Image description

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল ছলিমপুরে অভিযানের সময় এক র‌্যাব সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা ও তিনজনকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। তবে দুর্গম ওই এলাকায় প্রশাসনের ওপর হামলার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এছাড়া অভ্যন্তরীণ সংঘাতে গত দেড় বছরে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু র‌্যাব সদস্যদের অপহরণ করে তিন ঘণ্টা আটকে রেখে বিবস্ত্র করে পিটিয়ে হতাহতের মতো নৃশংস ঘটনা এটিই প্রথম। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার পরও পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি।

অভিযানে অংশ নেওয়া র‌্যাবের দুই সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে জানান, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন তার সহযোগীদের নিয়ে ছলিমপুরের বিএনপি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করছে- এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালায় র‌্যাব। সে সময় ইয়াছিনের সহযোগীরা মাইকে ঘোষণা দিয়ে চারপাশ থেকে তাদের ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে বিএনপি অফিসের মধ্যে আটকে রাখে চার র‌্যাব সদস্যকে। কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে বের করে পেটাতে পেটাতে সিএনজিতে তুলে তিন কিলোমিটার দুরে আলীনগরের ভেতরে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। সেখানে একটি ঘরে আটকে দফায় দফায় পিটিয়ে আহত করা হয় চারজনকে। তাদের মধ্যে র‌্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক আব্দুল মোতালেব যারা যান।

এদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, জঙ্গল ছলিমপুরে তাদের কোনো কার্যালয় নেই। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. কমল কদর জানান, গত দেড় বছরে তিনি কিংবা বিএনপির পদধারী কোনো নেতা ছলিমপুরে যাননি কিংবা দলীয় কোনো কর্মসূচি সেখানে পালিত হয়নি। ন্যক্কারজনক এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে বিএনপির দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।

গত মঙ্গলবার সকালে সরেজমিন গেলে স্থানীয়রা জানান, স্থাপনাটিতে আগে আওয়ামী লীগের অফিস ছিল। তখন মশিউর ও গফুর মেম্বার নামে দুই সন্ত্রাসী কার্যালয়টি পরিচালনা করত। ৫ আগস্টের পর তারা পালিয়ে গেলে উত্তর জেলা যুবদলের বহিষ্কৃত যুগ্ম সম্পাদক রোকন উদ্দিন মেম্বার কার্যালয়টি দখল করে বিএনপি কার্যালয়ের সাইনবোর্ড ঝোলান। কিন্তু পার্শ্ববর্তী আলীনগরের অধিপতি হিসেবে পরিচিত আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন জঙ্গল ছলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করলে দুপক্ষের মধ্যে ছোট-বড় একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

গত বছরের ৩১ আগস্ট সকালে ছলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী। সে সময় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ রোকন মেম্বারের অনুসারী চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব নিয়ে গত ৪ অক্টোবর দুপক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে রোকনের সমর্থক দুজন নিহত হন। এর জের ধরে রোকনকে বহিষ্কার করে যুবদল। পেশিশক্তিতে পেরে না উঠে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন রোকন মেম্বার। তখন থেকেই কার্যালয়টি জঙ্গল ছলিমপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন বাহিনী দখলে নেয়। গত সোমবার কার্যালয়টি উদ্বোধন করার ঘোষণা দেয় ইয়াছিন। ওই অনুষ্ঠানে রোকনের লোকজন হামলা চালালে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর কিছু সময় পরই সেখানে অভিযান চালায় র‌্যাব। চার সদস্যের একটি গ্রুপ সাদা পোশাকে বিএনপি অফিসের ভেতর ঢুকে পড়লে ঘিরে ফেলে ইয়াছিনের লোকজন। এ খবর পেয়ে র‌্যাবের আরেকটি গ্রুপ মাইক্রোবাসে করে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করলে তারাও হামলার স্বীকার হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

একপর্যায়ে বিএনপি অফিসে আটক চারজনকে সিএনজি অটোরিকশায় তুলে আলীনগর বাজারে নিয়ে একটি নির্মাণাধীন দোকানঘরে আটকে কয়েক দফা গণপিটুনি দিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। খবর পেয়ে ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা আহত র‌্যাব সদস্যদের উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে পাঠান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক র‌্যাবের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল মোতালেবকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত অন্য তিন র‌্যাব সদস্যের মধ্যে একজনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।

প্রশাসনের ওপর হামলা প্রথম নয়

জঙ্গল ছলিমপুরে অভিযানে গিয়ে হামলার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও দফায় দফায় হামলা চালানো হয় জেলা প্রশাসন, পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ একাধিক সরকারী কর্মকর্তার ওপর। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জঙ্গল ছলিমপুর ছিন্নমূল বরইতলা ২ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে হামলায় জেলা প্রশাসনের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং সীতাকুণ্ড থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। এর আগের বছর ২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি র‌্যাবের সঙ্গে জঙ্গল ছলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছিল। একই বছরের ২ আগস্ট অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে বাধা পথরোধ করা হয় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আলীনগরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে যায় জেলা প্রশাসন। সে সময় আলীনগরের সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর হামলা করে।

যেভাবে হলো সন্ত্রাসীদের আখড়া

সীতাকুণ্ড ও বায়েজিদের একাংশ নিয়ে গঠিত জঙ্গল ছলিমপুর এলাকা শহরের কাছে হলেও পাহাড়বেষ্টিত ও দুর্গম হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। প্রায় তিন হাজার একর সরকারি খাসজমি দখল করে গড়ে ওঠা বিশাল এ বসতিতে নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন শুরু করেন।

পরে আক্কাস র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে তার সহযোগী- কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের একপর্যায়ে ইয়াছিন আরো ভেতরে গিয়ে আলীনগর ও নবীনগর নামে নতুন আস্তানা গড়ে তোলে।

রাজনৈতিক মধ্যস্থতায় আলীনগর ও নবীনগরের নিয়ন্ত্রণ পায় ইয়াছিন আর জঙ্গল ছলিমপুরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে মশিউর ও গফুর। দুর্গম অবস্থানের কারণে এলাকাটি স্থানীয় ও নগরীর সন্ত্রাসীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়।

৫ আগস্টের পর মশিউর ও গফুর পালিয়ে গেলে রোকন মেম্বার জঙ্গল ছলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেন। তবে আলীনগর ও জঙ্গল ছলিমপুরের দখল নিয়ে ইয়াছিন ও রোকনের পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে গত ১৬ মাসে অন্তত পাঁচজন নিহত হন। পুলিশের ভাষ্য, সব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে পাহাড়ি এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির বলেন, প্রায় এক লাখ মানুষের বসবাস ও ভোটের রাজনীতির কারণে এলাকাটিতে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। প্রকাশ্যে না হলেও সন্ত্রাসীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়া পাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রশাসন একাট্টা হয়ে সন্ত্রাসীদের আন্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া উচিত।

যৌথ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল জানান, জঙ্গল ছলিমপুর ও আলীনগরে সন্ত্রাসীদের আখড়া ভাঙতে না পারলে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। এ কারণে র‌্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় শিগগির বড় ধরনের অভিযানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

র‌্যাবের মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান মঙ্গলবার দুপুরে বলেন, জঙ্গল ছলিমপুরে শিগগির যৌথবাহিনীর অভিযান শুরু হবে। এতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, এপিবিএন, পুলিশ, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থাকে যুক্ত করা হবে। বড় পরিসরে এ অভিযানের লক্ষ্যে হবে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার, সরকারি খাসজমি উদ্ধার ও র‌্যাব সদস্য আব্দুল মোতালেব হত্যার বিচার নিশ্চিত করা।