আমবাগানের পেছনে বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেত। তারপর বিশাল এলাকার একপাশে একাধিক ঘানি থেকে মাড়াই হচ্ছে তেল। অন্য পাশে গবাদি পশুর খামার; মাছের ঘের। সঙ্গে মুরগি ও বিদেশি কুকুরের বাণিজ্যিক ফার্ম। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর তারাইল ইউনিয়নের রাতইলে প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে চলছে বিশাল এই কর্মযজ্ঞ।
অভিযোগ রয়েছে, বেশির ভাগ জমি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছ থেকে দখল করা। পরে বৈধতা দিতে ‘শশী ফাউন্ডেশন’– এর নামে সাইনবোর্ড টানিয়ে ভোগদখল হচ্ছে। তবে কাগজে-কলমে নেই প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব। স্থানীয়রা জানান, পুলিশ কর্মকর্তা দুই ভাই ও স্বজনের সঙ্গে মিলে কাশিয়ানীতে ‘দাদাগিরি’ করছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য এসএম হুমায়ুন কবীর।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সহকারী একান্ত সচিব গাজী হাফিজুর রহমান লিকুর ডানহাত ছিলেন হুমায়ুন। তাঁর পরিবারের ভয়ে এলাকার কেউ মুখ খুলতে সাহস করেন না।
প্রয়াত পুলিশ কর্মকর্তা এসএম বাবর আলীর বড় ছেলে হুমায়ুন কবীর ১৯৯৪ সালে ১৩তম বিসিএসের মাধ্যমে এনবিআরে অ্যাসিস্ট্যান্ট কন্ট্রোলার পদে যোগ দেন। কর্মজীবনে কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার ও যুগ্ম কমিশনার পদে দায়িত্ব পালন করে ২০২৪ সালের ৩০ মে সদস্য (গ্রেড-২) হিসেবে অবসরে যান।
হুমায়ুনের দুই ভাই– এসএম শহীদুল ইসলাম ও এসএম রফিকুল ইসলাম একসঙ্গে ২৫তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে এএসপি হিসেবে যোগ দেন। শহীদুল পুলিশ সদর দপ্তরের এসপি; মেডিকেলে পড়াশোনা করে রাজধানীর শান্তিনগরে শশী হাসপাতাল নামের ফিজিওথেরাপি সেন্টার চালাচ্ছেন। রফিকুল এসপি হিসেবে নৌ পুলিশে কর্মরত।
স্ট্রিমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শশী ফাউন্ডেশনের আড়ালে রয়েছে ‘বাংলাদেশ ইকো-ফ্রেন্ডলি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেড’। সর্বশেষ রেকর্ড দলিলে প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে বিশাল সম্পত্তি বুঝে নিয়েছেন হুমায়ুন কবীরের ভগ্নিপতি বিএম রেজাউল করীম। জমি হস্তান্তরকারীদের মধ্যে হুমায়ুনের ভাই, বোন, চাচাসহ অন্য স্বজনও রয়েছেন।
তারাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা নাজমুল হক স্ট্রিমকে বলেন, ‘জমির মালিকানা কয়েকজন থেকে বাংলাদেশ ইকো-ফ্রেন্ডলি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেডের নামে হস্তান্তর হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষে জমি বুঝে নিয়েছেন বিএম রেজাউল করীম। দলিলে এখন সব সম্পত্তি বাংলাদেশ ইকো-ফ্রেন্ডলি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেডের।’
সরেজমিন বাগান, খামার, ঘেরসহ জমিকেন্দ্রিক কার্যক্রমে অর্ধ শতাধিক কর্মচারী ও দুজন ব্যবস্থাপক পাওয়া যায়। এক ব্যবস্থাপক ইসমাইল হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, ‘জমি ও সম্পদের মালিক এসএম হুমায়ুন কবীর এবং তাঁর ভাই ডা. শহীদুল ইসলাম। তাঁরাই আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন। এলাকা বৃদ্ধির কাজ চলছে, সামনে আরও বড় পরিসরে কার্যক্রম হবে।’
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর তারাইল ইউনিয়নের রাতইলে প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে চলছে হুমায়ুন কবীরের নানা কর্মযজ্ঞ। স্ট্রিম গ্রাফিক
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আনজুরুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘এখানে যে পার্ক, তা হুমায়ুন ও তাঁর দুই ভাইয়ের। তাদের সঙ্গে কয়েকজন আত্মীয়ও আছেন বলে জানি।’
পৈতৃক সূত্রে বিপুল জমির অধিকারী দাবি করলেও, দলিলের মালিকানা বাংলাদেশ ইকো-ফ্রেন্ডলি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেড সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে স্ট্রিমকে বলেছেন হুমায়ুন কবীর।
মালিকানায় কারিশমা
স্ট্রিমের হাতে আসা অন্তত পাঁচটি দলিল বিশ্লেষণে বিশাল সম্পত্তির মালিকানা বাংলাদেশ ইকো-ফ্রেন্ডলি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেডের পাওয়া গেছে। এর উত্তর পাশে অন্য দাগে কিছু জমি রয়েছে। ভূমি অফিসের তথ্যে, সবই এক মৌজার।
হুমায়ুন কবীর পৈতৃক দাবি করলেও, দলিলে এসব জমির মধ্যে অন্তত ১৬ দশমিক ১৮ বিঘার মালিকানা ছিল স্থানীয় বাসিন্দা কেশব লাল বিশ্বাস, চন্দন কুমার বিশ্বাস, জগদীশ চন্দ্র বিশ্বাস, সুচন্দ্রা বিশ্বাস, মেলা রানী বিশ্বাস, বিমলা রানী বিশ্বাস, যোগেন্দ্রনাথ বালা, গৌরী দাসী রায়, জোতিষ চন্দ্র বিশ্বাস, জানকি নাথ বিশ্বাস, যতীন্দ্রনাথ রায়, দুলাল চন্দ্র রায়, পরিতোষ চন্দ্র রায়, ব্রজবাসী মালাকার, সুধীন্দ্রনাথ মালাকার, মৃনাল কান্তি মালাকার, নাগেন্দ্রনাথ রায়, ননী গোপাল রায়, সুনিল কান্ত রায়, সুভাষিনী রানী শীল, জয়দেব শিকদার, নীল কমল শিকদার, অর্জুন কুমার শিকদার, জয়দেব বাগচী, সুধা রানী পাল, বিজলী রানী মালাকার, সিতান্ত কুমার পাল, নিতাই কুমার মন্ডল প্রমুখ।
কাশিয়ানীর রাতইলে হুমায়ুন কবীরের পৈতৃক ভিটায় ডুপ্লেক্স বাড়ি থাকলেও, সেটি সম্পর্কে জানেন না তিনি। একইভাবে সেখানে বর্তমানে যে বহুতল ভবন হচ্ছে, তা সম্পর্কেও জানেন না হুমায়ুন কবীর, ‘পারিবারিক জমি আলাদা করা হয়নি। টাকা দিইনি বলে কে ভবন করছে তা বলতে পারছি না।’
পৈতৃক ভিটায় ডুপ্লেক্স বাড়ি এবং নির্মাণাধীন বহুতল ভবন হলেও তা জানেন না হুমায়ুন পরিবার। স্ট্রিম ছবি
যৌথ মূলধন কোম্পানি (আরজেএসসি) ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয়ে বাংলাদেশ ইকো-ফ্রেন্ডলি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেড নিবন্ধিত। প্রতিষ্ঠানের জমির দলিলে ঠিকানা রাজধানীর বিজয়নগরের আকরাম টাওয়ার। ভবন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের এখানে এই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান কখনো ছিল না। তবে অনুসন্ধানে ভবনে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় পেয়েছে স্ট্রিম, যেটির মালিক হুমায়ুন কবীরের ছোট বোন নাদিরা। পরে অবশ্য আকরাম টাওয়ারে বোনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকার কথা স্বীকার করেন হুমায়ুন।
সম্পদ নিয়ে লুকোচুরি
হুমায়ুন কবীরের ছোট ভাই ডা. এসএম শহীদুল ইসলামের ফেসবুকে তাঁর সঙ্গে কাশিয়ানীর বিশাল কর্মযজ্ঞের সেই ব্যবস্থাপক ইসমাইল হোসেনের একাধিক ভিডিও পাওয়া গেছে। কাশিয়ানীর জমিতে ‘শশী ফাউন্ডেশন’– এর সাইনবোর্ডে থাকা নম্বরে কল দিয়ে রাজধানীর শান্তিনগরের শশী হাসপাতালের তথ্য মেলে। তবে গোপালগঞ্জের শশী ফাউন্ডেশনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই বলে জানায়।
সরেজমিন শশী হাসপাতালে শহীদুল ইসলামকে পেয়েছেন এই প্রতিবেদক। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সজীব শেখের মাধ্যমে এসব বিষয়ে মন্তব্য করবেন না বলে জানান তিনি। শহীদুল ২৫তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেন। পরে চীন থেকে মেডিকেল বিদ্যায় পড়াশোনা করে লিয়েনে হাসপাতাল চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এনবিআর ও দুদকে হুমায়ুন পরিবারের প্রভাব
গোপালগঞ্জে বাড়ি হওয়ায় হুমায়ুন ঘনিষ্ঠ হন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহকারী একান্ত সচিব গাজী হাফিজুর রহমান লিকুর। এই রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি এনবিআরে গোপালগঞ্জের বাসিন্দাদের নিয়ে সমিতি গড়েন। অভিযোগ রয়েছে, এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে আতঙ্ক ছিল হুমায়ুন সিন্ডিকেট। তাঁর কথামতো কাজ না করলে নেমে আসত খড়্গ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক রাজস্ব কর্মকর্তা জানান, পুলিশ কর্মকর্তা দুই ভাইয়ের ক্ষমতা এনবিআরে অহরহ দেখাতেন হুমায়ুন কবীর। বন্ডের কমিশনার থাকাকালে তাঁর ভয়ে কেউ কথা বলতে সাহস করতেন না। সিন্ডিকেট গড়ে নিজের লোকদের নানা সুবিধা দিতেন। কেউ অভিযোগ করলে, করা হতো নিপীড়ন।
এ ব্যাপারে হুমায়ুনের দাবি, তিনি কাউকে হয়রানি করেননি। উল্টো বিএনপি আমলে নিয়োগ পাওয়ায় তাঁকে নানা বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। সুবিধা নেওয়া দূরে থাক, লিকুর সঙ্গে কখনো দেখা পর্যন্ত হয়নি বলে জানান তিনি।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান স্ট্রিমকে বলেন, ‘এসএম হুমায়ুন কবীর এখন এনবিআরে নেই। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয়ভাবে কিছু করার নেই। আমি যতদূর জানি, হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ দুদক তদন্ত করছে। নিশ্চয় তাদের তদন্তে বিস্তারিত উঠে আসবে।’
অন্যদিকে, হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক অভিযোগ জমা পড়ে। পরে সংস্থাটি তাঁর সম্পদের হিসাব দিতে বলেছে বলে জানা গেছে।
হুমায়ুন এনবিআরের আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য (প্রেসিডেন্ট) ছিলেন, যেখানে শুল্ক ফাঁকি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনিয়মের বিচার হয়। ট্রাইব্যুনালে বিচারক থাকেন একজন এনবিআর সদস্য; অন্যজন জেলা জজ কিংবা অতিরিক্ত জেলা জজ।
রাতইলে প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে শশী ফাউন্ডেশনের নামে চলছে গরুর খামার, মাছের ঘেরসহ নানা কার্যক্রম। স্ট্রিম গ্রাফিক
২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ইন্ডিগো স্পিনিং মিলস লিমিটেডের শুল্ক ফাঁকির মামলায় বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির ফাঁকি দেওয়া শুল্কের পরিমাণ ৫১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪২ টাকা। কাস্টমস হাউস অভিযোগ আমলে নিয়ে ইন্ডিগো স্পিনিংকে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়। তবে আপিল ট্রাইব্যুনালে তারা মাত্র এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়ে ছাড় পায়। ইন্ডিগো স্পিনিংকে মওকুফ করা হয় ১ কোটি ৪ লাখ টাকা।
হুমায়ুনের সময় একইভাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ ছাড় পেয়েছে সানটেক্স প্রাইভেট লিমিটেড, ফয়সাল এন্টারপ্রাইজ, আমানত শাহ ফেব্রিক্স লিমিটেডসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আপিল ট্রাইব্যুনালে মামলা এলেই ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়ে হুমায়ুন আগের আদেশটি ভুল উল্লেখ করে দণ্ড মওকুফ করতেন। অবশ্য হুমায়ুনের দাবি, আইনের বাইরে তিনি কাউকে কোনো সুবিধা দেননি।
অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম দুদকের মানি লন্ডারিং সেলে থাকাকালে ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁর ভাই হুমায়ুনের সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য করতেন। হুমায়ুনের ‘অডি আর৮’ গাড়ির শুল্ক ফাঁকির ঘটনা তদন্ত বদলাতেও রফিকুল কলকাঠি নাড়েন। ফলে নানা অপকর্ম করেও হুমায়ুন থেকে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
তদন্তে প্রভাব খাটানোর বিষয়ে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি রফিকুল ইসলাম। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি।
কী ঘটেছিল অডি গাড়ি খালাসে
মোংলা বন্দরে হুমায়ুন কবীর কমিশনার থাকার সময় খালাস করা একটি ‘অডি আর৮’ গাড়ি ধরা পড়ে রাজধানীর বনানীতে। পরে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তদন্তে আসে, ৫ হাজার ২০৪ সিসির গাড়িকে ২ হাজার ৫০০ সিসি এবং ‘অডি টিটি’ মডেল দেখিয়ে প্রায় ১৫ কোটি ৪৮ লাখ ৩০ হাজার টাকার বেশি শুল্ক ফাঁকির ব্যবস্থা করেন হুমায়ুন।
২০১৬ সালে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এক চিঠিতে ভুল তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অডি আর৮ গাড়ি ছাড়ের ঘটনা তদন্তে কমিটির কথা বলা হয়। এতে আরও বলা হয়, গাড়িটির মূল্য ২ কোটি ৫ লাখ ২২ হাজার ২২৪ টাকা এবং শুল্ক করাদির পরিমাণ ১৭ কোটি ২৬ লাখ ৯৮ হাজার ৬২১ টাকা দেখানো হয়েছে। এটি প্রকৃত মূল্য ও শুল্ক করাদির চেয়ে অনেক কম।
শুধু তাই নয়, গাড়িটি কেনার মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগও তুলেছিল কাস্টমস, যাতে একটি বেসরকারি ব্যাংকে এলসির মাধ্যমে অতিরিক্ত প্রায় ১ কোটি ৭৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা (১ লাখ ৪৯ হাজার পাউন্ড) পরিশোধ করা হয়।
তৎকালীন রাজস্ব কর্মকর্তা বিজয় কুমার রায় অডি আর৮ গাড়ির শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ করেছিলেন। রাজধানীর কমলাপুরের আইসিডিতে কর্মরত বিজয় কুমার স্ট্রিমকে বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে যাচাই-বাছাই শেষে আমরা ৫ হাজার ২০৪ সিসির অডি আর৮ গাড়ি খালাসে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ দিয়েছিলাম।’
বিষয়টি তদন্তে কমিটি করে দফায় দফায় প্রতিবেদন দিলেও এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১৩ জানুয়ারি শ্যুটিংয়ের কাজে গাড়িটি ব্যবহারের সময় অগ্নিকাণ্ডে সিসি শনাক্তের নম্বরসহ সব নষ্ট হয়ে গেছে। এরপর তদন্ত হলেও, সেই প্রতিবেদন সামনে আসেনি।
অভিযোগ রয়েছে, নিজের অপকর্ম ঢাকতে হুমায়ুন ভাইদের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে পুলিশি প্রতিবেদন বদলেছেন।
অডি আর৮ খালাসে অনিয়মের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন হুমায়ুন কবীর। বলেন, ‘শুল্ক ফাঁকি হলে যিনি শুল্কায়ন করেন তিনি দায়ী। দায়িত্বে থাকার কারণে কমিশনারকে দায়ী করা হলে– মোংলা এবং চট্টগ্রাম বন্দরে অনেকের নাম আসবে।’
ঘনিষ্ঠদের নামে বন্ড সুবিধা
হুমায়ুন কবীর অবিভক্ত কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার ছিলেন। সে সময় তাঁর ঘনিষ্ঠদের নামে বন্ডের আওতায় একাধিক প্রতিষ্ঠান সুবিধা নিয়েছে বলে দুদকে অভিযোগ দেন একাধিক ব্যবসায়ী। সংস্থাটি তদন্ত করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আবারও হুমায়ুন কবীরের বিষয়ে দুদক অনুসন্ধানে নেমেছে। সংস্থার একজন অতিরিক্ত পরিচালকের নেতৃত্বে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে। ইতোমধ্যে হুমায়ুন কবীরের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে দুদক।
হুমায়ুন কবীরের সময়ে শশী ফাউন্ডেশন সদৃশ ‘শশী সু বক্স অ্যান্ড গার্মেন্ট অ্যাক্সেসরিজ’ নামের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়। এক প্রতিষ্ঠানের বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেছে তারা। অবশ্য গেল দুই বছরের মধ্যে মালিকানা হস্তান্তর করে প্রতিষ্ঠানটি হয়েছে ‘কোয়েস্ট ডাইনামিক লিমিটেড’। কাগজে-কলমে শশী সু বক্স অ্যান্ড গার্মেন্ট অ্যাক্সেসরিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অদিতি রহমান হলেও সর্বেসর্বা তাঁর স্বামী পরিচয়ে মো. মাসুদ। এমনকি অদিতি রহমানের ফোন কল ধরে নিজেই সব দেখভাল করেন বলে জানান মাসুদ।
কোয়েস্ট ডাইনামিক লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক সজীব শেখ চাচাতো ভাই হন হুমায়ুন কবীরের। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন বলে নিজের ফেসবুকে উল্লেখ করেছেন।
একই অভিযোগ কুমিল্লার কোয়েস্ট এক্সসরিজ (বিডি) লিমিটেডসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। তবে কুমিল্লার কোয়েস্ট অ্যাক্সসরিজ (বিডি) লিমিটেডের কর্ণধার আনোয়ার হোসেন বলেছেন, ‘যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু ব্যবহার করি। হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি আমারসহ অনেকের ক্ষতি করেছেন।’
এদিকে, ২০২৫ সালের মে মাসে ব্যবসায়ীদের পক্ষে হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এতে বন্ড নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতা ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়া এবং পরিচিতদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান গড়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
গ্রিন স্টার ইন্টারন্যাশনালের মালিক গোলাম মোস্তফা বন্ডের সুবিধা নিয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রি ও রপ্তানি না করার কথা স্বীকার করেছেন। হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে সখ্য প্রশ্নে তিনি হেসে বলেন, ‘এই নামে আমার এক শ্যালক রয়েছে।’ ফুজিয়্যাংয়ের পরিচালক সামসুল আলম বলেন, ‘আমার সঙ্গে হুমায়ুন কবীরের পরিচয় নেই। থাকলে আমাদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে থাকতে পারে।’
হুমায়ুন কবীরের কাছ থেকে বন্ডের অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ থাকা পদ্মা স্পিনিং, ফারদিন অ্যাক্সেসরিজ ও স্টার প্যাকেজিংয়ের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক বলেন, ‘আমি নিয়ম মেনে কাজ করি। বন্ডের সুবিধা দিয়ে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করি না। তা ছাড়া আমার সঙ্গে তাঁর (হুমায়ুন কবীর) কোনো সম্পর্ক নেই। আকরাম টাওয়ারে গেলে তাঁর বোনকে পাবেন।’