Image description

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় বাসকেন্দ্রিক বিশৃঙ্খলা দীর্ঘদিনের। রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে প্রতিদিনই বাসের অনিয়ম, যাত্রীদের সঙ্গে চালক-হেলপারদের দুর্ব্যবহার, বেপরোয়া প্রতিযোগিতা ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দৃশ্য চোখে পড়ে। বাসগুলো নির্দিষ্ট স্টপেজে না থেমে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করায় রাস্তায় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক বাস একই যাত্রী তুলতে গিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ে, ফলে পেছনের যানবাহন আটকে যায়।

যাত্রীরা অভিযোগ করেন, বাসে ওঠার পর ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, অনেক সময় দরজায় ঝুলে যাতায়াত করতে হয়। ভাড়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে নৈরাজ্য। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা থাকলেও অধিকাংশ বাসে তা মানা হয় না। দূরত্বের তুলনায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। বিশৃঙ্খলার মূল কারণ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা। নির্দিষ্ট স্টপেজ বাধ্যতামূলক করা, ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমান রাখা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গণপরিবহন ব্যবস্থার শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাসের বিশৃঙ্খলা এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে জরুরি ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন নগরবাসী।

রাজধানী ঢাকা ও শহরতলীর রুটে চলাচলকারী বাসগুলোতে এখন থেকে যাত্রীদের ই-টিকেট কেটে চড়তে হবে এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাস স্টপে কিউআর কোড দেওয়া থাকবে। যাত্রীরা সেটা স্ক্যান করে অ্যাপ ডাউনলোড করে নিজেরাই টিকেট কাটতে পারবেন। যারা স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন না, তাদের জন্য থাকবেন সাড়ে তিন হাজারের বেশি টিকিট মাস্টার। তাদের কাছ থেকে টিকিট সংগ্রহ করা যাবে। বাস ই-টিকেটিং পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করা হচ্ছে হাফ ভাড়ার ব্যবস্থাও। গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠানিকভাবে এই পদ্ধতির উদ্বোধন করা হয়। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই পদ্ধতি পুরোদমে চালু করা হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন, ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়নসহ কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে এই পদ্ধতি বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে। ‘আরবানমুভ টেক’ নামের একটি কোম্পানি এ ব্যবস্থায় কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। এ পদ্ধতিতে সকল বাস নির্ধারিত স্টপেজে যাত্রী তুলবে এবং নামাবে। সকল যাত্রীকে অ্যাপ অথবা ডিভাইসের মাধ্যমে ই-টিকেট সংগ্রহ করে গাড়িতে ভ্রমণ করতে হবে। এ পদ্ধতিতে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করা হবে না।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, বিভিন্ন রুটের পরিবহন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ‘আরবানমুভ টেক’ ই-টিকেটিং ব্যবস্থাপনার সার্বিক দায়িত্ব নিয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই কার্যক্রম চালু করা হবে। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ও পুলিশ প্রশাসন এই কার্যক্রম পরিচালনায় সার্বিক সহযোগিতা ও তদারকি করবে।

তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, এই পদ্ধতি কার্যকর হলে রাস্তায় যানজট কমবে, অসম প্রতিযোগিতায় গাড়ি চলাচল বন্ধ হবে, দুর্ঘটনা কমিয়ে যাত্রী সাধারণের চলাচলে নিরাপত্তা, আরাম, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হবে এবং রাস্তায় গাড়ি থেকে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। ঢাকা শহর ও শহরতলী রুটে চলাচলরত বাস সার্ভিস গত ১৬ বছর ধরে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় চলাচল করছে। যাত্রী ওঠা-নামার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ না থাকা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন না হওয়া, গাড়ি চলাচলে বৈধ রুট পারমিট না থাকা, গাড়ির চালকদের বৈধ লাইসেন্স পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও বিড়ম্বনা এবং মাসিক বা দৈনিক বেতনে গাড়ি চলাচলের পরিবর্তে কন্ট্রাক্ট পদ্ধতিতে চালকদের গাড়ি পরিচালনা করতে দেওয়ার মত নানা সমস্যা বিরাজমান।

ফলে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে এবং যাত্রীদের নির্বিঘেœ চলাচল ও সেবায় বিঘœ ঘটছে। তাছাড়া অসম প্রতিযোগিতায় গাড়ি চালানোর কারণে রাস্তায় যানজট, দুর্ঘটনা হচ্ছে। প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানোর কারণে প্রায় প্রতিটি গাড়ি লক্কর-ঝক্কর, ভাঙাচোরা ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এই নতুন ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের বেতন বা সুযোগ-সুবিধা এক পয়সাও কমানো হবে না। বরং যানজট কমলে ট্রিপ বাড়বে, চালকদের আয় বাড়বে এবং কাজের চাপ কমবে। মালিকদের মালিকানা অক্ষুণœ থাকবে এবং কোম্পানির মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে আয় বণ্টন করা হবে।

এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য এবং পরিবহন চলাচলে শৃঙ্খলা আনা, যাত্রী সেবার মানোন্নয়ন, দুর্ঘটনা কমানো ও দৃষ্টি নন্দন পরিবহন ব্যবস্থাপনা করার লক্ষ্যে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন এবং ডিএমপির ট্রাফিক ও ক্রাইম বিভাগহ যৌথ উদ্যোগে ই-টিকেটিং ও কাউন্টার পদ্ধতিতে ঢাকা শহর ও শহরতলীর বাস পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানানো হয়।

সাইফুল আলম আরো বলেন, এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা ও গাজীপুর মেট্রোপলিটান পুলিশ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, জেলা প্রশাসন ঢাকা ও মানিকগঞ্জ, হাইওয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট পরিবহন শ্রমিক, পরিবহন কোম্পানি ও প্রশাসনের সঙ্গে আট মাস ধরে দফায় দফায় আলোচনা সভা, কাউন্সেলিং সভা ও মতবিনিময় করা হয়েছে।

আরবানমুভ টেক-এর এমডি জুনায়েদ আবদুল্লাহ বলেন, ঢাকার আটশ’র বেশি বাস স্টপে কিউআর কোড দেওয়া থাকবে। যাত্রীরা সেটা স্ক্যান করে অ্যাপ ডাউনলোড করে নিজেরাই টিকেট কাটতে পারবেন। যারা স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন না, তাদের জন্য থাকবেন সাড়ে তিন হাজারের বেশি টিকিট মাস্টার। তাদের কাছ থেকে টিকিট সংগ্রহ করা যাবে।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, এই ব্যবস্থাপনা চালুর মাধ্যমে সড়কে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশাবাদী। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশ প্রশাসন সব সময় কাজ করে যাচ্ছে। এতে মালিক, শ্রমিক ও যাত্রী সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। চালক ও মালিকদের উৎসাহ দিতে আমরা সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করব। কেউ হয়রানির শিকার হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্ধারিত জায়গা ছাড়া পাল্লা দিয়ে হুড়োহুড়ি করে আর বাসে উঠতে পারবেন না, শৃঙ্খলা মেনেই চলতে হবে যাত্রীদের। র‌্যাপিড পাসসহ সরকারি সিস্টেমে এ টিকিট ব্যবহার করা যাবে।