দিনভর আপিল শুনানি শেষে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে বিএনপির প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ এনেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একইসঙ্গে তারা বলছে, এই নির্বাচনে অংশ নেবে কি-না— জোটের শরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চূড়ান্তভাবে জানাবে দলটি। এদিকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর সংশয় জানিয়ে দিনভর কমিশনের সামনে অবস্থান করেছে ছাত্রদল। যদিও দিনশেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, ৯ দিনের এই শুনানিতে কোনও পক্ষপাত করা হয়নি। সব মিলিয়ে রবিবার (১৮ জানুয়ারি) সারাদিন সবার চোখ ছিল নির্বাচন কমিশনের দিকে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতমূলক আচরণের কথা উল্লেখ করে এনসিপি বলছে, নির্বাচন কমিশন একপাক্ষিক রায় দিয়ে দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিদের নির্বাচন করার সুযোগ দিয়েছে। এছাড়াও প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ বা অবৈধ ঘোষণার ক্ষেত্রে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে ইসি পক্ষপাতিত্ব করছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামীও। জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, ‘প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ বা অবৈধ ঘোষণার ক্ষেত্রে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব— এ দুটি প্রধান বিষয়কে বিবেচনায় নিয়েছে ইসি। তবে একই ধরনের ঘটনায় কারও মনোনয়নপত্র বাতিল করা হচ্ছে আর কারও বৈধ ঘোষণা করা হচ্ছে। এটি ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।’
এদিকে, দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা নিয়ে ইসির বিরুদ্ধে সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের আদেশ লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে সিইসি বরাবর একটি লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন মামুন হাওলাদার নামে একজন সচেতন নাগরিক ও ভোটার।
আবেদনে মামুন হাওলাদার উল্লেখ করেন, সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ এবং ১৯৭২ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, কোনও বিদেশি নাগরিক বা দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। তিনি উচ্চ আদালতের (রিট পিটিশন নং ১৬৪৬৩/২০২৩) আদেশের বরাত দিয়ে জানান, নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিদেশি নাগরিক হিসেবেই বিবেচিত হবেন। কেবলমাত্র আবেদন দাখিল করাই নাগরিকত্ব ত্যাগের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট নয়। এই আদেশ বর্তমানে আপিল বিভাগেও বহাল রয়েছে।
এগুলোকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই উল্লেখ করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা ১২ আসনের প্রার্থী সাইফুল হক বলেন, ‘এগুলো রাজনৈতিক অবস্থান। এক ধরনের চাপ তৈরি করা। এসব থাকবেই।’
নির্বাচন নিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে প্রধান উপদেষ্টা
রবিবার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠককালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনও ধরনের ‘গোঁজামিলের’ নির্বাচন হবে না।
তিনি বলেন, “এবারের ভোট ও গণভোট সফলভাবে করতেই হবে। যে যাই বলুক না কেন, ১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “যেভাবেই হোক আমাদের ভালো নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচন সংক্রান্ত যে কোনও জরুরি তথ্য, অভিযোগ বা মতামত আমাদের জানাবেন। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচন কমিশনের নজরে আনবো; সরকারের যদি কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার থাকে, নেবো।”
পক্ষপাতের সব অভিযোগ নাকচ সিইসির
দীর্ঘ ৯ দিনের এই শুনানিতে কোনও পক্ষপাত করা হয়নি বলে দাবি করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। নির্বাচন ভবনে শুনানি শেষে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, “রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানিতে কোনও পক্ষপাত করিনি। আপনারা হয়তো, আমাদের সমালোচনা করতে পারেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক সইয়ের বিষয়টা আমরা কীভাবে ছেড়েছি, আপনারা দেখেছেন। কারণ আমরা সবার অংশগ্রহণ চেয়েছি। আপনারা সহযোগিতা না করলে কিন্তু হবে না।”
ঢাকা-১২ আসনের বিএনপি সমর্থিত এমপি প্রার্থী সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এনসিপি যেভাবে তাদের নির্বাচনের প্রতীক নিয়েছে— তারা তো বাস্তবে নির্বাচন কমিশনকে একপ্রকার জিম্মি করে পছন্দের প্রতীক নিয়েছে। তো, তখন কোনও সমস্যা হয়নি। সুতরাং এগুলো হচ্ছে বিশেষ দলের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। মানে, নিজেদের পক্ষে থাকলে এক ধরনের অ্যাটিটিউড আর বিপক্ষে গেলে অন্য ধরনের অ্যাটিটিউড।’
এখন নির্বাচন কমিশনের ইনটেনশন বা সদিচ্ছা নিয়ে আমার বড় দাগের কোনও প্রশ্ন নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা চেষ্টা করছে। কোথাও কোথাও তাদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি হতে পারে আবার কোথাও কোথাও কাজের ত্রুটি-দুর্বলতা হতে পারে। কিন্তু, এটার সঙ্গে আমি মনে করি না বড় দাগের পক্ষপাতদুষ্ট কোনও ভূমিকায় তারা যাচ্ছে। ছোটোখাটো কিছু অসংগতি হতে পারে। কখনও একটা পদক্ষেপ ভুল হতে পারে। তবে, সেটা যে উদ্দেশমূলকভাবে করছে— এটা আমি এখনও মনে করতে চাই না।’
তবে, নির্বাচন কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে উল্লেখ করে সাইফুল হক বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের কোনও রকম পক্ষপাতদুষ্টতা, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষপাতদুষ্টতার কোনও সুযোগ নেই।’
দিনভর ছাত্রদলের অবস্থান, চলবে সোমবারও
পোস্টাল ব্যালটে ইসির পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ ও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত, বিভিন্ন সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাসহ তিন দফা দাবিতে রবিবার (১৮ জানুয়ারি) দিনভর অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে ছাত্রদল। একইসঙ্গে সোমবারও তারা এই কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ছাত্রদলের অভিযোগগুলো হলো— পোস্টাল ব্যালট সংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর সংশয় সৃষ্টি করেছে; বিশেষ একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাপের মুখে দায়িত্বশীল ও যৌক্তিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে হঠকারী ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যা কমিশনের স্বাধীনতা ও পেশাদারত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও হস্তক্ষেপে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের নজিরবিহীন ও বিতর্কিত প্রজ্ঞাপন জারি, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য অশনি সংকেত।