Image description
স্বজনদের অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হয় না

ঘটনা ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর দুপুরের। রাজধানীর শাহবাগ মোড় থেকে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় বংশাল থানা ছাত্রদলের তৎকালীন সহসভাপতি মাফুজুর রহমান সোহেলকে। এরপর থেকে খোঁজ মেলেনি সোহেলের। তাকে তুলে নেওয়ার পর স্ত্রী নিলুফা ইয়াসমিন শিল্পী রাজধানীর মিন্টো রোডের গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে যান।

তখন তাকে বলা হয়, সোহেল নামে কাউকে আটক করা হয়নি। ডিবিতে না পেয়ে রাজধানীর বিভিন্ন থানা, আদালত, কারাগার এমনকি বেওয়ারিশ লাশ দাফনকারী সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামেও সোহেলের খোঁজ করেন তিনি। কিন্তু এখনো তার সন্ধান মেলেনি। দুই সন্তান নিয়ে স্বামীর অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছেন শিল্পী। সোহেলের ছেলে আমিনুর রহমান রাজ বলেন, ‘আমরা গুমসংক্রন্ত কমিশনে অভিযোগ করার পর একবার ডেকেছিল। সব তথ্য দিয়ে আসছি। কিন্তু আব্বুর বিষয়ে আর কিছুই জানানো হয়নি।’

সোহেলের মতো নিখোঁজ বা গুম হওয়া অন্তত ৩৫০ জনের স্বজনও একটা খবরের অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু খবর আর আসে না। নিখোঁজ লোকগুলো বেঁচে আছেন নাকি মেরে ফেলা হয়েছে তাও জানেন না তারা। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’র তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৫০ জন এখনো ফেরেননি। যদিও গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী গুমের শিকার ২৮৭ জনের সন্ধান এখনো মেলেনি। মায়ের ডাক ও গুম তদন্ত কমিশনের হিসাবে ৬৩ জনের গরমিল রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেকে গুম কমিশনে অভিযোগই করেননি। সে কারণে সংখ্যায় কিছুটা হেরফের হতে পারে। গুম হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে ৫ আগস্ট পরবর্তী সরকারও কেন সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি তা নিয়ে ক্ষুব্ধ নিখোঁজের স্বজনরা।

মায়ের ডাকের সমন্বয়ক আফরোজা ইসলাম আঁখি যুগান্তরকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে গুম থাকা আরমান ভাই ও মাইকেল চাকমাসহ বেশ কয়েকজন ফিরে এসেছেন। কিন্তু এখনো সাড়ে তিনশর বেশি ভুক্তভোগী ফিরে না আসায় তাদের পরিবার অর্থকষ্টসহ নানা সমস্যায় ভুগছে।

গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের সন্ধান এখনো মেলেনি তাদের বিষয়ে জানতে চাইলে গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সাবেক সভাপতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, যারা গুমের শিকার হয়েছেন তাদের পরিবারের আহাজারি প্রতিনিয়ত আমাদের শুনতে হয়েছে। গুমের কাহিনিগুলো অমানবিক ও করুণ। আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না তারা কি অবস্থায় আছে। আমরা রিপোর্ট জমা দিয়ে দিয়েছি। আমাদের কার্যক্রম শেষ।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময় ৩৫ জনের ডেডবডি পাওয়া গেছে। এসব ডেডবডির কারও হাত বাঁধা, কারও চোখ বাঁধা ছিল। ধরে নেওয়া হয়েছে, এগুলো গুমের শিকার ছিল। বাকিদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনে গুম-খুন ছিল নিয়মিত ঘটনা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে আলোতে আসতে থাকে গুমের লোকহর্ষক অনেক ঘটনা। অন্তবতী সরকার গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন করে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের উদ্যোগ নেয়। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের এ কমিশন তদন্ত শেষে ৪ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করে। ১৫ জানুয়ারি কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়েছে।

গুম তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিরোধী মত দমনে গুমকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার শুরু করে। সবচেয়ে বেশি গুমের ঘটনা ঘটেছে ২০১৬ সালে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত অসংখ্য মানুষ গুমের শিকার হন। এর মধ্যে তদন্ত কমিশনে অভিযোগ জমা পড়ে ১ হাজার ৯১৩টি। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসাবে বিবেচিত হয়। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়ে।

কমিশনের তথ্য বলছে, ২০০৯ সালে গুমের ঘটনা ছিল ১০টি। এরপর থেকে তা বাড়তেই থাকে। ২০১০ সালে গুমের ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪টি। ২০১১ সালে গুমের ঘটনা ঘটে ৪৭টি, ২০১২ সালে ৬১টি, ২০১৩ সালে ১২৮টি, ২০১৪ ৯৫টি, ২০১৫ সালে ১৪১টি, ২০১৬ সালে ২১৫টি, ২০১৭ সালে ১৯৪টি, ২০১৮ সালে ১৯২টি, ২০১৯ সালে ১১৮টি, ২০২০ সালে ৫১টি, ২০২১ সালে ৫৬টি, ২০২২ সালে ১১০টি, ২০২৩ সালে ৬৫টি এবং ২০২৪ সালে ৪৭টি।

কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সব সময় জাতীয় নির্বাচনসহ স্থানীয় নির্বাচনের আগে আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যেত। গুমের ক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু করা হতো বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী ও সমর্থকদের। যাদের গুম করা হয় তাদের মধ্যে জামায়াত এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীর সংখ্যা বেশি। তবে গুমের পর ফিরে না আসা অর্থাৎ নিখোঁজ বেশি রয়েছে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। কমিশনের তথ্যে দেখা যায়, মোট নিখোঁজের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মী, ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।

কমিশনের প্রতিবেদন তথ্য বলছে, নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের গণহারে আটক-গ্রেফতার ও বেছে বেছে গুম করা হতো। গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া ও কমার সঙ্গে ঘটনাবহুল রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ, নিরাপত্তা সংকট ও নির্বাচনের সংযোগ ছিল। ২০১৩ সালে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের একটা সম্পর্ক রয়েছে। একই প্রবণতা দেখা যায় ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা গুমের শিকার বেশি হয়েছিলেন। এছাড়া বড় কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ ও বিক্ষোভের আগে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের তুলে নিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক পরিচয়ে গুম হওয়া ৯৪৮ জনের মধ্যে জামায়াতের নেতাকর্মী ৫০ দশমিক ২ ভাগ, শিবিরের ২৪ দশমিক ৯ ভাগ, বিএনপির ১৫ ভাগ, ছাত্রদল ৪ দশমিক ৯ ভাগ ও যুবদল ১ দশমিক ৮ ভাগ। বিএনপি ও জামায়াতের ১৫৭ নেতাকর্মী এখনো নিখোঁজ। ১৫৭ জনের মধ্যে বিএনপির ৬৮ ভাগ, জামায়াতের ২২ ভাগ রয়েছেন।

রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গুমের শিকার বংশাল থানা ছাত্রদলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক পারভেজ হোসেন এখনো ফেরেননি। ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর শাহবাগ থেকে তাকেও গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়। তার স্ত্রী ফারজানা আক্তার দুই সন্তানকে নিয়ে বর্তমানে রাজধানীর ওয়ারীর যোগীনগর এলাকায় বোনের বাসায় থাকেন। পারভেজ যখন গুম হন তখন দুই বছর চার মাস বয়সি মেয়ে আদিবা ইসলাম হৃদি এখন রাজধানীর টিকাটুলির শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির ছাত্রী। ১২ বছর বয়সি শিশু আরাফ হোসেন পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তার বাবা পারভেজ হোসেন গুম হন। আরাফ এখন নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। বাবার আদর, স্নেহ কেমন তা জানে না ছোট্ট এই শিশু। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরাফ যুগান্তরকে বলে, আমি কখনো বাবাকে দেখিনি। এখন বাবার ছবি দেখি আর মায়ের কাছ থেকে বাবার গল্প শুনি। আমি এখনো বাবাকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় আছি।’

পারভেজের স্ত্রী ফারজানা আক্তার যুগান্তরকে জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুমসংক্রান্ত কমিশনে তিনি অভিযোগ করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও মামলা করেছেন। হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আশায় বুক বেঁধেছিলাম স্বামী ফিরে আসবে। কিন্তু এখনো এলো না। গুমসংক্রন্ত কমিশন থেকে আমাকে বলা হয়েছে-‘যারা এখনো গুম আছে ধরে নেন তারা মৃত।’

দুই শিশুকে নিয়ে কষ্টের জীবনের কথা তুলে ধরে ফারজানা বলেন, আমাদের জীবন এখন কচুপাতার পানির মতো। পারভেজ কিছুই রেখে যায়নি। ছেলে আরাফ হোসেন জন্ম থেকেই হার্টের রোগী। তার চিকিৎসা খরচ বহনসহ দুই ছেলেমেয়ের পড়ালেখা করানো আমার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ব্যবসায়ীরাও গুমের শিকার হন : রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থানা এলাকা থেকে ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি অপহৃত হন ব্যবসায়ী মো. কুদ্দুসুর রহমান চৌধুরী। রিয়েল এস্টেট কোম্পানির সঙ্গে জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায়। এখনো তিনি ফিরে আসেননি। কুদ্দুসুর রহমানের জমিজমা বেদখল হয়ে গেছে। তার মেয়ে ফারজানা আক্তার টুম্পা যুগান্তরকে বলেন, আমরা গুমসংক্রান্ত কমিশনে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি, তাদের বিষয়ে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ট্রাইব্যুনালেও অভিযোগ করেছি।

গুমের শিকার প্রতিটি পরিবারই চাপা কষ্ট বুকে নিয়ে দিন পার করছে। বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে স্বজনের অপেক্ষায়। তাদের আশা ছিল আওয়ামী লীগের পতনের মধ্য দিয়ে তাদের অপেক্ষার অবসান ঘটবে। কিন্তু পূরণ হয়নি সে প্রত্যাশা। নিখোঁজ ব্যক্তিরা বেঁচে আছেন না মারা গেছেন তা এখনো অজানা।

গুমে জড়িত ছিলেন যারা : সম্প্রতি গুমসংক্রান্ত কমিশন থেকে প্রকাশিত তথ্যচিত্রে বলা হয়েছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশের প্রত্যেকটা বাহিনী জড়িত। তবে এদের মধ্যে মূল ভূমিকায় ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছয়টি ইউনিট। এগুলো হলো-র‌্যাব, বাংলাদেশ পুলিশ, ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআই। এসব বাহিনীর সদস্যদের তত্ত্বাবধানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিনের পর দিন আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। তাদের অনেককেই হত্যা করা হয়েছে। প্রথমদিকে গুমের পর হত্যা করে লাশ রাস্তাঘাটে ফেলা হলেও পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে লাশ গুম করা হয়েছে।

গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার কারণে এসব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৪২ কর্মকর্তার পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে। এদের বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সর্বশেষ সাবেক ও বর্তমান মিলে ২৫ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। এর মধ্যে ১৫ জন বর্তমানে চাকরিরত, ৯ জন অবসরে, ১ জন এলপিআরে। চাকরিরত ১৫ সেনা কর্মকর্তা আত্মসমর্পণও করেছেন।

ভারতের কাছে গুম হওয়া ব্যক্তি : কমিশনের তথ্য অনুযায়ী গুমের পর ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে অনেককে। তাদের মধ্যে কারও কারও জেল হয়েছে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশি বন্দিদের তালিকা চেয়েছিল গুমসংক্রান্ত কমিশন। কিন্তু তালিকা দেয়নি ভারত।