বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এ ঘটনায় বিভিন্ন থানায় গত বছর বিভিন্ন সময়ে ২০টি পৃথক মামলা করেছেন নিহতদের স্বজনরা। তবে মামলা হওয়ার বিষয়টি কঠোরভাবে গোপন রাখা হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। নিহতদের মধ্যে তিনজন পরিদর্শক, এসআই ১২ জন, এএসআই ছয়জন, নায়েক একজন এবং কনস্টেবল ২২ জন রয়েছেন। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে এসব পুলিশ সদস্য মারা যান।
কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, রাজারবাগে আন্দোলনরত পুলিশ সদস্যদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ যেন না থাকে তার জন্যই মামলাগুলো রেকর্ড করা হয়। একই সঙ্গে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা পুলিশ নিহতের ঘটনায় নানা ধরনের অপপ্রচার এবং প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছিল, সে কারণে সঠিক এবং তথ্যগত প্রমাণ রাখার জন্যই মামলা হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নিহত পুলিশ সদস্যদের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। সে সময় প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এক বার্তায় বলা হয়- ‘আমরা লক্ষ করেছি যে, কিছু নিউজ আউটলেট এবং কিছু ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া গণ অভ্যুত্থানে নিহত পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা সম্পর্কে মিথ্যা ও ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে। নিহত পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রকৃত তালিকা পুলিশ সদর দপ্তর প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে যদি কেউ দাবি করেন, গণ অভ্যুত্থানে এ তালিকার বাইরেও পুলিশ নিহতের ঘটনা ঘটেছে, সে ক্ষেত্রে প্রমাণ সরবরাহের জন্য আহ্বান জানানো হয়। এদিকে গত ১৫ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদ ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ’ অনুমোদন করেছে। এতে করে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক প্রতিরোধের সময় সংঘটিত কার্যাবলির জন্য গণ অভ্যুত্থানকারীরা দায়মুক্তি পাবেন।
জানা গেছে, এ অধ্যাদেশের ফলে বিদ্যমান ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার হবে এবং নতুন মামলা করা যাবে না। তবে ব্যক্তিগত লোভ বা সংকীর্ণ স্বার্থে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড দায়মুক্তির বাইরে থাকবে। নিহতদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) কর্মরত ছিলেন ১৪ জন, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার ১৫ জন, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানার দুজন, কুমিল্লার তিতাস থানার দুজন, চাঁদপুরের কচুয়া থানার একজন, হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানার একজন, ঢাকার এসবির একজন, নারায়ণগঞ্জ পিবিআইয়ের একজন, ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দপ্তরের একজন, কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশের একজন, কসবা থানার একজন, খুলনা মহানগর পুলিশের একজন, গাজীপুর মহানগর পুলিশের একজন এবং ঢাকা জেলার দুজন। নিহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ২৫ জন থানার ভিতর ও সামনে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন। সবচেয়ে বেশি ২৪ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার দিন। এর আগের দিন ৪ আগস্ট মারা গেছেন ১৪ জন। কুমিল্লা তিতাসে নিহত এসআই রেজাউল ইসলামের ভাই ইব্রাহীম খলিল এ প্রতিবেদককে বলেন, আমার ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা দিতে গিয়েছিলাম, কিন্তু সে সময় মামলা হয়নি বলে জানিয়েছিল। পরে হয়েছে কি না জানি না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিতাসে এসআই রেজাউল এবং কনস্টেবল মাইনুদ্দিন লিটন নিহতের ঘটনায় গত বছরের জুনে মামলা করেন রেজাউলের স্ত্রী ফজিলত আক্তার রুনু। মামলা নম্বর-১৬(০৬)২৫।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় হামলা হয়, চারজন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এ ঘটনায় ওই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন নিহত কনস্টেবল আবদুল মজিদের স্ত্রী শাহজাদী বেগম। পুলিশ বলছে, মামলাটি তদন্তাধীন।
পুলিশ নিহতের ঘটনায় ৪৪টি মামলা হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, মামলা হওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তরা পূর্ব থানায় পুলিশ পরিদর্শক রাশেদুল ইসলাম, এসআই খগেন্দ্র চন্দ্র সরকার, কনস্টেবল শহিদুল আলম, আবু হাসনাত রনি এবং সুজন মিয়া নিহতের ঘটনায় ওই থানায় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মামলা করেন এসআই খগেন্দ্র চন্দ্রের স্ত্রী। মামলা নম্বর- ১১(৯)২৪। খিলগাঁও এবং যাত্রাবাড়ী থানায় পৃথক মামলা করেন পরিদর্শক মাসুদ পারভেজ ভূঁইয়া এবং নায়েক গিয়াস উদ্দিনের স্ত্রী।
ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের আগস্টে পুলিশের একজন বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন। মামলা নম্বর-৫(৮)২৪। ৫ আগস্ট নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানায় এসআই বাছির উদ্দিন এবং কনস্টেবল মোহাম্মদ ইব্রাহিম নিহতের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে।