‘ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবে কিনা, তা পুনর্বিবেচনা করা হবে,’ দলটির এ ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচন ঘিরে এনসিপির রাজনীতিতে আসলে কী হচ্ছে—তা নিয়েও এক ধরনের ধোঁয়াশা ও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানির শেষ দিনে (১৮ জানুয়ারি) এবং প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ১৯ জানুয়ারি সাক্ষাৎ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
তিনি অভিযোগ করেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব, ঋণখেলাপি এবং আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়ে ইসি সুস্পষ্টভাবে বিএনপির পক্ষাবলম্বন করছে। মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে নির্বাচনে থাকা না থাকা নিয়ে দল ও জোটগতভাবে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। আসিফের এ বক্তব্যকে হালকাভাবে দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ তিনি জুলাই আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলের একজন শীর্ষ নেতা। ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদেও।
এছাড়াও জামায়াতসহ ১০ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের দ্বিতীয় প্রধান শরিক দলের মুখপাত্র তিনি। স্বাভাবিকভাবে এক ধরনের আশঙ্কা থেকেই এমন জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েছে। কারণ এনসিপিসিসহ তার জোটভুক্ত দলগুলো নির্বাচন না করলে হয়তো ভিন্নরকম পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। যদিও বিষয়টিকে একেবারেই উড়িয়ে দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ-উর রহমান।
বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘এনসিপি নির্বাচন নিয়ে যে বক্তব্য রাখছে, তা হুমকি মনে হচ্ছে না। তারা যে জামায়াতেরই আদর্শে বিশ্বাসী, তা দলটির জোটে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়েছে।’’
এছাড়া এনসিপি নেত্রী তাজনূভা জাবিন দল ছেড়ে যাওয়ার পরও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলেন। তখন তিনি প্রশ্ন রেখেছিলেন—যদি জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্তই হয়ে থাকে, তাহলে আগে কেন এককভাবে নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছিল? আমার মনে হয়, এনসিপি নির্বাচন নিয়ে যে ধরনের হুমকি দিচ্ছে, তা জামায়াতের প্রেসক্রিপশনেই বলছে। কারণ তাদের জোট পরাজয় আঁচ করতে পেরেছে। নির্বাচনের পর যাতে কিছু বলতে পারে, তাই আগেভাগেই এ ধরনের সংশয়ের কথা বলছে।
আমার বিশ্বাস, তারা নির্বাচনের মাঠ থেকে সরবে না। হয়তো তারা কমিশন ও প্রশাসনকে চাপে ফেলতেও এমনটি বলে থাকতে পারে। তবে আরেক দিক থেকে এটিকে আমি ইতিবাচক হিসেবেও দেখছি। কারণ তারা চাপে না রাখলে প্রশাসন একদিকে ঝুঁকে যেতে পারে।
নির্বাচন নিয়ে কী বলেছেন আসিফ
গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানির শেষ দিনে ইসি থেকে বের হয়ে সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন বিএনপির পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।’’
তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণরূপে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করছে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য রাজনৈতিক দল বা জনগণের যে আত্মবিশ্বাস অর্জনের কথা ছিল, ইসি তা হারিয়েছে।’’
‘‘তারা এভাবে সামনের দিকে যেতে থাকলে আমরা শঙ্কা প্রকাশ করছি যে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন বাস্তবায়ন করতে পারবে না। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে এনসিপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা, সেটা পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে।’’
এর একদিন পর ১৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ দলের প্রতিনিধিদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে একই কথা বলেন আসিফ।
তিনি বলেন, ‘‘ইসি এমন একপাক্ষিক আচরণ করলে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হবে। অনিয়ম চলতে থাকলে দল ও জোটের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’’
একই সংবাদ সম্মেলনে সরকার ও কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
এনসিপি নেতাদের যা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা
ইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানালে সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে এনসিপি নেতাদের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি জানান, নিরপেক্ষতা নিশ্চিতের জন্যই লটারির মাধ্যমে মাঠ প্রশাসনে রদবদল করা হয়েছে। এ নির্বাচনে কোনও পক্ষপাতের সুযোগ নেই। কারণ এটি দেশের মানুষের ভাগ্য নির্ধারণের নির্বাচন। দেশ পাল্টে দেওয়ার নির্বাচন। তাই এই নির্বাচন সুষ্ঠু হতেই হবে।
ভেতরে ভেতরে আসলে কী হচ্ছে
নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ২২ দিন। এমন সময়ে একটি জোটের শরিক দলের শীর্ষ নেতাদের ভোটের মাঠ থেকে সরে যাওয়ার হুমকির বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছেন কেউ কেউ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রাজনীতিবিদ মনে করেন— তারা এখন যা বলছে, তা সরকারের ইশারাতেই বলছেন। কারণ তারা নির্বাচনে পরাজয় টের পাচ্ছেন। তাই হয়তো সরকারের সঙ্গে তাদের কোনও ধরনের বোঝাপড়া হয়ে থাকতে পারে। হয়তো মনে করছেন, তারা সরে গেলে একটি বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে এবং নির্বাচন বানচাল হতে পারে। এতে তারা সুবিধা পাবে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এনসিপিকে ইঙ্গিত করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘‘যাদের তিনটি ভোট নেই, তারা নির্বাচনের বিষয়ে নানা হুমকি দিচ্ছে।’’
এ বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এনসিপি এ ধরনের কথা বলছে নির্বাচনে পরাজয়ের ভয় থেকে। কারণ নতুন দল হয়েও তারা প্রধান দলের মর্যাদা পাচ্ছে। তারা মূলত কিংস পার্টি। ভোটে পরাজিত হলে হয়তো এখনকার মতো ক্ষমতা তাদের থাকবে না। তাই তারা নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করতে পারে।’’
একই কথা বললেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘এনসিপির পক্ষে গেলে তারা এক ধরনের কথা বলছেন, আবার বিপক্ষে হলে ভিন্ন অবস্থান নিচ্ছেন। সরকার আর নির্বাচন কমিশন সবই তো তাদের। তাদের কোনও কথাই স্বচ্ছ নয়। তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করা কঠিন।’’
এনসিপির ব্যাখ্যা
ইসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে নির্বাচনে থাকা না থাকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে—দলের শীর্ষ নেতাদের এমন মন্তব্য নিয়ে জানতে চাইলে দলটির নির্বাচনি মিডিয়া উপকমিটির প্রধান মাহবুব আলম বলেন, ‘‘আমরা চাই নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই হতে হবে। তবে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপি ইস্যুতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সরাসরি বিএনপির পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় আমাদের শীর্ষ নেতারা এক ধরনের আশঙ্কা থেকেই এ ধরনের কথা বলেছেন। তবে এমনটি চলতে থাকলে আমরা আরও কঠোর হতে বাধ্য হবো।’’