দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে মানুষের হাতে নগদ অর্থ—যা ‘ম্যাট্রেস মানি’ নামে পরিচিত—তার পরিমাণ প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন। তিনি বলেন, এই বিপুল অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে না আসায় অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি।
সেমিনারে মাসরুর আরেফিন বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি কোনও সাধারণ নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) সংকট নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত চিত্র আড়ালেই ছিল। তার ভাষ্য, “আমরা এতদিন এক ধরনের ‘ভ্রমের স্বর্গে’ বাস করেছি। ভাবতাম খেলাপি ঋণের হার ৯ শতাংশ। বাস্তবে তা ছিল প্রায় ৩৫ শতাংশ। এখন অন্তত সত্যটা সামনে এসেছে। আর সত্য জানা গেলে তবেই সামনে এগোনো সম্ভব।”
খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে এবিবি চেয়ারম্যান বলেন, “পুরোপুরি পচে যাওয়া ঋণ অবলোপন করে নতুন করে যাত্রা শুরু করাই যুক্তিযুক্ত। এতে শুরুতে কয়েক বছর মূলধনি চাপ বাড়তে পারে, তবে স্বচ্ছতা ও সততার সঙ্গে জনগণের সামনে এলে নতুন আয় সৃষ্টি হবে এবং রাজস্ব সংকটও অনেকাংশে কাটবে।”
তিনি জানান, কয়েকটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অত্যন্ত বেশি হওয়ায় সামগ্রিক গড় হার উঁচু দেখাচ্ছে। তবে বাস্তবে ১৫ থেকে ২০টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার চার শতাংশের নিচে রয়েছে। “এটি আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক দিক,” বলেন তিনি।
মাসরুর আরেফিনের মতে, খেলাপি ঋণ মূলত একটি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের সমস্যা। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়িয়ে ‘হ্যান্ডহোল্ডিং’ বা সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন করে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হওয়া মূলত দুর্বল তদারকি ও সুশাসনের ঘাটতির ফল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকার প্রশংসা করে এবিবি চেয়ারম্যান বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে সক্রিয়ভাবে তদারকি ও নজরদারি জোরদার করছে, যার ফলে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদও এখন অনেক বেশি সতর্ক। তার আশা, সম্পদের মান (অ্যাসেট কোয়ালিটি) আর খারাপ হবে না; বরং ধীরে ধীরে উন্নতি হবে।”
ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ঋণপ্রবৃদ্ধি কম থাকায় এটি পরিস্থিতির স্বাভাবিক পরিণতি। “খারাপ ব্যাংকগুলো বাদ দিলে গড় লিকুইডিটি কভারেজ রেশিও ১০০ শতাংশের ওপরে। বর্তমানে আমাদের সামগ্রিক তারল্য রয়েছে ১৫৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। সিটি ব্যাংকিংয়ের তারল্য ২১৬ শতাংশ—যা সত্যিই বিস্ময়কর,” বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে গ্রাহকদের মধ্যে ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কম। এর পেছনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি বড় কারণ ছিল। তবে এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতি ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে নেমে প্রায় ৮ শতাংশে এসেছে। যদিও খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ে এখনও উদ্বেগ রয়েছে।”
সরকারি ঋণ প্রসঙ্গে মাসরুর আরেফিন জানান, ঋণের চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা আমানত রাখার একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায় ছিল সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ। “এটি পুরোপুরি বৈধ ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। সরকারকেও তখন অর্থের প্রয়োজন ছিল,” বলেন তিনি।
তার মতে, এটি একটি সাময়িক পরিস্থিতি। নির্বাচনের পর অর্থনীতিতে আবার গতি ফিরবে। “আমার ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা বলছে—সবকিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসবে,” যোগ করেন তিনি।
ব্যাংক খাতে লুটপাট, অর্থপাচার, নির্দেশিত ও ভুয়া ঋণের কঠোর সমালোচনা করে এবিবি চেয়ারম্যান বলেন, “এসব অনুশীলন অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে সংকটের মধ্যেও ১০ থেকে ১৫টি ব্যাংক তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও আঞ্চলিক মানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।” এর মধ্যে দুই-তিনটি ব্যাংককে বৈশ্বিক মানের প্রতিষ্ঠান হিসেবেও বিবেচনা করা যায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি রেশিও থাকা প্রয়োজন হলেও বর্তমানে তা নেমে প্রায় ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা উদ্বেগজনক।” তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাস্তবমুখী ও ইতিবাচক কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।