জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ ও মানবিক রাষ্ট্র; যেখানে বিভাজনের বদলে ঐক্য, আশা ও প্রাপ্তি হবে রাজনীতির ভিত্তি। মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে জামায়াতের পলিসি সামিট ২০২৬ অনুষ্ঠানে নির্বাচনের আগে ‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে এসব কথা বলেন তিনি। সামিটে দেশের বিশিষ্ট রাষ্ট্রচিন্তক, অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, ৩০টিরও বেশি দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, নারী, ছাত্র, জুলাই যোদ্ধা, পেশাজীবী ও জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যম ব্যক্তিরা অংশ নেন। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ৬টি সেশনে প্রোগ্রাম চলে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশ্বাস করে, যেখানে আধুনিক বাজার অর্থনীতি কার্যকর থাকবে, প্রশাসন হবে জবাবদিহিমূলক এবং ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক সমান সুযোগ পাবে। তার ভাষায়, ন্যায় ও নৈতিকতার ভিত্তি ছাড়া কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না।
সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীতে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য।
বর্তমানে দলের মোট সদস্যের প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী। বাংলাদেশের ভবিষ্যতে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে সম্মেলনে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো শুধু ন্যায়ের প্রশ্ন নয়, এটি অর্থনৈতিক প্রয়োজনও। জনসংখ্যার অর্ধেককে পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত না করে কোনো দেশ টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না।
তরুণ প্রজন্মকে দেশের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, নতুন শাসনব্যবস্থায় যুব কর্মসংস্থান সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৬ থেকে ৮ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হবে। এছাড়া নারী, শিশু, কৃষক, শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের জন্য নানামুখী কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি জানান, নারীদের গর্ভাবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসা বিনামূল্যে দেওয়া হবে এবং নারীর জন্য উচ্চশিক্ষাও বিনা খরচে নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি ‘ফার্স্ট হান্ড্রেড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় প্রসূতি নারী ও মায়েদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। তিনি একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন, যেখানে স্বচ্ছ বাজার অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা হবে। শিল্পায়নে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ যেন কোনোভাবেই ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী কঠোর অবস্থান নেবে। ‘দুর্নীতি, লুটপাট ও স্বজনপ্রীতি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তিনি কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষাকে কেবল রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং ধর্মীয় কর্তব্য হিসাবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, জাতি, ধর্ম বা লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে তার দল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শফিকুর রহমান বলেন, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। অর্থনৈতিক সাফল্য এমন হওয়া উচিত, যাতে মানুষ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিকল্পনা করতে পারে, মর্যাদার সঙ্গে পরিবার পরিচালনা করতে পারে এবং সমাজে অর্থবহ অংশ নিতে পারে।
শফিকুর রহমান বলেন, দেশের বাইরে কর্মরত লাখো প্রবাসী শ্রমিক তাদের শ্রম ও ত্যাগের মাধ্যমে গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দিচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের অনেকেই দেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, নতুন প্রজন্মকে পরামর্শ দেওয়া ও সংস্কারে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তানসহ ৩০ দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন। সামিটে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, আ ন ম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের, ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন, ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাসেম আরমানসহ দলের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, জামায়াতের মহিলা বিভাগের প্রধান নুরুন্নাহার সিদ্দিকা, মারজিয়া মমতাজ প্রমুখ অংশ নেন।
জামায়াতের পলিসি সামিটের অন্যান্য প্রসঙ্গ : ৬টি সেশনে বিভক্ত দিনব্যাপী এই সামিটে দেশের বিশিষ্টজনদের আলোচনার মাধ্যমে আরও যেসব বিষয় উঠে আসে তার মধ্যে রয়েছে-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। ট্যাক্স ও ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে ট্যাক্স ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট ১০ শতাংশে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু (এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা এক কার্ডে)। আগামী ৩ বছর সব শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ বাড়ানো হবে না। বন্ধ কলকারখানা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে চালু এবং ১০ শতাংশ মালিকানা শ্রমিকদের প্রদান। কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ সুবিধা। গ্র্যাজুয়েশন শেষে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সময়ে ৫ লাখ গ্র্যাজুয়েটকে সর্বোচ্চ ২ বছর মেয়াদি মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ প্রদান (কর্জে হাসানা)।
মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে ১ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ। বছরে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ। মেধাবী গরিবের সন্তানও যেন হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজে পড়তে পারেন, তেমন সুযোগ সৃষ্টি করা। ইডেন ও বদরুন্নেসা কলেজ একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথাও উঠে আসে সামিটে। ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক ও ৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান। ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা।
তরুণদের জন্য পরিকল্পনা : দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্টের জন্য নতুন মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করা। ৫ বছরে ১০ মিলিয়ন তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ। প্রতিটি উপজেলায় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ স্থাপন। প্রতিটি জেলায় ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে ৫ বছরে ৫ মিলিয়ন জব এক্সেস নিশ্চিত। নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে ৫ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি। ১.৫ মিলিয়ন ফ্রিল্যান্সার তৈরি। স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য উপযোগী স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করা।
আইসিটি ও ভিশন ২০৪০ : আইসিটি সেক্টর উন্নয়নে ‘ভিশন ২০৪০’ ঘোষণার কথা বলা হয়েছে সামিটে। ২০৩০ সালের মধ্যে ২ মিলিয়ন আইসিটি জব সৃষ্টি ও প্লেসমেন্ট। ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল রপ্তানির জন্য ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন। আইসিটি সেক্টর থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ। আইসিটি খাতে সরকারের ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় সাশ্রয়।
রেমিট্যান্স সংক্রান্ত : দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে ৫-৭ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় দুই থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি করা হবে। অর্থনৈতিক রেমিট্যান্সের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশি প্রফেশনাল, গবেষক, শিক্ষকদের দেশে নিয়ে আসা হবে ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ হিসাবে।