Image description
পণ্যবাহী ট্রলারে যায় পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্য। পলিথিন ও প্লাস্টিকের বিস্তার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পর্যটকেরাও। পলিথিন ও প্লাস্টিকজাত বোতল এবং পণ্য ব্যবহারে পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে: কর্মকর্তা

সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় গত বছর থেকে সরকার পর্যটক নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেয়। পর্যটক সীমিত করার পাশাপাশি দ্বীপে নিষিদ্ধ পলিথিন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্য বহন রোধ করাসহ ভ্রমণে ১২টি নির্দেশনা বা শর্ত আরোপ করে। কিন্তু সরকারের নেওয়া এ পদক্ষেপে পর্যটক নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও দ্বীপে পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্যের বিস্তার থামেনি।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, পর্যটন মৌসুমের নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে দৈনিক দুই হাজার পর্যটককে যাতায়াত ও রাতযাপনের সুযোগ দেওয়া হয়। ১২টি নির্দেশনা মেনে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাট থেকে জাহাজে করে ট্রাভেল পাস নিয়ে পর্যটকেরা সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে যেতে পারবে। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে কক্সবাজার সদর ও টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে দুটি কমিটি রয়েছে।

নির্দেশনার মধ্যে পর্যটকদের ভ্রমণের সময় নিষিদ্ধ পলিথিন এবং একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্য যেমন চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক চামচ, স্ট্র, সাবান ও শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক, ৫০০ ও ১০০০ মিলির প্লাস্টিক বোতল ইত্যাদি বহন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তবে জাহাজে ওঠার আগেই শুধু পর্যটকদের এ শর্ত মানতে হচ্ছে। ১১ জানুয়ারি থেকে তিন দিন সেন্ট মার্টিনের সৈকত, বাজার ও দোকানপাট এবং জাহাজে ঘুরে প্লাস্টিক পণ্য ও পলিথিনের ছড়াছড়ি দেখা যায়। যে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের দূষণের কারণে এত কড়াকড়ি, অথচ দ্বীপে তা বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না দেখে পরিবেশবাদী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও পর্যটকেরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

সর্বত্র পলিথিন-প্লাস্টিকের ছড়াছড়ি

১১ জানুয়ারি ভোররাত সাড়ে ৪টা। কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাট থেকে সেন্ট মার্টিন যাওয়ার জন্য হাজারো পর্যটকের জটলা। ভোর ৫টায় ছেড়ে যাবে তিনটি জাহাজ। চোখ মুছে কেউ লাইনে দাঁড়িয়েছেন, কেউ আধঘুমে দাঁড়ানোর জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন।

এমভি টেকনাফ জাহাজে উঠতে পরিবারের চার সদস্যসহ লাইনে দাঁড়ান সিলেটের বিয়ানীবাজার থেকে আসা পর্যটক মনির আহমেদ। তাঁর হাতে থাকা প্লাস্টিক বোতলের দুই লিটারের পানি। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বেচ্ছাসেবকেরা পানির বোতলটি রেখে দেন। ভ্রমণ পাস ও জাহাজের টিকিট চেক করার পাশাপাশি পর্যটকদের পানীয় জলের বোতল, চিপসের প্যাকেটসহ অন্যান্য প্লাস্টিক পণ্য বহনে কড়াকড়ি আরোপ করতে দেখা যায়।

কিন্তু এমভি টেকনাফ জাহাজের ক্যানটিনে সব ধরনের প্লাস্টিক বোতল দ্বিগুণ দামে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করতে দেখা যায়। সাইফউদ্দিন ও হাসিবুর রহমান নামে দুজন পর্যটক আক্ষেপ করে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘জাহাজে ওঠার আগে যেভাবে প্লাস্টিক বোতলের পানি কেড়ে নেওয়া হলো, অথচ জাহাজের ভেতরের চিত্র উল্টো। এভাবে তো আর প্লাস্টিক পণ্য নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।’

সেন্ট মার্টিন রুটের জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, ‘দু-একটি জাহাজে প্লাস্টিক বোতলে পানীয় জল বিক্রির বিষয়টি শুনছি। সবাইকে তো আর পাহারা দিয়ে রাখা যায় না।’

পণ্যবাহী ট্রলারে যায় পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্য

টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী ও শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাট দিয়ে প্রতিদিন নিষিদ্ধ পলিথিন, নানা ধরনের প্লাস্টিক বোতলের পানীয় ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্যের প্যাকেট ট্রলারে করে সেন্ট মার্টিনে সরবরাহ করা হয়। দ্বীপে আসা-যাওয়ার সময় যাত্রী ও মালবাহী ট্রলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি রয়েছে। মাঝেমধ্যে উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর সেন্ট মার্টিনে পলিথিন ও প্লাস্টিক বিস্তার রোধে অভিযান চালালেও সরবরাহ বন্ধে কোনো উদ্যোগ নেই বলে জানান স্থানীয়রা।

সেন্ট মার্টিন জেটিঘাট বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব দোকানে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্য দেদার বিক্রি হচ্ছে। এক পাইকারি দোকানদার বলেন, ‘পলিথিন ও প্লাস্টিকের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে দ্বীপের খুচরা ব্যবসায়ী ও বিক্রেতারা এখনো পলিথিন-প্লাস্টিকের ওপর নির্ভরশীল।’

হচ্ছে সুপেয় পানি ও প্লাস্টিক বর্জ্য শোধনাগার

প্লাস্টিকের বোতলের পরিবর্তে বিকল্প উপায়ে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য সেন্ট মার্টিনে একটি প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে। আগামী মাসের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দ্বীপের বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকেরা সহজেই সুপেয় পানি পাবেন। এ ছাড়া একই প্রকল্পে আওতায় দ্বীপের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ৩৫ কোটি টাকার ব্যয়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করছে।

সেন্ট মার্টিনের হারানো পরিবেশ পুনরুদ্ধারে সরকার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জানিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, ‘দ্বীপের সুরক্ষায় নিষিদ্ধ পলিথিন ও প্লাস্টিকজাত বোতল এবং পণ্য ব্যবহারে পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারে দ্বীপের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকির বিষয়ে স্থানীয়দের সচেতনে কাজ করছে সরকার।’