Image description

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চলার পথ নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এসে আলাদা হয়ে যাওয়ায় বদলে যেতে পারে নির্বাচনের সমীকরণ। প্রায় তিন মাস আগে দেশের ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট ‘এক বাক্সে’ আনার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, এই দুই প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে পালটে যেতে পারে ভোটের হিসাব-নিকাশ। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আসনের ফলাফল নির্ধারণেও তাদের এই বিভক্তি ভূমিকা রাখবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে। তাদের মতে, বিরোধের কারণে জামায়াতে ইসলামী যেমন ভোটের মাঠে হোঁচট খেয়েছে; তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইসলামী আন্দোলনও। আর এই দুয়ের মধ্য থেকে বাড়তি সুবিধা যাবে বিএনপির দিকে।

পর্যবেক্ষকদের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের নেতারাও মনে করছেন, জামায়াত জোট থেকে ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে যাওয়ায় নির্বাচনের জন্য কিছুটা হলেও সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি, জনপ্রিয়তা এবং ভোটের মাঠে যে শক্ত অবস্থান, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তেমনি ইসলামী দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর পরই চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান রয়েছে। সারা দেশেই এই দলের কিছু না কিছু সাংগঠনিক ভিত আছে বলে মনে করা হয়। যদিও প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ যাবত দলটির কেউ জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেননি। তা সত্ত্বেও দলটির সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং জনপ্রিয়তা উপেক্ষা করা যাবে না। যে কারণে জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের ঐক্য ভেঙে যাওয়ায় দুই দলই কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং লেখক-গবেষক আলতাফ পারভেজ এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, জামায়াতে ইসলামী মওদূদী মতাদর্শের অনুসারী। আর ইসলামী আন্দোলন দেওবন্দি ঘরানার। তাই তারা একে অপরকে মেনে নিতে পারে না। তার পরেও এই দুই দলের এক সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার খবরে অনেকে মনে করেছিলেন যে, এবার ইসলামপন্থিদের ভোট এক হবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে তাদের পথ আবার আলাদা হয়ে যাওয়ায় ভোটের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এখন কিছুটা এলোমেলো হয়ে যাবে। এর ফলে বড় ধাক্কা খেয়েছে তাদের ‘ওয়ান-বক্স পলিসি’। ইসলামী আন্দোলন এখন জামায়াতের ভোট ব্যাংকে ভাগ বসাতে চাইবে। এতে সংসদের নিম্নকক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা উচ্চকক্ষে লাভবান হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ-সদস্য নাজমুল হক প্রধান যুগান্তরকে বলেন, জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলন বরাবরই একে অপরের প্রতিপক্ষ ছিল। হঠাৎ তাদের মধ্যে নির্বাচনি ঐক্য দেখে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন জেগেছিল। অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন, দল দুটির এই ঐক্য বেশি দিন টেকে কিনা। শেষ পর্যন্ত আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তাদের পথ আলাদা হয়ে যাওয়ায় ভোটের মাঠে বিএনপি এখন বাড়তি সুবিধা পাবে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে এবারের নির্বাচনে মূলত বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যেই লড়াই হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে এ দুটি দলের পথ আলাদা হয়ে যাওয়ায় দেশের ইসলামপন্থি ভোটারদের সামনে এখন তিনটি পথ খোলা থাকছে। একদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন দশ দলীয় নির্বাচনি জোট। আরেক দিকে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন। এর বাইরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা কওমি ঘরানার তিনটি রাজনৈতিক দলের ভোট রয়েছে, যা বিএনপির বাক্সে যাবে। অর্থাৎ আগামী নির্বাচনে ইসলামপন্থি ভোটারদের ভোট এখন তিন ভাগে বিভক্ত হবে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইসলামী ঘরানার আটটি রাজনৈতিক দলের যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচনি ঐক্য গড়ে ওঠে। আনুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে শুরু হয় এই যুগপৎ আন্দোলন। প্রথম দিকে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ছিল এই মোর্চায়।

গত বছরের ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আট দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে ‘ওয়ান বক্স’ পলিসির সিদ্ধান্ত হয়। এই নীতি অনুসারে জোটের পক্ষ থেকে প্রতিটি নির্বাচনি আসনে একজন করে প্রার্থী দেওয়ার কথা জানানো হয়। দলগুলো জানায়, সংশ্লিষ্ট আসনে প্রার্থীর যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা এবং মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক অবস্থা বিশদভাবে পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্বাচন করা হবে।

নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে এই মোর্চাকে নির্বাচনি জোটে রূপ দেওয়ার আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র জমার সময় শেষ হওয়ার আগের দিন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং তার পরদিন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি এই জোটে যোগ দেয়, যা ১১ দলীয় জোট নামে পরিচিতি পায়। যদিও শরিকদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলাপ আলোচনা কিংবা পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই জোটে এনসিপি, এলডিপি এবং এবি পার্টিকে সম্পৃক্ত করা নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াতের মতবিরোধ দেখা দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আসন সমঝোতার বিষয়টিও। তখন থেকেই জোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনায় নেয় দলটি।

যদিও জামায়াতের মতে, শুরু থেকেই ইসলামী আন্দোলন নানান অজুহাতে জোটে জট পাকাতে চেষ্টা করে। বিষয়টি বুঝতে পেরে শেষ পর্যন্ত তাদের বাইরে রেখেই সমমনা ১০ দলকে নিয়ে নির্বাচনি সমঝোতার পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াত।

এদিকে, ইসলামী আন্দোলন আলাদা হয়ে যাওয়ায় এখন ওই ৪৭ আসনে হিস্যা চাইছে নির্বাচনি ঐক্যে থাকা অন্য দলগুলো। এ নিয়ে তাদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা চলছে। এনসিপি শুরু থেকেই জামায়াতের কাছে ৩৫ থেকে ৪০টি আসন দাবি করে। এ লক্ষ্যে ৪৭টি আসনে মনোনয়নপত্রও জমা দেয় দলটির প্রার্থীরা। পরে সমঝোতায় ৩০টি আসনে ছাড় পায় এনসিপি। এখন ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে যাওয়ায় আসন বাড়ানোর বিষয়ে জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে এনসিপি। আসন বাড়ানোর দাবি করেছে এবি পার্টি এবং খেলাফত মজলিসও। শরিকদের মন রক্ষা করার এসব বিষয় নিয়েও কিছুটা বেকায়দায় আছে জামায়াত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে ইসলামী ঘারানার দল দুটির মধ্যে এই বিভাজন শুধু কৌশলগত নয়; বরং আদর্শ, নেতৃত্ব এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের পুরোনো সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে। তাদের মতে, ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার স্বপ্ন ভেঙে এখন বাস্তবে তিন ধারার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের সাংগঠনিক শক্তি এবং বিএনপির সঙ্গে থাকা ইসলামি দলগুলোর কারণে ভোটের মাঠে জামায়াতের জোট কী প্রভাব ফেলে-সেটিই এখন দেখার বিষয়।

অনেকের মতে, এ ক্ষেত্রে জামায়াতের ঝুঁকিটা একটু বেশি বলেই মনে হচ্ছে। এর কারণ হিসাবে তারা বলছেন, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী শুরু থেকেই জামায়াতের বিরোধিতা করে আসছেন। অন্যদিকে এবারের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় রয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশসহ তিনটি ইসলামি দল। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে চারটি আসনে বিএনপি ছাড় দিয়েছে। এ ছাড়া নিবন্ধনহীন বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও আবদুর রকিবের নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটের একটি অংশও এই সমঝোতার অংশ। নিবন্ধনহীন জমিয়তের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাছকে বিএনপি যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এই প্রেক্ষাপটে হেফাজত, জমিয়ত, ইসলামী ঐক্যজোটের পাশাপাশি ইসলামি আন্দোলনের সঙ্গে নতুন করে সৃষ্ট দূরত্ব ভোটের মাঠে নতুন সমীকরণ সৃষ্টি করতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

পরিসংখ্যান বলছে, জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন সময়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিগত ৬টি সংসদে তাদের ৬৫ জন সংসদ-সদস্যকে সংসদে পাঠাতে পেরেছে। পক্ষান্তরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কয়েকবার সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও এখন পর্যন্ত একটি আসনেও জয়লাভ করতে পারেনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও তাদের প্রাপ্ত ভোটের পরিসংখ্যান খুব একটি ভালো নয়। তবে এবার ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে গেলে ফলাফল কী হতো সে নিয়ে রাজনীতিতে শুরু হয়েছিল নানা আলোচনা। কিন্তু ইতোমধ্যে ইসলামী আন্দোলন এ জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় আলোচনা ভিন্ন দিকে রূপ নিয়েছে। বলা হচ্ছে, এই জোট ভাঙায় রাজনৈতিকভাবে এবং নির্বাচনের মাঠে বেশি লাভবান হবে বিএনপি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, এ বিভাজনে সরাসরি লাভবান হচ্ছে বিএনপি, আর ক্ষতির মুখে পড়বে জামায়াত। কারণ, ইসলামী দলগুলো সম্মিলিতভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে একটি সমন্বিত ভোটব্যাংক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এখন আলাদাভাবে প্রার্থী দেওয়ায় সেই ভোট ভাগ হয়ে যাবে। ফলে জোটগত শক্তি কমবে এবং নির্বাচনি প্রতিযোগিতায় ইসলামী দলগুলোর প্রভাব দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৮৭ সালে চরমোনাইর পীর সৈয়দ ফজলুল করীমের হাত ধরে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের যাত্রা শুরু। ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেতে দলের নাম পরিবর্তন করা হয়। দলটির বর্তমান আমির সৈয়দ রেজাউল করীম। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ১৯৯৬ সালে মাত্র ১১ হাজার ১৫৯ ভোট পাওয়া দলটি ২০১৮ সালের নির্বাচনে ১২ লাখের বেশি ভোট পায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পর তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পায় তারা। যদিও ওই নির্বাচনে ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরার অভিযোগ ছিল। ২০১৪ ও ২০২৪ সালে জামায়াত ও বিএনপি ভোট বর্জন করে।

অপর দিকে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি আসন ও ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট পায়। সেটাই ছিল তাদের সেরা ফলাফল। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটে থেকে ১৭টি এবং ২০০৮ সালে দুটি আসন পায় তারা। ২০১৩ সালে নিবন্ধন হারানো জামায়াত গত বছরের জুনে নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরে পায়। জামায়াতের বাইরে ইসলামী ঘরানার দলগুলোর মধ্যে ইসলামী ঐক্যজোট ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে একটি করে এবং ২০০১ সালে দুটি আসন পায়। এর বাইরে অন্য কোনো ইসলামি দল থেকে কেউ সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি।