রাজধানীর অধিকাংশ রাস্তা দখল করে রাখা ২০ লাখ ব্যাটারি রিকাশার মালিক-শ্রমিকরা এবার রাস্তা অবরোধ করেছেন। এক সময় ব্যাটারি রিকশা চলাচলের দাবিতে তারাই রাস্তা অবরোধ করেছিল। গতকাল সোমবার সকালে প্রথমে তারা রাজধানীর বাড্ডায় রাস্তা অবরোধ করে। একইভাবে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, সায়েন্সল্যাব, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা ও ডেমরা এলাকায় সড়ক অবরোধের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন আটকে থাকে। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সসহ সাধারণ নগরবাসী চরম দুর্ভোগে পড়েন। বিভিন্ন দাবিতে রাস্তা অবরোধের এ রকম ঘটনা প্রতি সপ্তাইে ঘটছে। অথচ সরকার নীরব।
ভুক্তভোগিরা এতে চরম বিরক্ত। সরকারের নির্লিপ্ততায় তারা ক্ষুব্ধ। অনেকের মতে, এভাবে কথায় কথায় রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলনের সুযোগ দিলে সামনের জাতীয় নির্বাচনও ভ-ুল করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। কারণ গত দেড় বছরে লাখ লাখ ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর গ্রেফতার এড়াতে ঢাকায় এসে পেশা হিসেবে ব্যাটারি রিকশাকেই বেছে নিয়েছে। গোয়েন্দাদের কাছেও এমন তথ্য আছে।
আন্দোলনকারীরা জানান, আকিজ, ইফাদসহ আরো একটি কোম্পানির ভিন্ন ধরনের ব্যাটারিচালিত রিকশা বিক্রি বন্ধের দাবিতে এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় অন্তর্ভুক্ত দুই লাখ ৪১ হাজার ই-রিকশা চলাচলের বন্ধের দাবিতে তারা আন্দোলনে নেমেছে। অভিযোগ রয়েছেÑ এসব রিকশার সাথে বুয়েটে তৈরি করা ব্যাটারি রিকশার মডেলের কোনো মিল নেই।
বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কাজ কি ব্যাটারি রিকশা তৈরি করাÑ তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যেখানে মালয়েশিয়া বা চীন অত্যাধুনিক গণপরিবহন ও ট্রেন বানিয়ে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি করছে, সেখানে আমাদের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) রিকশা বানাচ্ছে। বুয়েটের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ কারণেই তো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েটে) র্যাঙ্কিং দিন দিন নেমে যাচ্ছে। ওই শিক্ষক বলেন, ‘আমরা আসলে পেছনের দিকে চলতে ভালোবাসি। তা না হলে সড়কের সমীক্ষা, ধারণক্ষমতা, যানজট ইত্যাদি পরিস্থিতি যাচাই না করে রিকশার মডেল কেন তৈরি করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘চীনের রাস্তায় এখন চালকবিহীন গণপরিবহন চলছে। আর আমরা বানাচ্ছি রিকশা। যুগের সাথে তাল মেলাতে বুয়েটকে আরো গতিশীল ও যুগপোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।’
ব্যাটারি রিকশার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আন্দোলনকারী মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের একজন নেতা বলেন, সরকার প্রকাশ্যে অনুমতি না দিলেও মৌন সম্মতি দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, আন্দোলন করে তারা সরকারকে তাদের দাবি মানতে বাধ্য করেছেন। ই-রিকশার মালিক-শ্রমিকরা যদি পাল্টা আন্দোলন করেন তাহলে কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে আরেক নেতা বলেন, আমরা আবার আন্দোলনে নামবো। এ প্রসঙ্গে যাত্রীকল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, আসল কথা হলোÑ পরিবহন সেক্টরের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সরকার ইচ্ছা করলেই প্রথম দিকেই ব্যাটারি রিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো। কিন্তু রাজধানীতে চলাচলের অনুমতি পেয়ে ঢাকার বাইরে থেকে লাখ লাখ ব্যাটারি রিকশা বানের পানির মতো ঢুকে পড়েছে। প্রতিদিনই ঢুকছে। এই সংখ্যা এখন প্রায় ২০ লাখ। তার ভাষায়, দুই সিটি করপোরেশনে দুই লাখ ৪১ হাজার ই-রিকশা চলাচলের অনুমতি দিলে নগরীতে বিশৃঙ্খলা আরো বাড়বে। সাথে যানজট ও দুর্ঘটনা তো আছেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরীর যানজট এবং দুর্ঘটনার প্রধান কারণ এসব ব্যাটারি রিকশা বা ই-রিকশা যাই বলি না কেন। এগুলো বন্ধ করার সময় এখনই। তা না হলে আগামীতে ঢাকা শহরে গণপরিবহন চলাচলের মতো আর কোনো জায়গা থাকবে না।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকা শহরে রিকশার একটি বড় অংশ এখনো নিবন্ধনের বাইরে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাটারিচালিত ও পায়ে চালিত (প্যাডেল) রিকশা। ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোয় বেশি ঝুঁকছেন তরুণরা। ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোর অভিজ্ঞতা নেই ৭৫ শতাংশ চালকের, যা উদ্বেগের কারণ হয়েছে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রিকশাগুলোর নিবন্ধন, নিয়ন্ত্রণ এবং চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করা গেলে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরো বাড়বে।
গবেষণা প্রতিবেদন বলা হয়, ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন নেই ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশের। আর প্যাডেল রিকশা নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে ৮৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাতে বেশি ঝুঁকছেন তরুণরা। আগে কখনো ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাননি ৭৫ শতাংশ চালক। এমনকি তারা প্যাডেল রিকশাও চালাননি। ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকরা প্রধানত ভাড়া ও মাইক্রোফাইন্যান্স ঋণের ওপর নির্ভরশীল, যাদের গড় ঋণের পরিমাণ ৭৯ হাজার ৯২৭ টাকা।
গবেষণায় দেখা গেছে, যাত্রীরা প্রধানত স্বল্প দূরত্বে এক থেকে তিন কিলোমিটার চলাচলের জন্য রিকশা ব্যবহার করেন। দ্রুত যাতায়াতের কারণে ব্যাটারিচালিত রিকশা বেছে নেন ৮২ শতাংশ যাত্রী। তবে দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুর্ঘটনার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এছাড়া যানজটের প্রধান কারণ হিসেবে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে দায়ী করছেন ৬২ শতাংশ যাত্রী। এই জাতীয় রিকশাকে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পক্ষে জোরালো জনসমর্থন রয়েছে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশের লোকের। আর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে সমর্থন রয়েছে ২১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষের।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে দ্ইু লাখের অধিক ই-রিকশা চলাচলের উদ্যোগ নেয় গত বছর। নানা সমালোচনার পরও সরকার সেদিকে কান না দিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তেই অটুট থাকে। সে সময় বলা হয়েছিল দুই সিটিতে দুই লাখ ই-রিকশা চলাচলের অনুমতি দেয়া হবে। তার আগে রাজধানী থেকে ব্যাটারি রিকশা তুলে দেয়া হবে। এমন ঘোষণার পরও ব্যাটারি রিকশা বন্ধ না করে দুই সিটিতেই বুয়েটের মডেলে ই-রিকশা তৈরি কাজ দেয়া হয় ইফাদ ও আকিজ কোম্পানিকে। অথচ অভিযোগ উঠেছে আকিজ বুয়েটের মডেল ফলো না করে তাদের নিজের মতো করে ই-রিকশা বাজারে ছাড়ছে। এছাড়া চালকদের প্রশিক্ষণ শেষে রিকশা হস্তান্তর করা হবে। নিয়ম অনুযায়ী একজন চালকই হবেন প্রদত্ত ই-রিকশার মালিক। অথচ সিএনজির মতো ধনীরা চালকদের এনআইডি নম্বর সংগ্রহ করে ঘুষ দিয়ে ই-রিকশার মালিক হচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে যাত্রীকল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, যদিও দুই সিটিতে দুই লাখ ই-রিকশার অনুমোদন দেয়ার কথা বলা হচ্ছে; আসলে বাস্তবে তা বেড়ে ১০ লাখ যে হবে না-তার গ্যারান্টি কে দেবে? এতে করে রাজধানীতে এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। বাড়বে দুর্ঘটনা ও যানজট। তিনি বলেন, ব্যাটারি রিকশা আর ই-রিকশার চালকদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে এর রেশ ধরে রাস্তায় মারিমারি, ধস্তাধস্তি লেগেই থাকবে। কথায় কথায় রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে করে সবাই ভোগান্তিতে পড়ে। এমনকি আন্দোলনকারীরাও এ থেকে রেহাই পায় না। তিনি বলেন, রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন করে হাতেগোনা দুই থেকে তিনটি দাবি পূরণ হয়েছে। তাহলে এমন আন্দোলন করে কী লাভ?