Image description

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় র‍্যাব–৭ কার্যালয়ে জানাজার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আব্দুল মোতালেবের স্ত্রী শামসুন্নাহার বেগমের কান্না যেন থামছিল না। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলছিলেন, ওকে যে কীভাবে মেরেছে, পা বাঁকা করে দিয়েছে। আঙুলগুলো ঝুলে আছে। মাথা-মুখ দেখে মনে হয় লোহার রড দিয়ে মারা হয়েছে। কোনো মানুষকে এত মারে? কী অপরাধ ছিল তার? মেয়েরা বলছিল, বাবা… তুমি আমাদের রেখে চলে গেলে কেন?

গত সোমবার বিকেলে সীতাকুণ্ডে জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীরা পিটিয়ে হত্যা করে র‌্যাব-৭ এর উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল মোতালেবকে। তার সঙ্গে থাকা আরো তিনজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মঙ্গলবার সকালে আব্দুল মোতালেবের লাশ সিএমএইচ থেকে চমেক হাসপাতালের মর্গে আনা হয়। সেখানে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় পতেঙ্গা র‌্যাব কার্যালয়ে। সেখানে অনুষ্ঠিত হয় তার নামাজে জানাজা। জানাজায় যোগ দেন র‌্যাবের ডিজি এ কে এম শহিদুর রহমান, র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ, সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুল হকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পরে তাকে তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার সদর উপজেলার কালীর বাজার ইউনিয়নের অলিপুর গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।

জানাজার আগে আব্দুল মোতালেবের কফিন যখন খোলা জায়গায় রাখা হয়, তখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল তার ছোট মেয়ে সাত বছর বয়সি ইসরাত জাহান মুনতাহা। তার বুঝে আসছিল না, কেন বাবা তাকে কোলে তুলে নিচ্ছেন না। চুপচাপ কফিনের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। জানাজা শুরু হওয়ার ঠিক আগে মুনতাহা আবার কফিনের কাছে এসে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে ছোট হাত বাড়িয়ে কফিনে ছুঁয়ে বলে, বাবা… তুমি আমাদের রেখে চলে গেলে কেন?

কফিনের কাছে এসে বড় মেয়ে শামীমা জান্নাত (১২) হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। দুই হাতে বাবার কফিন ধরে বলে, বাবা, তুমি স্কুলে নিয়ে যাবে বলেছিলে… উঠো বাবা, প্লিজ উঠো…। একদিকে শামীমার কান্না, অন্যদিকে ছোট মুনতাহার নির্বাক দৃষ্টি দুটিই একসঙ্গে পুরো পরিবেশকে ভারী করে তুলছিল।

র‍্যাব সদস্যদের অনেকেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। কেউ চোখ মুছছিলেন। কেউ নীরবে মুনতাহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।

কফিনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ১৮ বছর বয়সি ছেলে মেহেদি হাসান ভুইয়া। ঢাকার তেজগাঁও কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র মেহেদি বাবার লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার চোখে তখন ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ছায়া ফেলেছে। বললেন, বাবা বলতেন, পড়াশোনা ঠিকমত করতে। এখন আমি কীভাবে চলব? এখন আমি একটা চাকরি চাই। সংসারটা দাঁড় করানোর জন্য আমারই কিছু করতে হবে।

আব্দুল মোতালেবের স্ত্রী শামসুন্নাহার বলেন, দেশপ্রেমই কি তার বড় অপরাধ ছিল? এরকম হলে কেউ আর দেশের জন্য কাজ করবে না। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, আমার স্বামী সম্পদ বলতে কিছুই রেখে যাননি। বেতনের টাকায় সংসার চালাতাম। এই বছরই তার চাকরি শেষ হতো…! ওর মৃত্যুর পর আমরা সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে গেলাম। তিনি সরকারের কাছে ন্যায়বিচার ও ছেলের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ চান।

সহকর্মী র‍্যাব সদস্যরা জানান, আব্দুল মোতালেব ছিলেন দায়িত্বশীল, ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করতেন না। চট্টগ্রাম র‍্যাবের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ও গণমাধ্যম শাখার সিনিয়র সহকারী পরিচালক এ আর এম মোজাফফর হোসেন বলেন, আব্দুল মোতালেব অপারেশনে সবসময় সামনের লাইনে থাকতেন। তিনি দেশকে ভালোবাসতেন।