০ সংসদীয় আসনে ২৫৮০ মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। ৩০শে ডিসেম্বর থেকে ৪ঠা জানুয়ারি বাছাইয়ে ৭২৫ জনের মনোনয়নপত্র বাতিলের পর বৈধ প্রার্থী ছিলেন ১৮৫৫ জন। রিটার্নিং অফিসারদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৬৪৫ জন আপিল করেন। আপিল শুনানি শেষে প্রার্থিতা ফিরে পান ৪৩১ জন; সোমবার পর্যন্ত মোট বৈধ প্রার্থী দাঁড়ায় ২২৯৪ জন। তবে, সীমানা জটিলতার কারণে পিছিয়ে থাকা পাবনার দুটি আসনে এখনো প্রার্থী চূড়ান্তের প্রক্রিয়া চলছে। পাবনা-১ আসনে সাতটি এবং পাবনা-২ আসনে পাঁচটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। এ দুই আসনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৬শে জানুয়ারি, আর প্রতীক বরাদ্দ হবে ২৭শে জানুয়ারি। ভোট হবে ১২ই ফেব্রুয়ারি। 

শুরু হলো পোস্টাল ব্যালটে ভোটদান

প্রার্থীকে প্রতীক বরাদ্দ দেয়ার মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটদান। ২৫শে জানুয়ারির মধ্যে ভোট দিয়ে প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট পোস্ট অফিসে দিতে হবে। এবার, ভোট দিতে নিবন্ধন করেছে ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন প্রবাসী। এ বিষয়ে বুধবার ইসি এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে, আগামী ২৫শে জানুয়ারির মধ্যে পোস্টাল ব্যালট পোস্ট করা না হলে নির্ধারিত সময়ে রিটার্নিং অফিসারের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হবে। এজন্য প্রবাসী ভোটারদের আগামী ২৫শে জানুয়ারির মধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোটদান কার্যক্রম সম্পন্ন করে নিকটস্থ পোস্ট অফিসে পাঠাতে হবে।