সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর যেন চট্টগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘সাম্রাজ্য’। যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কিংবা গণমাধ্যমকর্মী; কেউই নিরাপদ নন। এই এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপের হাতে। দখল-বেদখল, মাদক বাণিজ্যসহ নানা অপরাধের আখড়া হিসাবে পরিচিত ‘ছিন্নমূল’ নামের এই এলাকা। এখানে শত শত কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। এর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতেই গ্রুপগুলো এই এলাকাটিকে রীতিমতো ‘মিনি ক্যান্টনমেন্টে’ পরিণত করে রেখেছে। যেখানে তাদের শাসনই শেষ কথা।
৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি তথা টিলা পাহাড়-সমতলবেষ্টিত জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকাটিতে ১০টি সমাজের ৩০ হাজার পরিবারের বসবাস বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো সশস্ত্র অবস্থান করে। নিজেদের মধ্যে তো বটেই, প্রশাসনের কেউ গেলেও তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সোমবার র্যাব-৭ এর অভিযান দলের ওপর হামলার ঘটনাটিও ঘটেছে একই কারণে। ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা রোকন গ্রুপের সদস্য মনে করে সাদা পোশাকের র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা করে।
ইয়াসিন বাহিনীর নৃশংস হামলায় র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভুঁইয়া নিহত হন। আহত হন আরও তিন সদস্য। নুরুল আলম মনা নামে র্যাবের এক সোর্সও ওই হামলায় গুরুতর আহত হন। অনুসন্ধানে জানা যায়, রোকন বাহিনীর লোক মনে করেই র্যাবের ওপর হামলা চালায় প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা।
এদিকে র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন হত্যার ঘটনায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি। কোনো গ্রেফতারও নেই। যদিও র্যাব মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান মঙ্গলবার চট্টগ্রাম ছুটে আসেন। পতেঙ্গায় র্যাব-৭ এর সদর দপ্তরে নিহত মোতালেব হোসেনের জানাজায় অংশ নেন। তিনি জঙ্গল সলিমপুর এলাকার সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। সন্ত্রাসীদের নির্মূলে শিগগিরই কম্বিং অপারেশন চালানো হবে বলেও জানান।
মঙ্গলবার দুপুরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক। বিরাজ করছে থমথমে পরিস্থিতি। তবে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি দেখা যায়নি। সোমবার র্যাবের অভিযান ও তাদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, র্যাবের সোর্স হলেও নুরুল আলম মনা চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (বর্তমানে বহিষ্কৃত) রোকন উদ্দিনের অনুসারী হিসাবে পরিচিত। সোমবার বিকালে র্যাবের টিম অভিযানে যায় জঙ্গল সলিমপুরে। তারা ইয়াসিন গ্রুপের সদস্য ছিন্নমূল নগর কমিটির সভাপতি নুরুল হক ভান্ডারি ও সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন ওরফে জামাই ইয়াসিনকে ধরতে গিয়েছিল। এই দুজন জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান ইয়াসিনের অনুসারী।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অভিযানে গিয়ে র্যাব সদস্যদের বহনকারী সাদা মাইক্রোবাস থেকে সেই মনা নামেন। তার পেছনে পেছনে নামেন অস্ত্র হাতে সাদা পোশাকের র্যাব সদস্যরা। কিন্তু ইয়াসিন বাহিনীর লোকজন মনাকে দেখেই রোকন বাহিনীর লোকজন ভেবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে র্যাবের চার সদস্য ও সোর্স মনাকে ঘিরে ফেলে তারা। এ সময় র্যাবের অন্য সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যান। আটকে রাখা সদস্যদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তাদের ব্যাপক মারধর করা হয়। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভুঁইয়া ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অপর তিনজন সদস্যকে এবং র্যাবের সোর্স মনাকেও ব্যাপক মারধর করা হয়।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, জঙ্গল সলিমপুরের এক কিলোমিটার ভেতরে বিএনপির একটি কার্যালয় নতুন করে সাজানো হয়েছে। তবে সামনে থাকা চেয়ারগুলো ভাঙা পড়ে আছে। ভেতরেও চেয়ার-টেবিলসহ সবকিছুই এলোমেলো পড়ে আছে। এই কার্যালয়ের সামনেই হামলার ঘটনাটি ঘটেছে। জানতে চাইলে ১০নং জঙ্গল সলিমপুর ইউনিয়নের ১নং সাংগঠনিক ওয়ার্ড বিএনপির প্রচার সম্পাদক মো. বাবুল সওদাগর বলেন, ‘সোমবার বিকালে ইয়াসিনের (জামাই ইয়াসিন) নেতৃত্বে বিএনপির এই কার্যালয়টি উদ্বোধনের কথা ছিল। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি এবং আশপাশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। এ উপলক্ষ্যে আমরা সবাই উচ্ছ্বসিত ছিলাম। দুপুরের পর থেকেই এখানে বিপুলসংখ্যক লোকজন জড়ো হয়। বিকাল সোয়া ৪টার দিকে যখন দুটি মাইক্রোবাস সলিমপুরে প্রবেশ করে তখনই হামলার ঘটনাটি ঘটে।’
তিনি আরও বলেন, প্রথমে মাইক্রোবাসে করে অনুষ্ঠানের মেহমানরা এসেছেন বলে ধারণা করে মাইকেও ঘোষণা দেওয়া হয় অনুষ্ঠানস্থল থেকে। আমি ফিতা কাটার জন্য কাঁচি নিয়ে গেটের সামনে যাই। তখন ইয়াছিন ভাইও গেটে উপস্থিত হয়েছিলেন। এ সময় গাড়িটি গেটের সামনে থামানোর সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে রোকন উদ্দিনের অনুসারী নুরুল আলম মনা বেরিয়ে ইয়াছিন ভাইকে দেখিয়ে দেয় এবং বেশ কয়েকজন পিস্তল নিয়ে কার্যালয়ের ভেতর ঢুকে যায়।’
বাবুল সওদাগর বলেন, ‘অস্ত্রধারীরা কার্যালয়ের ভেতর ঢুকেই কলাপসিবল গেট লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তখন পর্যন্ত তারা নিজেদের র্যাব সদস্য হিসাবে পরিচয় দেননি। একপর্যায়ে উপস্থিত লোকজন তাদের রোকন বাহিনীর সন্ত্রাসী মনে করে কার্যালয়ের ভেতর থেকে বাইরে এনে মারধর করে। কিন্তু যখন ওনারা নিজেদের র্যাব পরিচয় দিয়েছেন, তখন সাধারণ মানুষ পেছনে চলে যায়।’
তবে স্থানীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে ওই এলাকাটি ইয়াসিন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে সেখানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে প্রতিপক্ষ রোকন বাহিনী। নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা থেকেই মূলত ইয়াসিন বাহিনী র্যাবের ওপর নৃশংস এ হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। এখানে সাধারণ মানুষের আড়ালে বেশির ভাগই কোনো না কোনো বাহিনীর সদস্য হিসাবে কাজ করে।
সূত্র জানায়, সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে ৫টি মৌজায় প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি রয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামোতে জঙ্গল এই স্থানটির অবস্থান সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতায় হলেও ওই এলাকায় প্রবেশ করতে হয় নগরীর বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার লিংক রোড দিয়ে। কম টাকায় ‘জমি কিনে’ সেখানে বসতি স্থাপন করেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছিন্নমূল মানুষ। দেশের প্রায় সব জেলার মানুষই সেখানে রয়েছেন। যাদের অধিকাংশই নিম্নবিত্তের মানুষ। ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে এলাকাটির ভেতরে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, কেজি স্কুল, এতিমখানা, কবরস্থান, মন্দির, কেয়াং, গির্জা, শ্মশান, বাজার সবই করা হয়েছে। সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী ওই এলাকায় প্রায় ১৯ হাজার মানুষ বসবাস করেন। তবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সেখানে ১০টি সমাজের ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করছেন।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরে আবারও ‘স্থানীয় সন্ত্রাসী’দের তৎপরতা বেড়ে যায়। ২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর ভোরে জঙ্গল সলিমপুরের আলিনগর এলাকায় ইয়াছিন ও রোকন-গফুর বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। তখন গুলিবিদ্ধ হয়ে রোকন বাহিনীর এক সদস্য নিহত হন। আহত হন বেশ কয়েকজন। ৫ অক্টোবর এ ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে সাংবাদিকরা সেখানে গেলে দুজন স্থানীয়দের হামলার শিকার হন।
আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা র্যাব মহাপরিচালকের : মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার র্যাব-৭ এর সদর দপ্তরে মো. মোতালেব হোসেন ভুঁইয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তার বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। নিহত মোতালেবের স্ত্রী এবং এক ছেলে ও দুই মেয়ে র্যাব মহাপরিচালকের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তাদের সান্ত্বনা দেন। এরপর প্রেস ব্রিফিংয়ে র্যাব মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসী ও তাদের অবৈধ আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে র্যাবের প্রতিষ্ঠা থেকে এখন পর্যন্ত ৭৫ জন র্যাব সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। আমরা যে কোনো মূল্যে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। তিনি আরও বলেন, র্যাবের প্রতিটি অভিযানে ঝুঁকি থাকে। আমাদের সদস্যদের অধিকার ছিল নিজের আত্মরক্ষায় গুলি করা। কিন্তু তারা জানমালের ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কায় তা করেনি। তবে আমরা পুরো অভিযানটি তদন্ত করে দেখব, এখানে কোনো ভুলত্রুটি আছে কিনা। যদি ভুলত্রুটি থাকে, সেগুলো সংশোধন করে আগামীতে আমরা আরও সফলতার সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করব। যারা হামলা চালিয়েছে, তাদের কয়েকজনের নাম আমরা পেয়েছি। আমরা অবশ্যই তাদের গ্রেফতার করব।
এর আগে মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) মো. রাসেল সাংবাদিকদের বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অতিরিক্ত ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। পরে স্থানীয় জনতার কাছ থেকে আটক র্যাব সদস্যদের উদ্ধার করা হয়। এ সময় র্যাব সদস্যদের অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।’
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘এখনো মামলা হয়নি। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ ও বিভিন্ন ভিডিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
নিহত র্যাব কর্মকর্তার স্ত্রীর বুকফাটা কান্না : সীতাকুণ্ডে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত র্যাব-৭ এর ডিএডি মোতালেব হোসেনের স্ত্রী শামসুন্নাহারের বুকফাটা কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে পরিবেশ। মঙ্গলবার দুপুরে র্যাব-৭ এর সদর দপ্তর পতেঙ্গায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, আমার স্বামী খুবই দেশপ্রেমিক ছিলেন। পরিবারের চাইতে দেশকেই বেশি সময় দিতেন। দেশপ্রেমিক হওয়ার কারণেই কি তাকে এভাবে হত্যা করা হলো। তার ওপর অবিচার করা হলো। দেশপ্রেমিক মানুষকে এভাবে হত্যা করা হলে আর কেউ কি সৈনিকের চাকরি করবে? তিনি বলেন, আমার স্বামীর হাড়গোড় সবকিছু ভেঙে ফেলা হয়েছে। পুরো শরীরটাই বাঁকা হয়ে গেছে। পিঠে কোপ অথবা গুলির চিহ্ন ছিল। রক্ত ঝরছিল। তিনি স্বামী হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। হামলাকারী সন্ত্রাসীদের ফাঁসি দাবি করেন।
কুমিল্লায় দাফন, এলাকায় শোকের ছায়া : নিহত র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার লাশ কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে সদর উপজেলার কালিরবাজার ইউনিয়নের অলিপুর ভুঁইয়া পাড়া ইদগাহ মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। এতে র্যাব কর্মকর্তা, সহকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোকজন অংশ নেন। মোতালেবের মৃত্যুর খবর সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম থেকে গ্রামের বাড়িতে জানানো হলে পরিবারসহ এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।