Image description

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভয়ংকর জঙ্গল সলিমপুর। সরকারি খাসজমি দখল করে গড়ে ওঠা এ দুর্গম জনপদ পরিণত হয়েছে মাদক ও অস্ত্র বেচাকেনার ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে। এলাকাটি যেন দেশের ভিতরে আলাদা একটি দেশ। যেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কিংবা প্রশাসনের লোকজন প্রবেশ করতে গেলে পড়তে হয় সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে। সর্বশেষ সোমবার সন্ত্রাসীদের হামলায় র‌্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন নিহত হওয়ার ঘটনা এ অপরাধ সাম্রাজ্যের ভয়াবহতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।

চট্টগ্রামে নিহত র‌্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেনের জানাজা শেষে গতকাল র‌্যাব মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। খুব শিগগিরই আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেখানে যারা অবৈধভাবে বসবাস করছে, অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা আছে, তাদের নির্মূল করা হবে। অবৈধ কর্মকাণ্ডের এ আস্তানা আমরা গুঁড়িয়ে দেব।’ চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে প্রশাসন। সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর সমন্বয়ে দ্রুত সেখানে যৌথ অভিযান শুরু করা হবে।

জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজীদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটি লাগোয়া সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম এলাকায় অবস্থান জঙ্গল সলিমপুরের। ৩ হাজার ১০০ একর এলাকার জায়গাটি চট্টগ্রামের অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত। নব্বইয়ের দশকের শীর্ষ সন্ত্রাসী আলী আক্কাসের মাধ্যমে এ এলাকার গোড়াপত্তন হয়। শুরুতে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে পাহাড়ি খাস জমি বিক্রি শুরু করে আক্কাস বাহিনী। ওই সময় একটি প্লট ২০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে প্রতিটি প্লট বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকায়। প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সরকারি খাস জমি দখল করে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে ৩০ হাজারের বেশি অবৈধ বসতি। পাহাড় কেটে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার স্ট্যাম্পের মাধ্যমে প্লট বিক্রি করা হয়। এ বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী বাহিনী। একেকটি বাহিনীতে সদস্য রয়েছে ১৫০ থেকে ২৫০। এর মধ্যেই র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আক্কাস মারা গেলে তার সহযোগী কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, লাল বাদশা, ফারুক, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক আলাদা আলাদা দল তৈরি করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর নতুন করে বাহিনী গড়ে তোলেন রোকন উদ্দিন। পরে সঙ্গে যুক্ত হন কাজী মশিউর, গাজী সাদেক ও গোলাম গফুর।

এ ছাড়া সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে আহমেদ উল্লাহ বাবুর্চি বাহিনী, ইমরান ওরফে লুইচ্ছা ইমরান বাহিনী, আবু তাহের বাহিনী, নূর হোসেন বাহিনী, নূরুল ইসলাম ওরফে ডাকাত নূরুল ইসলাম বাহিনী, রমজান বাহিনী অন্যতম। এর মধ্যে কাজী মশিউররা রয়েছেন জঙ্গল সলিমপুরের সলিমপুর অংশে আর ইয়াসিন রয়েছেন আলীনগরে। জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশপথে সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র পাহারা থাকে। প্রতিটি বাসিন্দাকে অপরাধী চক্রের দেওয়া বিশেষ ‘পরিচয়পত্র’ বহন করতে হয়। যা ওই এলাকায় প্রবেশের পাস হিসেবে গণ্য করা হয়।

এখানে বসবাসকারীরা অবাধ্য হলে বা প্রশাসনের সোর্স হিসেবে কাজ করলে তাকে পাহাড়ের গোপন ‘টর্চার সেলে’ নিয়ে নির্যাতন করা হয়। এলাকাটি দুর্গম পাহাড় হওয়ার সুযোগে এখানে গড়ে উঠেছে দেশি অস্ত্র তৈরির গোপন কারখানা। চট্টগ্রাম শহর ও আশপাশের এলাকায় সরবরাহ করা মাদকের একটি বড় চালান এখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর এ এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ, খুনাখুনি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত ১৭ মাসে এ ঘটনায় খুন হয়েছেন কমপক্ষে সাতজন। বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন কয়েক শ। সন্ত্রাসীদের বিশেষ অঞ্চল হিসেবে কুখ্যাতি পাওয়া এ এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে বারবার বাধার মুখে পড়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি ঢুকলেই প্রবেশমুখে পাহারায় থাকা দখলদার এবং সন্ত্রাসীরা দ্রুত খবর পেয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে জড়ো হয়ে পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি, ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন তারা। সর্বশেষ গত সোমবার সন্ত্রাসীদের হামলায় এক র‌্যাব কর্মকর্তা নিহত এবং তিন সদস্য আহত হন। এর আগে ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল বড়ইতলা ২ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে হামলায় জেলা প্রশাসনের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক, সীতাকুণ্ড থানার পুলিশসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি র‌্যাবের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছিল। একই বছরের ২ আগস্ট অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে বাধা দেওয়া হয় জেলা প্রশাসনের লোকজনকে। ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আলীনগরে অবৈধ বসতি ভাঙতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা করে সন্ত্রাসীরা।