Image description

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা এখনো শুরু হয়নি। তার আগেই নানা কৌশল অবলম্বন করে প্রচারে নেমেছেন প্রার্থীরা। কেউ কেউ প্রকাশ্যেই প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। ফলে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের একের পর এক ঘটনা সামনে আসছে। প্রতিদিন সারা দেশের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় এবং আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে জমা পড়ছে প্রার্থীদের নানা অভিযোগ। এসব অভিযোগ সুরাহা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে। ইসি সূত্রে জানা গেছে, আচরণবিধি না মানা বেশির ভাগ প্রার্থীই বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি মনোনীত। আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে কাউকে শোকজ আর কাউকে আর্থিক দণ্ড দেয়া হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের তরফে।

জানা যায়, নিয়মের বাইরে গিয়ে রঙিন পোস্টার ব্যবহার, মোটর শোভাযাত্রা, জমায়েত করে ভোট চাওয়া কিংবা প্রতিশ্রুতি দেয়ার ঘটনায় এসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে এর বাইরেও সামাজিক নানা কর্মসূচির আড়ালে নির্বাচনী প্রচারণা চলছে প্রতিনিয়ত। কোথাও আবার ওয়াজ মাহফিলেও ভোট চাইছেন প্রার্থীর প্রতিনিধিরা। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ২২শে জানুয়ারি থেকে প্রচার চালাতে পারবেন ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীরা। কিন্তু এর আগেই অনেক প্রার্থী প্রচারে নেমেছেন। ইসি জানিয়েছে, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ইতিমধ্যে অনেক প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রতীকসহ পোস্ট বা লিফলেট বিতরণের অভিযোগে কিছু এলাকায় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

সরাসরি ভোট না চাইলেও সামাজিক, ধর্মীয় ও পারিবারিক অনুষ্ঠানের আড়ালে কৌশলে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন প্রার্থীরা। মসজিদে নামাজ আদায়, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে অংশগ্রহণ, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত সৌজন্য সাক্ষাৎ সব মিলিয়ে চলছে অনানুষ্ঠানিক গণসংযোগ। পাড়া-মহল্লার দোকানপাট, বাসাবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরছেন তারা। অনেক জায়গায় প্রার্থীদের ছবি ও দলীয় প্রতীকসংবলিত লিফলেট ও স্টিকার বিতরণ, যানবাহনে লাগানোর ঘটনাও ঘটছে। এসব কর্মসূচিতে একে অন্যকে ঘায়েল করে বক্তব্যও দিচ্ছেন, যা নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।

অনলাইনেও একই চিত্রের দেখা মিলেছে। সামাজিক মাধ্যমে চলছে ইঙ্গিতপূর্ণ প্রচারণা। ফেসবুকে ছবি, ভিডিও ও স্ট্যাটাসে প্রতীক ও স্লোগান তুলে ধরে ভোট প্রত্যাশা করছেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। আনুষ্ঠানিক মাইকিং না থাকলেও ডিজিটাল প্ল্যাটফরম কার্যত প্রচারণার বিকল্প ময়দানে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি খোদ নির্বাচন কমিশনের সামনে লিফলেট বিতরণ করার পাশাপাশি ভোট চান ঢাকা-১৩ আসনের প্রার্থী মামুনুল হক। পরে তাকে শোকজ করা হয়েছে।

ঢাকা-৮ আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। নানা কৌশলে এই প্রার্থী বিভিন্নভাবে প্রচারে অংশ নিয়েছেন। এরই জের ধরে গত রোববার এক চিঠিতে তাকে শোকজ করে ইসি। অন্যদিকে এই আসনের বিএনপি’র প্রার্থী মির্জা আব্বাসও প্রতিনিয়ত মাঠে যাচ্ছেন। এলাকার ভোটারদের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন। দুই প্রার্থীর এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্য অনলাইনে অনেকটা ঝড় তুলেছে। গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট চাওয়ায় এনসিপি’র আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলামকেও শোকজ করা হয়েছে।

এ ছাড়া উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আরও কয়েকজন প্রার্থী শোকজের মুখে পড়েছেন। গত ১৫ই জানুয়ারি চুয়াডাঙ্গা-২ (দামুড়হুদা, জীবননগর ও সদরের একাংশ) আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. রুহুল আমিনকে শোকজ করা হয়। বক্তব্যে ‘বাঁশের লাঠি ব্যবহার করতে কর্মীদের উৎসাহ দেয়ায়’ তাকে শোকজ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর বাইরেও কখনো হেলথ ক্যাম্প, শীতার্তদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণের নামে প্রতিনিয়ত প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে খুব একটা ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না নির্বাচন কমিশনকে।

এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি ‘মব’ সৃষ্টির অভিযোগ করা হয়েছে। সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও সরাইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আবুবকর সরকার নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির কাছে চিঠি দিয়ে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেছেন। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তার দুই সমর্থককে দুই দফায় আর্থিক জরিমানা করায় রুমিন ফারহানা এর আগে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে কড়া ভাষায় প্রতিবাদ করেছেন। প্রকাশ্যে আঙ্গুল তুলে ওই কর্মকর্তাকে সাবেক এই সংসদ সদস্যের শাসানোর ঘটনা ভাইরাল হয় সামাজিক মাধ্যমে। অবশ্য রুমিন ফারহানা জানিয়েছেন, অন্য প্রার্থীরা প্রকাশ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘন করলেও সে বিষয়ে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বরং উল্টো তাকে হয়রানি করা হচ্ছে।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ বিএনপি-জামায়াতের: পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দ্বারস্থ হলো বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। গতকাল দল দু’টি ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগ নিয়ে যায় ইসিতে। দুপুরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। অন্যদিকে বিকালে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের নেতৃত্বে একটি দল বৈঠক করে সিইসি’র সঙ্গে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার সফর স্থগিত করেছেন। অথচ এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে বক্তব্য দিচ্ছেন। প্রচারণা চালাচ্ছেন। কিন্তু ইসি এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

অন্যদিকে জামায়াত নেতা আযাদ বলেন, যারা প্রকাশ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। অথচ যারা বিধি মানছেন, তাদের ওপর জরিমানার নোটিশ ও নানা হয়রানিমূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে জমা দেয়া অসংখ্য অভিযোগের পাহাড় জমলেও কমিশন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে এমন অভিযোগ নিয়ে গত রোববারও ইসিতে হাজির হন বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি জানান, জামায়াতের নেতাকর্মীরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিকাশ নম্বর ও এনআইডি নম্বর সংগ্রহ করছেন।

মাঠে ৩০০ ম্যাজিস্ট্রেট: আসন্ন সংসদ ভোটে অনিয়ম ধরতে ‘নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম’ অনুসন্ধান ও আইন লঙ্ঘনের বিষয় বিচার করতে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ৩০০ নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি মাঠে কাজ করছে। গত ১৪ই জানুয়ারি জারি করা প্রজ্ঞাপনের পর নির্বাচনের তারিখ থেকে তারা মাঠে নামছেন। থাকবেন নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত। এসব কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় উপস্থিত থেকে সার্বক্ষণিক নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা আছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এই কমিটি দায়িত্ব পালনকালে নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম সংঘটিত হলে তা অনুসন্ধান করে ৩ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে প্রতিবেদন দেবে। একইসঙ্গে কোনো নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম যা সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘন হলে আরপিও অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য হবে, এবং তারা বিচার করবেন।

বিধি ভাঙলে কী ব্যবস্থা: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ অনুযায়ী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে প্রার্থীর বিরুদ্ধে জেল ও জরিমানা, তাৎক্ষণিক দণ্ড, প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ আছে। এতে বলা আছে, আচরণ বিধিমালায় উল্লিখিত কোনো ধারা লঙ্ঘন করলে তা নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এক্ষেত্রে ব্যক্তির সর্বোচ্চ ৬ মাস কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেয়া যাবে। আর দলের ক্ষেত্রে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার বিধান আছে। একইসঙ্গে অপরাধ গুরুতর হলে নির্বাচনী তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও দেয়া আছে। আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। তারা জরিমানা, অল্প সময়ের জন্য দণ্ড দিতে পারেন। এ ছাড়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা মূলত নির্বাচনের সময় নির্বাচনী তদন্ত কমিটির অংশ হিসেবে কাজ করেন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শোকজ করে, শুনানি শেষে ইসিতে প্রতিবেদন জমা দেন।  অপরাধ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাও কখনো কখনো ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। আর প্রার্থিতা বাতিল কিংবা বড় অঙ্কের জরিমানার ক্ষেত্রে প্রতিবেদনের আলোকে ইসি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।

এ বিষয়ে গতকাল ইসি আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, সবাই ইসিতে এসে নিজেদের অভিযোগ, পরামর্শ জানাচ্ছেন। এতে কমিশন সমৃদ্ধ হচ্ছে। ছোট সমস্যার সমাধান করে যাচ্ছে কমিশন। আমরা একদমই কোনো চাপে নেই। তিনি বলেন, এখনো ইসি বড় কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়নি। আমরা রাজনৈতিক দলের বক্তব্য খতিয়ে দেখছি ও ব্যবস্থা নিচ্ছি।