দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ থাকা প্রার্থীদের দুজন ছাড়া বাকি সবাই নির্বাচনি মাঠে টিকে গেছেন। এ অভিযোগে অন্তত ২৪ প্রার্থীর মধ্যে ২১ জনের প্রার্থিতাই বহাল রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বাতিল হয়েছে দুজনের। কুমিল্লা-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের সিদ্ধান্ত অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে। তাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রার্থিতা বহাল হয়েছে বিএনপির। জামায়াতেরও রয়েছে অন্তত তিনজন। বাকিগুলোর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টি, খেলাফত মজলিস, স্বতন্ত্রসহ অন্য দলের প্রার্থী রয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে যেসব প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে অন্য দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন ও ফি জমা দেওয়ার স্লিপ দাখিল করেছেন, তাদেরই বৈধ ঘোষণা করেছে কমিশন। এক্ষেত্রে তাদের অনেকের অন্য দেশের নাগরিকত্ব বাতিল হয়েছে মর্মে প্রমাণপত্র জমা নেয়নি ইসি। এছাড়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি বা খেলাপি ঋণের জামিনদার হওয়ার অভিযোগ থাকলেও তাদের কয়েকজন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন বা প্রার্থিতা বহাল রয়েছে। তাদের একজন হলেন চট্টগ্রাম-৪ আসনের মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী।
রোববার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন ও চার কমিশনারের উপস্থিতিতে আপিল শুনানিতে এ সিদ্ধান্ত দেয় ইসি। শুনানির শেষদিন রোববার ৬৫টি আপিল আবেদনের শুনানি হয়। এর বেশির ভাগই ছিল দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপি সংক্রান্ত।
এদিন ফেনী-৩ আসনের প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের মো. মুশফিকুর রহমান, চাঁদপুর-২ আসনের মো. জালাল উদ্দিনসহ আটজনের প্রার্থিতা বহাল রাখা হয়েছে। বিএনপির চট্টগ্রাম-২ আসনের প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর ও কুমিল্লা-১০ আসনের মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়ার প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। জামায়াতের দুজন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। দলটির একজনের প্রার্থিতার বিরুদ্ধে আপিল হলেও তা বহাল রেখেছে কমিশন। গতকাল যখন এসব হেভিয়েট প্রার্থীদের শুনানি চলছিল, তখন ইসির গেটের বাইরে ছাত্রদল তিন দফা দাবিতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করেছিল।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অযোগ্য। রোববার শুনানিতে এ বিষয়টি তুলে ধরেন কয়েকজন আপিলকারীর আইনজীবীরা। শুনানি চলা অবস্থায় সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা বৈধ রাখায় ইসি সংবিধান ও সুপ্রিমকোর্টের আদেশ লঙ্ঘন করছে বলে ইসিতে চিঠি দেন মামুন হাওলাদার নামের এক ব্যক্তি।
তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট ধারণ করে আপিল শুনানিতে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, দ্বৈত নাগরিকত্বের আপিলের ক্ষেত্রে ইসি একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একেকজনের ক্ষেত্রে একেক ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, অনেকে নির্যাতিত। তারা জীবন বাঁচানোর জন্য অন্য দেশের সিটিজেন হয়েছেন। আমরা যদি আগের ধ্যানধারণার চিন্তাভাবনা নিয়ে থাকি, তাহলে আমরা আগাতে পারব না। যে গণবিপ্লব হয়েছে, সেটার বেনিফিট যাতে দেশ-জাতি পায়, সেই বিপ্লবের স্পিরিট ধারণ করে আমাদের একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।
এ সময় নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, আমরা ঋণখেলাপি যাদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাদের পারমিট করেছে বিধায় দিয়েছি।
বিএনপির ফেনী-৩ আসনের প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক-এমন অভিযোগ করে তার প্রার্থিতা বাতিলের আবেদন করেন ওই আসনের জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন। ইসি ওই আপিল নামঞ্জুর করেছে। এর ফলে আব্দুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থিতা বহাল থাকছে। ফরিদপুর-২ আসনের বিএনপির প্রার্থী শামা ওবায়েদের বিরুদ্ধে সুয়োমোটো রুল দিয়েছিল ইসি। ওই অভিযোগ থেকে তাকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ঢাকা-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর নজরুল ইসলাম, দিনাজপুর-৫ আসনের বিএনপির একেএম কামরুজ্জামানসহ অন্যদের প্রার্থিতা বহাল রেখেছে কমিশন।
রোববারের শুনানিতে বিএনপির অন্তত আটজনের প্রার্থিতা বহাল রাখে ইসি। যাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বগুড়া-১ আসনের কাজী রফিকুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের মো. মুশফিকুর রহমান, চাঁদপুর-২ আসনের মো. জালাল উদ্দিন, ফরিদপুর-১ খন্দকার নাসিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম-৪ মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী, গাজীপুর-৩ এসএম রফিকুল ইসলাম ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনের আফরোজা খানম। বিএনপির চট্টগ্রাম-২ সরোয়ার আলমগীর ও কুমিল্লা-১০ আসনের মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়ার প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। সরোয়ার আলমগীরের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি ও আবদুল গফুর ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যাংক আপিল করলেও তার মনোনয়ন বহাল রেখেছে ইসি। একাধিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের জামিনদার হওয়ায় তার প্রার্থিতা বাতিলের আপিল করা হয়। ইসি ওই আপিল নামঞ্জুর করে। এই সময় নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম। মানুষ হিসাবে বলছি, ব্যাংকের টাকাটা (ঋণ) দিয়ে দিয়েন।
এর আগে আপিল শুনানিতে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে শুনানি করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরী নিজে ঋণ নেননি, তিনি গ্যারান্টার। অপরদিকে আপিলকারীদের পক্ষে শুনানিতে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির বলেন, উনি (আসলাম চৌধুরী) প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। তিনি খেলাপি ঋণের জামিনদার। পরে ইসি বলে তিনি সরাসরি ঋণ নেননি। তিনি খেলাপি ঋণের জামিনদার। পরে ওই আপিল নামঞ্জুর করে ইসি। এ রায়ের পর কয়েকজন হট্টগোল শুরু করেন। একজন নিজেকে জুলাই যোদ্ধা দাবি করে দাঁড়িয়ে বলেন, হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপি প্রমাণিত হওয়ার পরও আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ হলো। এটা হতে পারে না।
দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে সংবিধান লংঘনের অভিযোগ : সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা বৈধ রাখায় ইসির বিরুদ্ধে সংবিধান ও সুপ্রিমকোর্টের আদেশ লঙ্ঘন হয়েছে বলে ইসিতে চিঠি দিয়েছেন জনৈক মামুন হাওলাদার। ওই চিঠিতে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের দাবি জানান তিনি। রোববার ইসিতে শুনানি চলাকালে বেলা ১১টার দিকে তিনি এ আবেদন জমা দেন।
মামুন হাওলাদার চিঠিতে উল্লেখ করেন, সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ এবং ১৯৭২ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক বা দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। সংবিধান অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের পর একজন ব্যক্তি প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হন। এছাড়া হাইকোর্ট বিভাগের ১৬৪৬৩/২০২৩ নম্বর রিট পিটিশনের আদেশে বলা হয়, নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত আবেদনকারী ব্যক্তি বিদেশি নাগরিক হিসাবেই বিবেচিত হবেন। শুধু আবেদন দাখিল করাই নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণ হিসাবে যথেষ্ট নয়। এই আদেশ বর্তমানে আপিল বিভাগেও বহাল রয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, সম্প্রতি আপিল শুনানিতে নির্বাচন কমিশন দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা প্রার্থীদের কাছ থেকে শুধু একটি ‘অঙ্গীকারনামা’ নিয়েছে। যেখানে প্রার্থীরা উল্লেখ করছেন যে, তারা নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন এবং তা প্রক্রিয়াধীন। এই প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে কমিশন তাদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করছে, যা স্পষ্টত সংবিধান এবং হাইকোর্টের রায়ের পরিপন্থি।
যে কারণে লতিফ সিদ্দিকীর প্রার্থিতা বহাল : টাঙ্গাইল-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্র বহাল রেখেছে ইসি। তার বিরুদ্ধে ওই আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. লিয়াকত আলীর আপিল আবেদন নামঞ্জুর করেছে ইসি।
এর আগে শুনানিতে লিয়াকত আলীর আইনজীবী যুক্তি দিয়ে বলেন, নিষিদ্ধ দলের নেতা হওয়ায় আবদুল লতিফ সিদ্দিকী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। এ সময় নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ বলেন, পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে তো নিষিদ্ধ করা হয়নি। পরে সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর নির্বাচন কমিশন আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর মনোনয়নের বৈধতা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দেয়।
যা বললেন সিইসি : রোববার রাত ৮টার দিকে আপিল শুনানি শেষ হয়। এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিল শুনানিতে কোনো পক্ষপাত করিনি। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আমরা ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের বিষয়টিও ছেড়ে দিয়েছি। আমরা চাই সবার অংশগ্রহণে একটা সুন্দর নির্বাচন হোক।
সিইসি বলেন, ‘আপনারা হয়তো আমাদের সমালোচনা করতে পারেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের বিষয়টা আমরা কিভাবে ছেড়ে দিয়েছি, আপনারা দেখেছেন। বিকজ উই ওয়ান্ট দ্য ইলেকশন টু বি পার্টিসিপেটেড। আমরা চাই, সবার অংশগ্রহণে একটা সুন্দর নির্বাচন হোক। আপনারা সহযোগিতা না করলে কিন্তু হবে না। তিনি বলেন, ‘আই ক্যান এশিউর আমার তরফ থেকে এবং আমার টিমের তরফ থেকে কোনো পক্ষপাতিত্ব করে কোনো জাজমেন্ট আমরা দেইনি।’
এদিকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দ্বৈত নাগরিকত্বের জটিলতায় পড়েও যাদের প্রার্থিতা শেষ পর্যন্ত বহাল বা পুনর্বহাল হয়েছে, তারা হলেন-বিএনপির আব্দুল আউয়াল মিন্টু (ফেনী-৩), আফরোজা খানম (মানিকগঞ্জ-৩), একেএম কামরুজ্জামান (দিনাজপুর-৫), শামা ওবায়েদ (ফরিদপুর-২), শওকতুল ইসলাম (মৌলভীবাজার-২), কবির আহমেদ ভূইঞা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪), মনিরুজ্জামান (সাতক্ষীরা-৪), তাহির রায়হান (সুনামগঞ্জ-২) ও ফাহিম চৌধুরী (শেরপুর-২)। জামায়াতে ইসলামীর নজরুল ইসলাম (ঢাকা-১), জুনায়েদ হাসান (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩), একেএম ফজলুল হক (চট্টগ্রাম-৯) ও মাহবুবুল আলম (কুড়িগ্রাম-৩)। এনসিপির এহতেশামুল হক (সিলেট-১)। স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ার হোসেন (সুনামগঞ্জ-৩) ও সুজাত মিয়া (হবিগঞ্জ-১) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জহিরুল ইসলাম (নোয়াখালী-১)।
এছাড়া ঋণখেলাপি সংক্রান্ত আপিল নিষ্পত্তি করে চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল রাখা হয় এবং যশোর-২ আসনে জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ মসলেহ উদ্দিন ফরিদুর প্রার্থিতা পুনর্বহাল করা হয়।