বর্তমানে দেশে সবচেয়ে আলোচিত অপপ্রচার বা প্রোপাগান্ডাটি চলছে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনকে ঘিরে। দেশের একমাত্র এই প্রবাল দ্বীপটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। বিভিন্ন অনলাইন পোস্ট, ভিডিও এবং রাজনৈতিক বক্তব্যে দাবি করা হচ্ছে যে— দ্বীপটি বিদেশি শক্তির হাতে চলে যাচ্ছে অথবা সেখানে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে।
সম্প্রতি সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটন সীমিত করার সরকারি সিদ্ধান্ত এই অপপ্রচারে নতুন করে ঘি ঢেলেছে। ফলে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে যে, পর্যটন নিয়ন্ত্রণের পেছনে কোনো গভীর রহস্য বা গোপন উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে। এসব ভিত্তিহীন দাবি দ্রুত ভাইরাল হয়ে সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। প্রকৃতপক্ষে, সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনী সেখানে নিয়মিত ও যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে।
সাম্প্রতিক সময়ের এসব গুজব যাচাই করতে সরেজমিনে সেন্টমার্টিন দ্বীপ পরিদর্শন করে দেখা গেছে, সেখানে বিদেশি সৈন্য বা সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের কোনো চিহ্ন নেই। বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীগুলো কেবল তাদের নিয়মিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছে; সেখানে কোনো অস্বাভাবিক সামরিক তৎপরতার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

ভোরের আলোয় জেলেদের ব্যস্ততা, স্বাভাবিক জনজীবন
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ফেসবুক, ইউটিউব এবং বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে বিদেশি নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের ছবি ব্যবহার করে এক ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এসব পোস্টে দাবি করা হচ্ছে যে, ‘সেন্টমার্টিন দখল হয়ে গেছে’ অথবা ‘সেখানে বিদেশি সেনারা ঘাঁটি তৈরি করছে’। এমনকি কিছু ভিডিওতে রাতের অন্ধকারে আলো বা আগুনের দৃশ্য দেখিয়ে সেগুলোকে অস্বাভাবিক সামরিক কার্যক্রম হিসেবে প্রচার করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো কোনো নৌ-মহড়ার ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করা হচ্ছে। সেগুলোকে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে।
অনলাইনে এই অপপ্রচার ছড়িয়ে পড়ার পেছনে রাজনৈতিক বক্তব্যও একটি বড় উৎস হিসেবে কাজ করেছে। কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মী তাদের বক্তব্যে অভিযোগ করেছেন যে, সরকার দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড বিদেশি শক্তির হাতে তুলে দিতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এসব দাবিকে সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের জনজীবন একেবারেই স্বাভাবিক ও প্রাণচঞ্চল। দ্বীপজুড়ে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিরামহীন কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ে। ভোরের আলো ফোটার আগেই জেটি ঘাট এলাকায় শুরু হয় কর্মচাঞ্চল্য। বিশাল সব ফিশিং বোট নিয়ে জেলেরা দল বেঁধে গভীর সমুদ্রে পাড়ি জমাচ্ছেন; কারও হাতে জাল, কারও কাঁধে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম— সব মিলিয়ে এক কর্মমুখর দৃশ্য।

দ্বীপের আরও অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে দেখা যায় অন্যরকম এক চিত্র। কেউ ব্যস্ত কৃষিকাজে, কেউ বা রোদে শুঁটকি মাছ শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নারকেল বাগান, স্থানীয় ছোট দোকান ও খাবারের হোটেলগুলোতে মানুষের নিয়মিত আনাগোনা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা কোনো ধরনের উদ্বেগ ছাড়াই নিজেদের জীবিকা নির্বাহে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
প্রতিদিন দুই হাজার পর্যটকের আগমন
পর্যটন মৌসুম চলায় নতুন বছরের জানুয়ারি মাসে দ্বীপটি যেন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার পর্যটক সেন্টমার্টিনে আসছেন। সকালে টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে আসা জাহাজগুলো যখন জেটি ঘাটে নোঙর করে, তখন পর্যটকদের ভিড় আর উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। স্বচ্ছ নীল জলরাশি আর প্রবাল দ্বীপের সৌন্দর্যে মুগ্ধ পর্যটকদের কেউ ব্যস্ত ছবি তোলায়, কেউ বা বিস্ময়ভরা চোখে চারপাশ দেখছেন। দিনভর ঘোরাঘুরি শেষে নিয়ম মেনে তারা আবার জাহাজে করে ফিরে যাচ্ছেন।

পর্যটকদের এই আগমন ঘিরে দ্বীপের হোটেল-রেস্টুরেন্ট, নৌকা ভ্রমণ ও স্থানীয় পণ্যের দোকানগুলোতে চলছে দম ফেলার ফুসরতহীন ব্যস্ততা। অতিথিদের আপ্যায়নে দ্বীপবাসী এখন ভীষণ ব্যস্ত।
সরেজমিনে জেটি ঘাট থেকে শুরু করে পুরো দ্বীপজুড়ে নৌবাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। শুধু তাই নয়, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, উপকূলীয় এলাকা ও গভীর সমুদ্রে অবস্থান করছে নৌবাহিনীর একাধিক জাহাজ।
জানতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দা মো. মোতালেব বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কোনো চিহ্ন নেই। বরং নীল সমুদ্র, কর্মচঞ্চল মানুষ আর পর্যটকদের কোলাহলে দ্বীপটি তার চিরচেনা রূপেই সজীব ও উৎসবমুখর রয়েছে।
বে-হাতের গুজবে ক্ষুব্ধ দ্বীপবাসী
সেন্টমার্টিন দ্বীপ অন্য কোনো দেশকে সামরিক ঘাঁটির জন্য দিয়ে দেওয়া হচ্ছে— এমন একটি অপপ্রচার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু আলোচকের ভিত্তিহীন যুক্তির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এক শ্রেণির আলোচক কুযুক্তি দিয়ে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করলেও সরেজমিনে গিয়ে এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়রা বলছেন, সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এখানে বসবাস করছেন। দ্বীপের প্রতিটি রাস্তা, অলিগলি, সৈকত ও জেটি ঘাট তাদের নখদর্পণে। যদি সত্যিই কোনো বিদেশি বাহিনীর উপস্থিতি থাকত, তবে তা সবার আগে তাদের চোখেই পড়ত। কিন্তু বাস্তবে অনলাইনে ছড়ানো এসব তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কোনো মিল নেই।
দ্বীপের বাসিন্দা মো. আয়াতুল্লাহ পেশায় একজন জেলে। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে মাছ ধরে তার জীবন কাটে। তার পূর্বপুরুষরা প্রায় একশ বছর আগে সেন্টমার্টিনে বসতি গড়েছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা এখানকার স্থায়ী মানুষ। নৌবাহিনীসহ দেশের বিভিন্ন বাহিনী নিয়মিত দ্বীপে দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের দেশের বাহিনী থাকতে অন্য দেশের বাহিনী এখানে আসবে, এটা ভাবাই যায় না। এসব সম্পূর্ণ মিথ্যা ও গুজব। আমরা জীবনে কোনোদিন এখানে অন্য দেশের বাহিনীর আনাগোনা দেখিনি। দ্বীপের প্রতিটি ইঞ্চি আমরা চিনি। যা অনলাইনে ছড়ানো হচ্ছে, বাস্তবে তার কিছুই নেই।”

একই সুর শোনা গেল জেটি ঘাট সংলগ্ন শুঁটকি বিক্রেতা তৌহিদ হোসেনের কণ্ঠে। তিনি বলেন, “বিদেশিরা দ্বীপ নিয়ে যাবে— এটা শতভাগ মিথ্যা কথা। কোনো দেশ কি তার এত সুন্দর জায়গা অন্য কাউকে ছেড়ে দেয়? আমরা দ্বীপবাসী এবং দেশের বাহিনীগুলো রক্ত দিয়ে হলেও এই মাটি রক্ষা করবে। এখানে এমন কিছু ঘটেনি এবং ভবিষ্যতেও হবে না আশা করি। সমুদ্র ও দ্বীপজুড়ে সবসময় নৌবাহিনী আমাদের পাহারায় আছে।”
দ্বীপের আরেক বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, “আমাদের দ্বীপের অবস্থা আমাদের চেয়ে ভালো আর কে বুঝবে? যারা এসব গুজব ছড়াচ্ছে বা বিশ্বাস করছে, তারা আসলে কিছুই জানে না। আমরা জানি এসব ভুয়া। এখানে অন্য কোনো দেশের বাহিনী আসেনি।”
যেসব কারণে গুজব তীব্র হয়েছে
সেন্টমার্টিন দ্বীপ নিয়ে গুজব ও অপপ্রচার সবসময় ছিল। তবে, বর্তমান সরকার দ্বীপে পর্যটক সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এই গুজব আরও তীব্র হয়েছে। অপপ্রচারকারীরা দাবি করছেন যে, সামরিক উদ্দেশ্যে পর্যটন সীমিত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, পর্যটন নিয়ন্ত্রণের মূল কারণ হচ্ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা।
সেন্টমার্টিন মাত্র আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এই দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বছরের পর বছর অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ, প্লাস্টিক দূষণ, প্রবাল সংগ্রহ এবং রাতের বেলা আলো ও শব্দদূষণের ফলে দ্বীপের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সামুদ্রিক কচ্ছপ, শামুক ও লাল কাঁকড়ার মতো প্রাণীদের জীবনচক্রে পর্যটকদের এই বাড়তি চাপের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বারবার স্পষ্ট করেছেন যে, সেন্টমার্টিন রক্ষা করা বর্তমানে রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে সেন্টমার্টিনে নতুন পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতি কার্যকর করা হয়। এই নীতির মূল লক্ষ্য হলো প্রতিদিন দর্শনার্থীর সংখ্যা সীমিত রাখা, নির্দিষ্ট সময়ে দ্বীপে রাতযাপন নিয়ন্ত্রণ এবং সমুদ্র সৈকতে আলো ও শব্দের ব্যবহার সীমিত করা। ২০২৫ সালের নভেম্বরে এই নিয়ন্ত্রিত পর্যটন পুনরায় চালু হলে দেখা যায়, দৈনিক পর্যটকের সংখ্যা দুই হাজার অতিক্রম করেনি এবং পর্যটকরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই দ্বীপ পরিদর্শন করছেন।

গুজবকারীরা সরকারের এই জনকল্যাণকর ও পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্তকে অপপ্রচারের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নিয়েছে। পর্যটকদের যাতায়াত সীমিত করার বিষয়টিকে ‘বিদেশি শক্তিকে সামরিক কার্যক্রমের সুযোগ করে দেওয়া’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, যা বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়েছে।
দ্বীপে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, সেন্টমার্টিনকে কেন্দ্র করে ছড়ানো এসব গুজব মূলত অস্পষ্ট ছবি, পুরোনো ভিডিও এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যার সংমিশ্রণ। যাচাই ছাড়া এমন মিথ্যা তথ্য ছড়ানো কেবল বিভ্রান্তি তৈরি করে না, বরং জাতীয় নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টাকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
রাডার নজরদারি ও সমুদ্রে নৌবাহিনীর কড়া পাহারা
সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও এর আশপাশের জলসীমায় নৌবাহিনীর ২৪ ঘণ্টা নিশ্ছিদ্র নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে সেন্টমার্টিন দ্বীপে গেলে উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ নোঙর করা অবস্থায় চোখে পড়ে।
নৌবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, দ্বীপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমুদ্রে যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতির দ্রুত জবাব দিতে বছরজুড়ে এই মোতায়েন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়। বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সীমার কাছাকাছি এবং গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক নৌপথের সন্নিকটে অবস্থিত হওয়ায় এটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় নৌবাহিনী সেখানে সার্বক্ষণিক পূর্ণ প্রস্তুতি বজায় রাখে। সাধারণত আশপাশের জলসীমায় একাধিক যুদ্ধজাহাজ ও নৌযান মোতায়েন থাকে। নৌবাহিনীর সদস্যরা রাডার নজরদারির মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশ, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা হুমকি প্রতিরোধে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
দ্বীপে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেন্টমার্টিন দ্বীপের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ছড়িয়ে পড়া নানা গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রতিরোধেও সক্রিয় রয়েছে নৌবাহিনী। এসব ভিত্তিহীন তথ্য স্থানীয় বাসিন্দা ও সম্ভাব্য পর্যটকদের মধ্যে অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
তারা আরও জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্বীপ থেকে লোকজন সরিয়ে নেওয়া, ব্যাপক সামরিকীকরণ কিংবা দ্বীপে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মতো যেসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। এ ধরনের গুজবে কান না দিয়ে জনসাধারণকে শুধুমাত্র সরকারি ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নৌবাহিনী সূত্রে আরও জানা যায়, সেন্টমার্টিন দ্বীপে নৌবাহিনী ছাড়াও কোস্টগার্ড, বিজিবি এবং পুলিশ সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করে। নৌবাহিনী উন্নত ‘রাডার সার্ভাইলেন্স’ পদ্ধতির মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করে, যাতে কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ বা সীমান্ত এলাকা থেকে কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি না হয়। এটি বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় সমুদ্রসীমার (ইস্টার্ন ওয়াটার এরিয়া) অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এখানে সবসময় নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন থাকে।

আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, সেন্টমার্টিন সংলগ্ন ১২ নটিক্যাল মাইল আঞ্চলিক সমুদ্র (টেরিটোরিয়াল সি), ২৪ নটিক্যাল মাইল সংলগ্ন এলাকা (কন্টিগুয়াস জোন) এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বাংলাদেশের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) বিস্তৃত। এই বিশাল সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনীর সদস্যরা দিন-রাত দ্বীপের বিভিন্ন অংশে পায়ে হেঁটে টহল দেন। পাশাপাশি ভাড়া করা স্থানীয় কাঠের বোটের মাধ্যমেও অগভীর সমুদ্রে নিয়মিত টহল পরিচালনা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, এসব টহল অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ মালামাল পরিবহন, নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের ব্যবহার এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। গত এক মাসেই প্রায় ৪ লাখ মিটার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া, নিবন্ধিত ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা যখন সমুদ্রপথে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন নৌবাহিনী তাদের সুরক্ষায় কাজ করে। সম্প্রতি নৌবাহিনী পাচারকারীদের খপ্পরে পড়া শিশুসহ এমন অনেককেই সমুদ্র থেকে জীবিত উদ্ধার করেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সেন্টমার্টিন ফরওয়ার্ড বেইজের ওআইসি লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম. মহিউদ্দিন বলেন, “সেন্টমার্টিন দ্বীপ নিয়ে নানাবিধ অপপ্রচার বা প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। এসব অপপ্রচারে দাবি করা হয় যে, সেন্টমার্টিন দ্বীপ নাকি অন্য কোনো দেশ নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি কিছু ছবি বা ভিডিও এমনভাবে এডিট করে প্রকাশ করা হয়, যাতে মনে হয় এখানে বিদেশি বাহিনী অবস্থান করছে। আসলে এসব দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ নৌবাহিনী বিভিন্ন সময়ে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়া বা ‘এক্সারসাইজ’ করে থাকে। গুজবকারীরা মূলত সেসব মহড়ার ভিডিও ও ছবি এডিট করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই দ্বীপের সুরক্ষায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী সর্বদা এবং ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত। দ্বীপের নিরাপত্তায় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের বেশ কয়েকটি জাহাজ সব সময় মোতায়েন থাকে।”